শাহজাদপুরে সংকটে সংকুচিত তাঁতশিল্প: গত এক বছরে বিক্রি কমেছে ৭০ শতাংশ
৩০ আগস্ট, ২০২৫ এ ১:০০ PM

উত্তরবঙ্গের সর্বোবৃহৎ কাপড়ের হাট সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর। মোঘল আমলে শুরু হওয়া তাঁতে কাপড় বুনন প্রসারিত হতে হতে শিল্প হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। এই শিল্প সবচেয়ে বেশি প্রসার লাভ করে বৃহত্তর পাবনা জেলায় এবং এই শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিতি লাভ করে শাহজাদপুর। মুঘল আমলে যাত্রা শুরু করা এই শিল্পের প্রসার ঘটতে ঘটতে একবিংশ শতাব্দির শুরুর দশকে কেবলমাত্র শাহজাদপুরেই হাতে চালিত তাঁতের সংখ্যা দাড়ায় ১লাখ ৬২ হাজার। কিন্তু কালের বিবর্তে বিশ্ব রাজনীতি এবং বাণিজ্যিক নানা কৌশলের মারপ্যাচে হারিয়ে যেতে বসেছে তাঁত শিল্প। শাহজাদপুরের পুরো অঞ্চল খুঁজে পাওয়ারলুম এবং হ্যান্ডলুম মিলে বড়জোর টিকে আছে ৫০ হাজারের মত তাঁত। এরফলে কর্ম হারিয়েছে অন্তত ১ লাখ ১২ হাজার তাঁতশ্রমিক।
শাহজাদপুর কাপড়ের হাট পরিদর্শনকালে দেশীয় তাঁতবস্ত্র উৎপাদনকারী তাঁতী ও মহাজনেরা জানান, প্রতি বছরের এ সময় শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে কোটি কোটি টাকার তাঁতবস্ত্র ভারত, জার্মানী, ইটালী, ইংল্যান্ডসহ বহিঃর্বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে রফতানী করা হলেও মোট রফতানীর ৪০ ভাগ তাঁতবস্ত্রই যায় পশ্চিম বাংলার উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মেদিনীপুর, হুগলী, বর্ধমান, নদীয়া, মূর্শীদাবাদ, মালদহ, জলপাইগুঁড়ি, পশ্চিম দিনাজপুর, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, কুচবিহার, হওড়া ও হুগলীসহ বিভিন্ন জেলার ছোট-বড় নামিদামী শপিংমল ও বিপণী বিতানসহ ভারতের নানা প্রদেশে। নানা রং-বেরংয়ের বাহারী ডিজাইনের দেশি তাঁতের শাড়ীর গুণগত মান ও বাজার দর ভারতীয় বস্ত্র বাজারের অনুকূলে থাকায় শারদীয় দুর্গাপূজায় দেশীয় তাঁতবস্ত্রের ব্যাপক চাহিদা বৃদ্ধি পায়। বিগত বছরগুলোতে ভারতীয় ব্যাপারীরা একেকজন শাহজাদপুর কাপড়ের হাট থেকে শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে কমপক্ষে ২ হাজার জোড়া থেকে ১৫ হাজার জোড়া তাঁতের শাড়ি ক্রয় করলেও তাদের আগমনের সংখ্যা প্রায় না থাকার কারনে এবার দেশীয় তাঁতবস্ত্রের শতকরা ৭০ ভাগ বিক্রি কমে গেছে।
বাংলাদেশ তাঁতবোর্ডের পরিসংখ্যান অনুসারে দিনে দিনে দেশের তাঁতশিল্পের কেন্দ্র হিসেবে সিরাজগঞ্জ ও কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে শাহজাদপুর দেশব্যাপী ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। শাহজাদপুরের তালতলা, খঞ্জনদিয়ার, রামবাড়ি, পুকুরপাড়, মনিরামপুর, প্রাণনাথপুর, শক্তিপুর, শান্তিপুর, থানারঘাটপাড়া, আন্ধারকোঠাপাড়া, রূপপুর, রূপপুর নতুন পাড়া, দক্ষিণ পাড়া, উড়ির চর, নগরডালা, ডায়া, হামলাকোলা, জামিরতা, কৈজুরী, খুকনী, জালালপুর, পোতাজিয়া, গাড়াদহসহ নানা স্থানে তাঁতের সংখ্যা ছিলো ১ লাখ ৬২ হাজার। শ্রমিকেরও সংখ্যা ছিলো আনুপাতিক হারে সমান। কিন্তু পরপর কয়েকবারের বন্যা, করোনা ভাইরাস, হ্যান্ডলুমের স্থলে পাওয়ারলুমের প্রচলন, এবারে দুর্গাপূজায় ভারতে দেশীয় তাঁতবস্ত্রের একটি বৃহৎ অংশ স্থল পথে রফতানী করতে না পারাসহ শাহজাদপুর কাপড়ের হাটে বেচাকেনায় চরম ভাবে ধ্বস নেমেছে। এরফলে পূঁজি সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে লাখো তাঁত এবং প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে বলে শাহজাদপুর তাঁত শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারন সম্পাদক মোঃ আল মাহমুদ এ প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন।
এব্যপারে তাঁতীদের সাথে কথা হলে তারা বলেন, শাহজাদপুরে শনিবার বিকাল থেকে রবিবার ও মঙ্গলবার বিকাল থেকে বুধবার হাট বসে থাকে। সিরাজগঞ্জ জেলার সব থেকে বড় হাটটিই হল শাহজাদপুরের হাট। এ হাটে আমাদের হাতে তৈরী প্রচুর দেশীয় শাড়ী ওঠে। যা ব্যাপারীরা ছাড়াও সাধারন গ্রাহক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সেখান থেকে শাড়ি কিনে থাকলেও বর্তমানে হাটেই বেচাকেনায় নেমেছে ধ্বস। ফলে এলাকার লাখো তাঁতীরা পরিবার-পরিজনের জীবীকা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে নতুন করে!
স্থানীয় তাঁতী মহাজনেরা জানান, গত বছরগুলোর এ সময়ে সপ্তাহে কেবল শাহজাদপুর হাট থেকে কমপক্ষে ২’শ থেকে ৪’শ কোটি টাকার শাড়ী ভারতে রফতানী হতো। গত বছর পর্যন্ত এ চাহিদা ক্রমবর্ধমান থাকলেও এবারের চিত্র উল্টো। দেশীয় তাঁতবস্ত্র ব্যবসার ভরা মৌসুমেও উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ শাহজাদপুর কাপড়ের হাটে দেশীয় তাঁতবস্ত্রের বেচাকেনা না থাকায় তাঁতীরা প্রতিটি মুহুর্ত চরম উদ্বেগ আর উৎকন্ঠায় পার করছেন।
এদিকে শাহজাদপুর কাপড়ের হাটে আগত উপজেলার গাড়াদহ নতুন পাড়ার তাঁতবস্ত্র উৎপাদক ও বিক্রেতা মাসুদ রানা বলেন, ‘তার তাঁত কারখানার ৭/৮ টি তাঁতে টাঙ্গাইলের কাতান শাড়ীর ত্যানা দিয়েছিলেন। ১৭’শ টাকা পেটির (৪ পিছ) শাড়ী উৎপাদন করে হাটে আনলেও ক্রেতা না থাকায় বিক্রি করতে পারেননি। পৌর এলাকার তালতলা মহল্লার মৃত মজিবর রহমানের ছেলে উজ্জ্বল ও পার্শ্ববর্তী উল্লাপাড়া উপজেলার বালসাবাড়ী মধুপুর গ্রামের তাঁতী শফিকুল ব্যথিত চিত্তে জানালেন একই কথা!
অপরদিকে শাহজাদপুর কাপড়ের হাটের ইজারাদার মোঃ নাদিম আলী বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার ভারতে কিছুটা কম দেশীয় তাঁতবস্ত্র রফতানি হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, ঐতিহ্যবাহী এ পেশাটির সাথে জড়িত লাখ লাখ তাঁতীদের কথা মাথায় রেখে সংশ্লিষ্টরা ঐতিহ্যবাহী দেশীয় তাঁতশিল্প রক্ষায় দ্রুতই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।’
বাংলাদেশ স্পেশালাইজড টেক্সটাইল এন্ড পাওয়ারলুম ইন্ড্রাস্ট্রিজ এ্যাসেশিয়েশন (বিএসটিএমপিআইএ) এর সহ-সভাপতি আবু হাসান খান মনি ও পরিচালক কেন্দ্রীয় তাঁতী নেতা বীরমুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব হায়দায় আলী বলেন, ‘দেশীয় তাঁতবস্ত্র ব্যবসার অন্যতম মৌসুম শারদীয় দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে স্থানীয় তাঁতীরা তাদের কারখানায় উৎপাদিত তাঁতের শাড়ী নানা কারণে স্থল পথে ভারতে রফতানী করতে পারছেন না। এদিকে ৩ মাস ধরে স্থল পথে ভারতে দেশীয় তাঁতবস্ত্র রফতানি বন্ধের কারনে শাহজাদপুর কাপড়ের হাটে তাঁতবস্ত্র বেচাকেনায় ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। এ চরম দুরবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারকেই দ্রুত প্রুয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে; তাহলেই ফের ঘুরে দাঁড়াতে পারবে দেশের সর্ববৃহৎ কুঁটিরশিল্প ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প।
সূত্র: Manobkantha
সম্পর্কিত সংবাদ
সিরাজগঞ্জে পেয়ারার বাম্পার ফলন, হাসি কৃষকের মুখে
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৯:০৬ PM · Alokito Bangladesh
শিক্ষককে তুলে নিয়ে নির্যাতন, অভিযোগ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৭:২১ PM · dailyamardesh.com
সিরাজগঞ্জে বাল্কহেড ডুবে নিখোঁজ মতলবের তরুণের মরদেহ উদ্ধার
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৭:১৫ PM · chandpurtimes.com
