শাহজাদপুর সংবাদ

লোকসানে রয়েছে ২২ ব্যাংক, ৪টি রাষ্ট্রমালিকানাধীন

৫ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১১:৪২ AM

লোকসানে রয়েছে ২২ ব্যাংক, ৪টি রাষ্ট্রমালিকানাধীন

দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ২২টি ব্যাংক পুঞ্জীভূত লোকসানে পরিচালিত হচ্ছে। গত মার্চ পর্যন্ত হিসাবে ব্যাংকগুলোর পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ ২ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে দেওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে গতকাল রোববার এ তথ্য জানানো হয়। ওই প্রতিবেদনে দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ ২০২৬ ভিত্তিতে ব্যাংক খাতের পরিচালন মুনাফার পরিমাণ ৭৮৯ কোটি টাকা। তবে নিট ক্ষতির পরিমাণ ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা।

লোকসানে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে চারটি রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক—জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক (রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক মোট ছয়টি)। দুটি বিশেষায়িত ব্যাংক—বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)। একটি বিদেশি ব্যাংকও লোকসানে আছে। সেটি হলো ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।

লোকসানে থাকা অন্য ১৫টি ব্যাংক বেসরকারি। সেগুলো হলো এবি, বাংলাদেশ কমার্স, এক্সিম, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, আইসিবি ইসলামিক, আইএফআইসি, ইসলামী, মেঘনা, ন্যাশনাল, গ্লোবাল ইসলামী, পদ্মা, সীমান্ত, সোশ্যাল ইসলামী, দি প্রিমিয়ার ও ইউনিয়ন ব্যাংক।

সংসদীয় কমিটিকে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, উচ্চ শ্রেণিকৃত (মূলত খেলাপি) ঋণ, প্রয়োজনীয় প্রভিশনিং (খেলাপির বিপরীতে পরিচালন মুনাফা থেকে টাকা রাখা), মূলধন ঘাটতি এবং দুর্বল সম্পদমান ব্যাংকগুলোর উপার্জন ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে পরিচালন পর্যায়ে মুনাফা সমন্বয়ের পর অনেক ব্যাংক নিট ক্ষতিতে পড়ছে।

অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে অনিয়ম-দুর্নীতির ফলে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা এত তাড়াতাড়ি দূর করা সম্ভব নয়। লোকসান সেটিরই ফল। তবে লোকসান কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা হচ্ছে।

লোকসানে থাকা বেসরকারি ১২টি ব্যাংকের মধ্যে ৯টিই (এবি, আইসিবি ইসলামিক ও সীমান্ত ব্যাংক বাদে) জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের নেতা এবং অনুগত ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তখন ব্যাংকগুলোতে ব্যাপক অনিয়ম এবং ঋণের নামে টাকা বের করে নেওয়ার ঘটনা ঘটে।

ব্যাপক অনিয়মের কারণে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণও বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে, গত ৩০ জুন পর্যন্ত হিসাবে খেলাপি ঋণ ছিল ৬ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৩ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ২২টি ব্যাংক লোকসানে থাকা অর্থনীতির জন্য স্বাস্থ্যকর কি না। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়। ব্যাংক খাতের স্বাস্থ্যের অবস্থা জানার একটি উপায় খেলাপি ঋণের হার। সেখানে দেখা যায়, তিন ভাগের এক ভাগ ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। অন্যদিকে ব্যাংকের তিন ভাগের এক ভাগের বেশি লোকসানে।

জাহিদ হোসেন বলেন, কিছু কিছু ব্যাংকের কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থার সংকটের পরিস্থিতিও তৈরি হয়।

৮৫ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা

বাংলাদেশ ব্যাংক সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে, গত মার্চ পর্যন্ত হিসাবে ১৫টি ব্যাংক ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণ করতে পারেনি। গত ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২টি ব্যাংক প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা নিয়েছে।

কোনো ব্যাংক নগদ টাকার সংকটে পড়লে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জরুরি সহায়তা চায়। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক তারল্য সহায়তা দেয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, তারা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংককে ১৫ হাজার ৮১০ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে ১০ হাজার ৮৪৩ কোটি, এক্সিম ব্যাংককে ১২ হাজার ১০ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংককে ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংককে ৫ হাজার ৪২১ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংককে ৩ হাজার ৪ কোটি, এবি ব্যাংককে ৪ হাজার ২৭০ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংককে ৬১৫ কোটি, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংককে ২৫২ কোটি, পদ্মা ব্যাংককে ২৫২ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংককে ৪ হাজার ৯০০ কোটি এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশকে ১৭ হাজার কোটি টাকা জরুরি তারল্য সহায়তা দিয়েছে। তবে কত বছরে এই সহায়তা দেওয়া হয়েছে, তা প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকে কমিটির সদস্য এনসপিসির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ খেলাপি ঋণ স্থায়ীভাবে রোধে একটি সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরেন। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সাইফুল আলম তাঁদের দলের পক্ষ থেকে ব্যাংক খাত সংস্কারে একটি লিখিত প্রস্তাব দেন।

সূত্র জানায়, বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সংসদীয় কমিটিতে জবাবদিহি করা সরকারের দায়িত্ব। তাঁরা কোনো কিছু নিয়ে লুকোচুরি করবেন না। অনেকেই ব্যাংকের পরিচালক, চেয়ারম্যান হতে চান। কিন্তু অর্থনীতিতে রাজনীতিকীকরণের কোনো সুযোগ নেই।

বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য সাইফুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, তাঁরা বলেছেন ব্যাংকের সংখ্যা কমাতে হবে। বাংলাদেশের মতো ছোট দেশে এতগুলো ব্যাংকের প্রয়োজন নেই।

কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্যদের মধ্যে আরও অংশ নেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, জালাল উদ্দিন, মঈনুল ইসলাম খান, সফিকুর রহমান ও সৈয়দ জয়নুল আবেদীন।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ