শাহজাদপুর সংবাদ

শেয়ারভিত্তিক ফ্ল্যাটের ব্যবসায় বিনিয়োগ করে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, দাবি রিহ্যাবের

৮ নভেম্বর, ২০২৬ এ ৫:৪০ PM

শেয়ারভিত্তিক ফ্ল্যাটের ব্যবসায় বিনিয়োগ করে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, দাবি রিহ্যাবের

জমির ‘শেয়ার’ কিনে কম খরচে ফ্ল্যাট তৈরির আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে বিনিয়োগ করেছেন অনেকে। তবে শেয়ারভিত্তিক এই অনিয়ন্ত্রিত আবাসন ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করে ইতিমধ্যে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে দাবি করেছে আবাসন খাতের শীর্ষ সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এ খাতের প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা আইনি জটিলতা ও মামলায় আটকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আজ রোববার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরে রিহ্যাব। সংগঠনটি অবিলম্বে অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ শেয়ারভিত্তিক ফ্ল্যাট বিক্রি বন্ধের দাবি জানিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন রিহ্যাবের সভাপতি আলী আফজাল। তিনি বলেন, সমবায় বা যৌথ উদ্যোগের নামে একশ্রেণির ডেভেলপার জমির শেয়ার বিক্রি করে নির্দিষ্ট আয়তনের ফ্ল্যাট হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এসব প্রকল্পের বেশির ভাগেরই বৈধ মালিকানা, অনুমোদিত নকশা কিংবা নির্মাণের প্রয়োজনীয় কারিগরি সক্ষমতা নেই।

রিহ্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শেয়ারভিত্তিক মডেলে নির্মাণাধীন প্রায় ১০০টি ভবন পরিদর্শন করে দেখা গেছে, ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ ভবনের অনুমোদিত নকশার সঙ্গে বাস্তব নির্মাণের ব্যাপক অসংগতি রয়েছে। এসব ভবনে নির্মাণসংক্রান্ত শর্তও মানা হচ্ছে না। দক্ষ প্রকৌশলী ও স্থপতি ছাড়া নির্মাণকাজ করায় ভবনগুলোর কাঠামোগত নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জমি ও শেয়ারভিত্তিক আবাসন প্রকল্পে প্রতারণার অভিযোগে আদালতে ১ হাজার ৮২৮টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এসব মামলায় প্রায় ৪০ হাজার ক্রেতা ও প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা জড়িয়ে আছে। বহু মানুষ জীবনের সর্বস্ব বিনিয়োগ করেও ফ্ল্যাট কিংবা অর্থ—কোনোটিই ফেরত পাচ্ছেন না।

রিহ্যাবের সভাপতি আলী আফজাল শেয়ারভিত্তিক আবাসন ব্যবসার সাতটি প্রধান ঝুঁকি তুলে ধরেন। প্রথমত, জমির শেয়ার কিনলেই নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটের আইনি মালিকানা নিশ্চিত হয় না। একই জমি বা ভবনের বিপরীতে একাধিক ব্যক্তির কাছে শেয়ার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। দ্বিতীয়ত, প্রকল্পের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নকশা ছাড়াই সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে। তৃতীয়ত, দক্ষ স্থপতি ও প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধান না থাকায় ভবনগুলো কাঠামোগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এ ছাড়া আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও নিবন্ধন ফি যথাযথভাবে আদায় না হওয়ায় সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। অন্যদিকে আইনি শর্ত মেনে ব্যবসা পরিচালনাকারী আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো অবৈধ ও স্বল্পমূল্যের অফারের কারণে অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে।

অন্য ঝুঁকিগুলোর মধ্যে রয়েছে ফ্ল্যাটের বণ্টন, দখল ও নিবন্ধন নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি মামলা ও পারিবারিক বিরোধ তৈরি হওয়া। পাশাপাশি জমির অবিভক্ত অংশের মালিকানা থাকায় ভবিষ্যতে ব্যাংকঋণ পাওয়া এবং উত্তরাধিকারীদের মধ্যে জমি ও ফ্ল্যাট বণ্টনেও আইনি জটিলতা হতে পারে।

অনিয়ন্ত্রিত এই আবাসন ব্যবসা বন্ধ ও ক্রেতাদের সুরক্ষায় সরকারের কাছে ছয়টি দাবি জানিয়েছে রিহ্যাব। দাবিগুলোর মধ্যে আছে, জমির শেয়ার বিক্রি করে ফ্ল্যাট দেওয়ার অনিয়ন্ত্রিত চুক্তিভিত্তিক মডেল বন্ধ করে এসব কার্যক্রম আইনের আওতায় আনা; জমির মালিকানা, দায়দেনা, নকশা ও নির্মাণের আইনি অধিকার নিশ্চিত না করে কোনো প্রতিষ্ঠানকে অর্থ সংগ্রহের অনুমতি না দেওয়া এবং শেয়ারভিত্তিক চলমান ভবনগুলোর দ্রুত স্বাধীন কারিগরি ও আইনি নিরীক্ষা করা।

এ ছাড়া একই জমি একাধিকবার বিক্রি, ভুয়া অনুমোদন ও অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া ও তাঁদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। প্রতিটি প্রকল্পের জমি কেনা, নির্মাণে ব্যয় ও কাজের অগ্রগতির স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ এবং আয়কর ও ভ্যাট যাচাইয়ের পাশাপাশি অভিজ্ঞ স্থপতি ও প্রকৌশলী নিয়োগ বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়েছে তারা।

সংবাদ সম্মেলনে আলী আফজাল বলেন, বৈধ যৌথ মালিকানা বা স্বচ্ছ বিনিয়োগের বিরোধী নয় রিহ্যাব। তবে নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটের নিশ্চয়তা ও যথাযথ আইনি ভিত্তি ছাড়া যেন কোনো প্রতারণামূলক ব্যবসা পরিচালিত না হয়, সে জন্য সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। এ সংকটের সমাধান না হলে দেশের পুরো আবাসন খাত ও অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন রিহ্যাবের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আব্দুর রাজ্জাক, সহসভাপতি আবু খালিদ মো. বরকত উল্লাহ, এ এফ এম ওবায়দুল্লাহ, মো. হারুন অর রশিদ প্রমুখ।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ