শাহজাদপুর সংবাদ

যে বাবা পৃথিবী দেখেন না, তিনি এখন ছেলের পৃথিবীটা বাঁচাতে চান

৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১১:৫৩ AM

যে বাবা পৃথিবী দেখেন না, তিনি এখন ছেলের পৃথিবীটা বাঁচাতে চান

আয়নার সামনে দাঁড়ালে এখন একটু খুশি হয় মুজাহিদ রাইয়ান নূর। ছোট্ট মুখটা আয়নার দিকে এগিয়ে দেয়। ডান চোখ দিয়ে বাঁ চোখের জায়গায় তাকিয়ে থাকে। কয়েক দিন আগেও সেখানে ছিল একটি গর্ত। মাত্র দুই বছর দুই মাস বয়সী শিশুটির বাঁ চোখটি ক্যানসারের কারণে অস্ত্রোপচার করে তুলে ফেলতে হয়েছে। কয়েক দিন আগে সেই জায়গায় লাগানো হয়েছে কৃত্রিম চোখ।

জন্মের মাত্র দুই মাস বয়সে মুজাহিদের চোখে ধরা পড়ে ক্যানসার-রেটিনোব্লাস্টোমা। ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় গত জুলাইয়ে তার বাঁ চোখটি অস্ত্রোপচার করে তুলে ফেলতে হয়। গত ৩০ আগস্ট কৃত্রিম চোখ লাগিয়ে বাড়ি ফিরেছে সে। পরদিন মুজাহিদের মা মনিকা আক্তারের সঙ্গে ভিডিও কলে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁর পাশে বসেই খেলছিল মুজাহিদ। মা বললেন, ‘মুজাহিদ, চোখ দেখাও।’ কিছুক্ষণের জন্য মায়ের দিকে তাকাল শিশুটি। ডান চোখের তুলনায় কৃত্রিম চোখটি একটু ছোট।

মুজাহিদের বাবা মো. শাহীনুর হক নিজেও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। দেড় বছর বয়সে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হারিয়েছেন দুই চোখের আলো।

একজন বাবা, যিনি নিজে পৃথিবী দেখেন না, এখন তাঁর সবচেয়ে বড় লড়াই একমাত্র ছেলের বাকি থাকা একটি চোখের আলো বাঁচিয়ে রাখা। ছেলে যেন অন্তত নিজের চোখে পৃথিবীটা দেখতে পারে।

দিশাহারা মা-বাবা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২০১৭ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করেন শাহীনুর হক। এখন পর্যন্ত সরকারি বা স্থায়ী কোনো চাকরি হয়নি তাঁর। ২০২২ সালে প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু নিয়োগ পাননি। শাহীনুরসহ ২৮০ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিষয়টি নিয়ে রিট করেছিলেন। মামলাটি এখনো আদালতে বিচারাধীন।

বর্তমানে বনানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মাসে ১০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করেন শাহীনুর। থাকেন মিরপুরের জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের কর্মজীবী হোস্টেলে। সিটভাড়া মাসে ৩০০ টাকা, খাবারের খরচ নিজের।

অন্যদিকে বাড়িতে স্ত্রী ও একমাত্র ছেলে। ছেলের চিকিৎসার জন্য নিয়মিত ঢাকায় আসতে হয়। থাকা, যাতায়াত আর চিকিৎসার খরচ মিলিয়ে প্রতিদিনই তাঁর চাপ বাড়ছে।

প্রথম আলোর কার্যালয়ে বসে ৩১ আগস্ট স্ত্রী মনিকার সঙ্গে মুঠোফোনে ভিডিও কলে কথা বলছিলেন শাহীনুর। স্ত্রী, ছেলের চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলছিলেন, আর পাশে খেলছিল দুই বছরের মুজাহিদ।

শাহীনুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি নিজে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। অনেক কষ্ট করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়েছি। একমাত্র ছেলের চোখেরও এই অবস্থা। ছেলের চিকিৎসার পেছনে সময় দিতে হয় বলে স্থায়ী চাকরি করা কঠিন। ছেলে ও ছেলের মাকে ঢাকায় এনে রাখার সামর্থ্যও নেই। ছেলের চিকিৎসায় বন্ধু-স্বজনেরা সহায়তা করেছেন, তাঁরাই বা আর কত করবেন? সব মিলিয়ে আমরা দিশাহারা।’

বাঁচিয়ে রাখতে হবে ডান চোখটি

মুজাহিদের বাবা জানিয়েছেন, তার এখনো ডান চোখে দৃষ্টি আছে। কিন্তু সেই চোখটি ভালো রাখতে নিয়মিত চিকিৎসা ও ফলোআপ প্রয়োজন। চোখের ভেতরে ক্যানসারের অবস্থা পরীক্ষা করতে তাকে অচেতন করতে হয়। প্রয়োজন হয় লেজার চিকিৎসারও। একবারের ফলোআপেই ২৫ হাজার টাকার বেশি খরচ হয় বলে জানিয়েছেন তিনি।

মুজাহিদের ক্যানসার ধরা পড়ার শুরু থেকেই রাজধানীর উত্তরার বাংলাদেশ আই হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে। অধ্যাপক শওকত আরা সাকুর তার চোখের অস্ত্রোপচার করেছেন। এ পর্যন্ত লেজার থেরাপির পাশাপাশি মুজাহিদকে ১০টি কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছে। তাতেই খরচ হয়েছে কয়েক লাখ টাকা। ডান চোখের চিকিৎসা কত দিন চলবে, আর কত টাকা লাগবে, তার কোনো নির্দিষ্ট হিসাব জানেন না মুজাহিদের মা-বাবা।

গত দুই বছরে বন্ধু, স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহায়তায় ছেলের চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন শাহীনুর ও মনিকা। প্রয়োজন মেটাতে করতে হয়েছে ধারদেনাও। তাঁদের এখন একটাই চাওয়া, ছেলের অন্তত একটি চোখ যেন ভালো থাকে। মুজাহিদ যেন দেখতে পারে পৃথিবীটা।

শাহীনুর বলেন, ‘ছেলের চোখটি ভালো রাখার জন্য ১০০ টাকা, এক হাজার টাকা, যে যেমন পারেন, যদি সহায়তা করেন, তাহলে চিকিৎসাটা চালিয়ে নিতে পারব। টাকার অভাবে ছেলের চিকিৎসা হবে না, তা সহ্য করা যেকোনো মা-বাবার জন্যই কষ্টের।’

কিছুক্ষণ থেমে শাহীনুর আবার বলেন, ‘আর আমার মতো আমার ছেলেটারও দুই চোখ নষ্ট হয়ে যাবে, এটা মেনে নেওয়াটাও আমার জন্য খুব কঠিন।’

দৃষ্টি হারানো এক বাবার এখন তাই একটাই লড়াই, একমাত্র ছেলের বাকি থাকা চোখটির আলো যেন নিভে না যায়।

মুজাহিদ রাইয়ান নূরের চিকিৎসায় সহযোগিতার ঠিকানা:

হিসাবের নাম: মো. শাহীনুর হক জয় (Md. Shahinur Haque Joy)

হিসাব নম্বর: ৫৫০৬১০১০১৩২৪৪

ব্যাংক: সোনালী ব্যাংক পিএলসি, চুড়াইন শাখা, ঢাকা

বিকাশ, নগদ ও রকেট: ০১৯১১২৪১০৯৮ (মুজাহিদের বাবা)

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ