শাহজাদপুর সংবাদ

ধনীদের কাছে জাঁকজমক নয়, এখন নিজের মতো সময় কাটানোই ভ্রমণের বিলাসিতা

৪ অক্টোবর, ২০২৬ এ ২:৪৫ PM

ধনীদের কাছে জাঁকজমক নয়, এখন নিজের মতো সময় কাটানোই ভ্রমণের বিলাসিতা

বিলাসভ্রমণের ধরন বদলে যাচ্ছে। বিলাসভ্রমণকারীদের চাহিদায় যেমন বৈচিত্র্য আসছে, তেমনি তাঁদের এককথায় সংজ্ঞায়িত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তাঁদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজের পছন্দে প্রাধান্য দেওয়া।

বাস্তবতা হচ্ছে, বিলাস ভ্রমণের ধারণা এখন আর শুধু নামী হোটেল, দামি সাজসজ্জা বা জাঁকজমকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখন ভ্রমণকারীরা নিজেদের পছন্দ ও স্বাধীনতায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। বাড়তি আয়োজন নয়, বরং তাঁরা খুঁজছেন গভীর ও অর্থবহ অভিজ্ঞতা। যেমন, স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেশা ও প্রচলিত পর্যটনকেন্দ্রের বাইরে গিয়ে নতুন কিছু আবিষ্কার করা। খবর ফোর্বস ম্যাগাজিনের।

সে কারণে হোটেলের ভূমিকাও বদলে যাচ্ছে। শুধু ভালো ঘর বা উন্নত সেবা দিলেই হচ্ছে না। সেই সঙ্গে ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে হোটেলকে যুক্ত হতে হচ্ছে। যেমন, কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা মানুষ এবং অসুস্থতা কাটানো বা শরীর-মন ভালো রাখার জন্য ভ্রমণ করতে আসা মানুষের লক্ষ্য পূরণেও হোটেলগুলোকে বাড়তি ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।

আরও দেখা যাচ্ছে, একসঙ্গে কয়েক প্রজন্মের মানুষ ভ্রমনে বেরোচ্ছেন। ফলে এমন ব্যবস্থা ও আয়োজন দরকার হচ্ছে, যেখানে পরিবারের সবাই একসঙ্গে সময় কাটাতে পারবেন, আবার প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যক্তিগত পরিসরও পাবেন।

আইএইচজি হোটেলস অ্যান্ড রিসোর্টসের বৈশ্বিক বিলাসবহুল ব্র্যান্ড বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট টম রাউন্ট্রি বলেন, ‘বিলাসিতা একেক মানুষের কাছে একেক অর্থ বহন করে; এর পরিসর অনেক বিস্তৃত ও গভীর।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বিলাসপণ্যের বৃহত্তর বাজার যখন একভাবে চাপের মুখে, তখন বিলাসভ্রমণের আকর্ষণ ধরে রাখার পেছনে এই বৈচিত্র্যের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। হোটেল এখন শুধু মর্যাদার বিষয় নয়; হোটেলের কারণে ভ্রমণকারীদের সময় বাঁচে, ঝামেলা কমে। সেই সঙ্গে তা মানুষকে এমন অভিজ্ঞতার সন্ধান দেয়, যা অন্য কোথাও পাওয়া কঠিন।

বিলাসভ্রমণকারীরা উচ্চমানের সেবা চান, তবে সব সময় যে হোটেলের কর্মচারীরা তাঁদের নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকবে, তাঁরা সেটা চান না। তাঁরা যে সব সময় একই ধরনের মনোযোগ চান, বিষয়টি তাও নয়। কেউ বিস্তারিত ভ্রমণসূচি পছন্দ করেন, আবার কেউ চান সম্পূর্ণ গোপনীয়তা। এমনকি একই ব্যক্তি একই ভ্রমণের একপর্যায়ে কেবল ছোটাছুটি করতে পারেন, আবার অন্য সময়ে একান্তে থাকতে চাইতে পারেন। টম রাউন্ট্রির ভাষায়, বিষয়টি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে নির্দিষ্ট সময়ে ব্যক্তি কী চান, তার ওপর। সমুদ্রভ্রমণের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এক্সপ্লোরা জার্নিসের প্রেসিডেন্ট আনা ন্যাশ বলেন, ভ্রমণে নিজের সময়, নিজের পরিসর ও নিজের মতো করে অভিজ্ঞতা নেওয়ার স্বাধীনতাই প্রকৃত বিলাসিতা।

হোটেল কোম্পানিগুলোর কাজ শুধু নতুন নতুন সুযোগ–সুবিধা যোগ করা নয়; বরং ভ্রমণের উদ্দেশ্য বুঝে সেই অনুযায়ী সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা। কারও কাছে ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য হতে পারে সুস্থতা, কারও কাছে খাবার, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া কিংবা কোনো বড় ক্রীড়া বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করা।

গ্লোবাল হোটেল অ্যালায়েন্সের বিলাসভ্রমণবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টি গোল বলেন, এখনকার বিলাসভ্রমণকারীরা বাড়তি জাঁকজমকের চেয়ে যেটা বেশি চান সেটা হলো, আরও নিবিড়ভাবে সময় উপভোগ এবং গভীর অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা লাভ করা। হোটেলগুলোও এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবে অতিথিকে স্বীকৃতি দেওয়া, আগেভাগে কক্ষে ঢোকার সুযোগ, দেরিতে কক্ষ ছাড়ার সুবিধা ও বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে তারা। ফলে ভ্রমণকারীদের যেমন সময় বাঁচছে, তেমনি ঝামেলাও কমছে।

এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিলাসভ্রমণের বড় সম্ভাবনা দেখছেন আইএইচজি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টসের ভাইস প্রেসিডেন্ট টম রাউন্ট্রি। বিশেষ করে জাপান, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ায় এ প্রবণতা জোরালো হচ্ছে।

এর অর্থ এই নয় এসব দেশে পর্যটক বাড়ছে। বিষয়টি হলো, পর্যটকেরা একবার কোনো দেশের সঙ্গে পরিচিত হয়ে গেলে তার ভেতরে যেতে চাইছেন, কেবল পরিচিত পর্যটন কেন্দ্রের মধ্যে থাকছেন না তাঁরা।

জাপানের উদাহরণ ধরা যাক। আন্তর্জাতিক পর্যটকেরা সাধারণত টোকিও, কিয়োটো ও ওসাকাকে দিয়ে ভ্রমণ শুরু করেন। পরে দেশটির সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলে তাঁরা ভেতরের দিকে যেতে চান, অর্থাৎ অচেনা অঞ্চল দেখতে চান।

রাউন্ট্রি বলেন, পর্যটকেরা প্রথমে পরিচিত শহরগুলোতে আসেন। এরপর সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দেশের আরও গভীরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়।

এর প্রভাব পড়ছে হোটেল ব্যবসাতেও। বারবার বিলাসভ্রমণে যাওয়া পর্যটকেরা একই বিখ্যাত স্থাপনা দেখতে আগের মতো আগ্রহী না–ও হতে পারেন। বরং তাঁরা শান্ত, নিরুপদ্রব কোনো অঞ্চলে গিয়ে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী খাবার কিংবা প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে চান।

এই চাহিদা বিবেচনায় জাপানের মিয়োকো অঞ্চলে সিক্স সেন্সেস ও কারুইজাওয়ায় রিজেন্টের মতো নতুন হোটেল চালুর পরিকল্পনা করছে আইএইচজি।

মালয়েশিয়াতেও একই ধরনের সুযোগ রয়েছে। রাউন্ট্রির হিসাবে, দেশটির মোট হোটেল কক্ষের প্রায় ৯ শতাংশ বিলাসবহুল শ্রেণির। অথচ দেশটিতে পর্যটনের ভিত্তি বেশ শক্তিশালী। আইএইচজি পেনাংয়ে একটি ইন্টারকন্টিনেন্টাল ও কুয়ালালামপুরে রিজেন্ট হোটেল চালুর পরিকল্পনা করছে।

নেভিস ট্যুরিজম অথরিটির প্রধান নির্বাহী আন্দিয়া রাভারিয়ের বলেন, তাঁদের পর্যটকেরা বেশি কিছু চান না; তাঁরা চান ‘বাস্তব কিছু’।

ক্যারিবীয় সাগরের নেভিস দ্বীপে তাই সবার জন্য সবকিছু আয়োজনের চেষ্টা করা হয়নি। রাভারিয়ের বলেন, সেখানে বিলাসভ্রমণের অর্থ হতে পারে নেভিসের পাহাড়ে চড়া, প্রাকৃতিক উষ্ণ প্রস্রবণে যাওয়া কিংবা স্থানীয় রাঁধুনির সঙ্গে খাবার তৈরি করা। তাঁর ভাষায়, এটা অনেকটা খালি পায়ে ধীরলয়ে হেঁটে গভীরভাবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা লাভ করা।

বিলাসভ্রমণকারীরা এখন অনেক সময় হোটেলকে কেন্দ্র করে ভ্রমণ পরিকল্পনা করছেন না। বরং কোনো কনসার্ট, বড় ক্রীড়া আয়োজন বা নামী রেস্তোরাঁয় খাবারের সুযোগই ভ্রমণের মূল কারণ হয়ে উঠছে। হোটেল তখন বৃহত্তর ভ্রমণ-অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে।

ফলে হোটেল ব্র্যান্ডগুলোর ওপর অতিথিকক্ষ ও লবির বাইরেও আরও কিছু করার চাপ তৈরি হচ্ছে।

আইএইচজি স্থানীয় সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। তাদের ‘ইনসাইডার্স এক্সপার্টিজ’ কর্মসূচির মাধ্যমে হোটেলের বিভিন্ন পর্যায়ে স্থানীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রযুক্তিও এই পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে। তবে ভ্রমণ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির পাশাপাশি স্থানীয় জ্ঞান ও মানবিক সেবার গুরুত্ব রয়ে গেছে।

একসঙ্গে একাধিক প্রজন্মের একসঙ্গে ভ্রমণ বিলাসভ্রমণের ধরন বদলে দিচ্ছে। পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে সময় কাটাতে চান, আবার প্রত্যেকের নিজস্ব পছন্দ ও ব্যক্তিগত পরিসর প্রয়োজন।

আইএইচজির রাউন্ট্রি বলেন, এখন একই পরিবারের একাধিক প্রজন্ম পর্যন্ত একসঙ্গে ভ্রমণ করছেন—সবচেয়ে বয়স্ক প্রজন্ম থেকে শুরু করে জেনারেশন বেটা (জন্ম ২০১৫–) পর্যন্ত।

রাউন্ট্রি বলেন, ২৮ বছর আগে তিনি ইন্টারকন্টিনেন্টালে কর্মজীবন শুরু করার সময় দেখেছেন, একসঙ্গে সাধারণত দুই প্রজন্ম ভ্রমণ করত। এখন সেখানে সাত প্রজন্ম পর্যন্ত একসঙ্গে যাচ্ছে। ফলে হোটেল ও রিসোর্টগুলোকে সাত প্রজন্মের ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।

দেখা যাচ্ছে, দামি হোটেল, জাঁকজমক ও বাড়তি সেবার চেয়ে ভ্রমণকারীদের কাছে এখন নিজের সময়, ব্যক্তিগত পরিসর ও স্বাধীনতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় সংস্কৃতি, নির্জনতা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা বিশেষ কোনো আয়োজন—নিজের মতো করে অভিজ্ঞতা নেওয়াই হয়ে উঠছে নতুন বিলাসিতা। ফলে ভ্রমণশিল্পও ব্যক্তিকেন্দ্রিক সেবায় ঝুঁকছে।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ