শাহজাদপুর সংবাদ

অর্থনীতিতে এখন সবচেয়ে উদ্বেগজনক সূচক কী

৪ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১০:৩০ AM

অর্থনীতিতে এখন সবচেয়ে উদ্বেগজনক সূচক কী

সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়ছে; কিন্তু ব্যবসার ঋণ বাড়ছে না। প্রথম প্রান্তিকের এই চিত্র বিনিয়োগ, কাজ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বড় উদ্বেগ।

অর্থবছরের তিন মাস, অর্থাৎ একটি প্রান্তিক শেষ হয়েছে। এ সময়ে সরকার কতটা আয় ও ব্যয় করেছে, ব্যাংক থেকে কত ঋণ নিয়েছে এবং বেসরকারি খাত কতটা ঋণ পেয়েছে, তা থেকেই অর্থনীতির আগামী দিনের গতিপথ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

এসব হিসাব শুধু অর্থনীতিবিদ বা নীতিনির্ধারকদের জন্য নয়। কারণ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, ব্যবসার ঋণ, সরকারি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার পরিস্থিতির সঙ্গে মানুষের আয় ও জীবনযাত্রা সরাসরি জড়িত।

অন্যদিকে বাজেট বাস্তবায়নের ত্রৈমাসিক পর্যালোচনার একটি আইনি বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। ২০০৯ সালের সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইনে বলা আছে, অর্থমন্ত্রী বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব সংগ্রহ ও ব্যয়ের গতিধারা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে পর্যালোচনা করবেন। পর্যালোচনার ফলাফল এবং প্রয়োজনীয় করণীয়সংক্রান্ত প্রতিবেদন সংসদের পরবর্তী অধিবেশনে উপস্থাপন করতে হবে।

তবে আগের সরকারের সময় দেখেছি, প্রথম তিন মাসের মূল্যায়ন কখনো সংসদে এসেছে ছয় মাস পর। শেষ দিকে নিয়মিত প্রতিবেদন উপস্থাপনও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এবার অন্তত সে রকম কিছু হবে না বলেই প্রত্যাশা।

তবে সরকারি পর্যালোচনার জন্য অপেক্ষা না করেও অর্থনীতির গতিপথ কিছুটা বোঝা সম্ভব। অর্থনীতির অনেক তথ্য-উপাত্ত এখন সহজেই পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের ওয়েবসাইটে প্রতি সপ্তাহে অর্থনীতির ১৯টি সূচক মাত্র দুই পৃষ্ঠায় প্রকাশ করে। এ বছরের ২৮ জুন ও ২৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদন দুটি পাশাপাশি রাখলে এক প্রান্তিকে অর্থনীতির কোন সূচকের উন্নতি হয়েছে, কোনটির অবনতি হয়েছে এবং কোথায় নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তার একটি প্রাথমিক চিত্র পাওয়া যায়।

সব সূচক নিয়ে বিশ্লেষণ করার সুযোগ নেই। কারণ, সব উপাত্ত তিন মাস পর্যন্ত হালনাগাদ করা নেই। তবে সামগ্রিকভাবে বলা যায়, খুব ভালো অবস্থায় আছে এমন কোনো সূচক নেই; বরং বলা যায়, পতন ঠেকানো গেছে; কিন্তু উত্তরণের ছাপ নেই।

সূচকগুলো বিশ্লেষণ করলে পাঁচটি প্রশ্ন উঠবেই। যেমন মূল্যস্ফীতির চাপ কি সত্যিই কমেছে? সরকারি ঋণ কতটা বেড়েছে? বেসরকারি খাতের ঋণ কেন এত কম? টাকার সরবরাহ কি বেশি বাড়ছে? বৈদেশিক মুদ্রা ও রিজার্ভের অবস্থার উন্নতি কতটা টেকসই?

তবে আজকের জন্য আমি এখান থেকে দুটি প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করতে চাই। যেমন ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারি ও বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি। দেখা যাচ্ছে, গত ২৮ জুন দেশে সরকারি ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৩০ দশমিক ৩৭ শতাংশ, তিন মাস পরে সেটি বেড়ে হয়েছে ৩৪ দশমিক ১১ শতাংশ। অন্যদিকে একই সময়ে বেসরকারি খাতের ঋণ ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে আরও কমে হয়েছে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ।

উপাত্ত দুটি খুবই উদ্বেগজনক। কারণ, বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি গত ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এ থেকে অর্থনীতির একটি অস্বস্তিকর ছবি স্পষ্ট হয়। দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকব্যবস্থায় ঋণের প্রবৃদ্ধি ক্রমেই সরকারমুখী হচ্ছে; আর বেসরকারি খাতের ঋণ স্থবির হয়ে আছে।

আমরা জানি, সরকারের আয় অনেক কম। অথচ ব্যয় বেড়েই চলছে। এর ফলে সরকারকে ব্যাংকের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। আবার এমন নয় যে সরকার বেশি ঋণ নিচ্ছে বলে বেসরকারি খাত কম পাচ্ছে। আসলে বিনিয়োগের অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি খাত ঋণ নিচ্ছে না। সুদের হার বেশি বলে ঋণ সস্তাও নয়। ফলে প্রয়োজন ছাড়া কেউ খুব একটা ব্যাংকের কাছে যাচ্ছেন না। এই মুহূর্তে জ্বালানিসংকট অন্যতম বাধা। উচ্চ সুদ হারের কথা কেউ কেউ বলেন। তবে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক তথ্য থেকে উচ্চ সুদহারকেই বিনিয়োগ না হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে বলা যাচ্ছে না।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন ইনস্টিটিউট অব পাবলিক ফাইন্যান্স নামের একটি সংস্থা আছে। এই সংস্থার জার্নালে ২০২৫ সালে একটি গবেষণা প্রকাশ করেছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের দুই যুগ্ম সচিব আবদুল মান্নান ও আসিফ ইকবাল। তাঁদের গবেষণার মূল কথা হলো অর্থনীতি ভালো করলে, প্রবৃদ্ধি হলে এর প্রভাবে পরবর্তী সময়ে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ে। ব্যবসায়ীরা যদি বাজার ও অর্থনীতি বড় হওয়ার সম্ভাবনা না দেখেন, তাহলে শুধু সুদ কমানো বা প্রণোদনা দিয়ে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো কঠিন।

সমস্যা এখানেই। আমাদের গড় প্রবৃদ্ধি কমে প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বাড়ছে কম হারে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এতে হ্রাস পেয়েছে সামগ্রিক চাহিদা। জ্বালানিসংকটের সমাধান কবে হবে কেউ জানি না। এই যদি অবস্থা হয়, তাহলে বিনিয়োগ কে করবেন?

চার বছর ধরেই অর্থনীতির সবচেয়ে খারাপ সূচক উচ্চ মূল্যস্ফীতি। এটিকে এক পাশে রাখলে, অর্থনীতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক সূচক সম্ভবত বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি এবং সরকারের অব্যাহত ব্যাংকঋণ। কেননা, ব্যাংকের ঋণ উৎপাদনশীল বেসরকারি খাতের পরিবর্তে ক্রমে সরকারি অর্থায়নের দিকে যাচ্ছে। এতে কিছুদিন সরকার ব্যয় চালাতে পারবে; কিন্তু টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। এর দ্রুত সমাধান না হলে আজকের দুর্বল ঋণ প্রবৃদ্ধিই আগামী দিনের কম বিনিয়োগ, কম কর্মসংস্থান এবং কম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রূপ নেবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তা হবে বিপজ্জনক একটি চিত্র।

লেখক: প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ