শাহজাদপুর সংবাদ

একটি রেডিও, কত স্মৃতি

৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১২:২১ PM

একটি রেডিও, কত স্মৃতি

প্রিয় পাঠক, প্রথম আলোয় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে আপনাদের লেখা। আপনিও পাঠান। গল্প-কবিতা নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। আপনার নিজের জীবনের বা চোখে দেখা সত্যিকারের গল্প; আনন্দ বা সফলতায় ভরা কিংবা মানবিক, ইতিবাচক বা অভাবনীয় সব ঘটনা। শব্দসংখ্যা সর্বোচ্চ ৬০০। দেশে থাকুন কি বিদেশে; নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ পাঠিয়ে দিন এই ঠিকানায়: readers@prothomalo.com

শুধু বিনোদনের জন্য নয়, ছোটবেলায় রেডিও যেন ছিল দূরের পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের গ্রামের যোগাযোগের একমাত্র সূত্র।

‘দুপুর ১২টা বেজে ১৫ মিনিট হয়ে ১০ সেকেন্ড, শুরু হচ্ছে রকমারি গানের অনুষ্ঠান “গীতালি”। অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় আছি আমি হেনা কবির।’

আবার কখনো ভেসে আসত, ‘সন্ধ্যা ৭টা বেজে ৩৫ মিনিট। সৈনিক ভাইদের জন্য অনুষ্ঠান “দুর্বার”। আমি হাবিবুর রহমান জালাল আছি অনুষ্ঠান ঘোষণায়।’ শুরু হচ্ছে অনুরোধের আসর। রাত ৯টায় ‘উত্তরণ’। উপস্থাপনায় শফি কামাল। সকাল সাড়ে ৭টায় ‘দর্পণ’, প্রযোজনায় দেলোয়ার হাসান।

দুপুরে সিনেমার উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়ে ১৫ মিনিটের একটি অনুষ্ঠান হতো, উপস্থাপনায় নাজমুল হোসেন। প্রতি শনিবার রাত ৯টায় হতো শ্রোতাদের চিঠিপত্রের উত্তর দেওয়ার অনুষ্ঠান ‘বিহঙ্গ’। উপস্থাপনায় কাজী আরিফ ও প্রজ্ঞা লাবণী। ফুটবল ও ক্রিকেট খেলার ধারাভাষ্যও ছিল রেডিও শোনার অন্যতম আকর্ষণ। আবদুল হামিদ ও খোদা বক্স মৃধার কণ্ঠে খেলার ধারাভাষ্য শুনতাম মুগ্ধ হয়ে। খবর পড়তেন সরকার কবির উদ্দিন, কাফি খান, রোকেয়া হায়দার। পরে তাঁদের কণ্ঠ ‘ভয়েস অব আমেরিকা’র খবরেও শুনেছি। বিশেষ করে আবদুল হামিদ খান, খোদা বক্স মৃধা ও সরকার কবির উদ্দিনের কণ্ঠ আমাকে গভীরভাবে আলোড়িত করত। তাঁদের কণ্ঠে এমন এক মাধুর্য ও ব্যক্তিত্ব ছিল, যা মুগ্ধ করে রাখত।

তাঁদের কণ্ঠ শুনতে শুনতেই আমার মনে বেতারে অনুষ্ঠান করার স্বপ্ন জেগেছিল। তখন হয়তো বুঝিনি, কণ্ঠও মানুষের মনে স্বপ্ন জাগাতে পারে। কিন্তু তাঁদের কণ্ঠই আমাকে সেই স্বপ্নের দিকে টেনে নিয়েছিল।

সত্তরের দশকের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে আমাদের বাড়িতে একটি ফিলিপস রেডিও এল। দাম পড়েছিল সম্ভবত ২৫০ টাকা। তখন গ্রামে হাতে গোনা দু-তিনটি বাড়িতে রেডিও ছিল। ফলে আমাদের বাড়ির রেডিও শুধু আমাদের পরিবারের ছিল না, যেন পুরো পাড়ারই একটি সম্পদ হয়ে উঠেছিল। সন্ধ্যা নামলেই কেউ না কেউ এসে উঠানে বসত। রেডিও চালু হতো। এরপর সবাই চুপচাপ শুনত।

আমরা গান শুনতাম, খবর শুনতাম, খেলা শুনতাম, নাটক শুনতাম আর কল্পনায় চলে যেতাম অচেনা এক জগতে। তখন বছরে বছরে এক-দুবার জসীমউদ্‌দীনের নাটক মধুমালা ও বেদের মেয়ে প্রচারিত হতো। নাটক প্রচারের প্রায় এক মাস আগে থেকেই রেডিওতে নাটকের নাম, দিন ও তারিখ জানিয়ে ঘোষণা করা হতো। গ্রামের সবাই খবরটি জেনে যেতেন।

নাটক হতো পূর্ণিমার কাছাকাছি রাতে, খাঁটি জোছনায়। যেন কোনো বাড়িতে গিয়ে নাটক শুনতে কারও অসুবিধা না হয়। নাটকের রাতে আমাদের উঠান ভরে যেত পাড়ার মানুষে। মা উঠানে পাটি বিছিয়ে দিতেন সবার বসার জন্য। ছোট-বড় সবাই গোল হয়ে বসতেন। মনে হতো, ছোট্ট উঠানটাই বুঝি একটি মঞ্চ। নাটক শেষ হতে হতে বেজে যেত রাত সাড়ে ১১টা।

মায়ের প্রিয় অনুষ্ঠান ছিল ‘উত্তরণ’। আর ‘উত্তরণ’-এর শুরুতে থাকত ‘বিশ্ব বিচিত্রা’। সেটিই ছিল মায়ের সবচেয়ে প্রিয়। মা মন দিয়ে অনুষ্ঠান শুনতেন। কখনো কখনো অনুষ্ঠান শুনতে শুনতেই রেডিও বন্ধ না করে ঘুমিয়ে পড়তেন। অন্য ঘরে শুয়ে থাকা আমি মাঝেমধ্যে শুনতাম—রেডিও থেকে একটানা ঘর্ঘর শব্দ হচ্ছে। ঘুম ভেঙে গেলে বুঝতাম, মা রেডিও বন্ধ না করেই ঘুমিয়ে পড়েছেন। তখন আমাকে উঠতে হতো, রেডিও বন্ধ করতে।

এক রাতে এমন এক ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলাম, যা আজও ভুলতে পারি না। গভীর রাতে রেডিওর ঘর্ঘর শব্দ। বুঝলাম, আজও রেডিও বন্ধ না করে ঘুমিয়ে পড়েছেন মা। দরজা খুলে উঠানে পা দিয়েই দেখি, কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে কাউকে ভালো করে বোঝা যাচ্ছিল না। হঠাৎ আমার মনে হলো, চোর! আমি চিৎকার করে উঠলাম, ‘চোর! চোর!’ আমার চিৎকার শুনেই ওরা ভোঁ দৌড় দিল। আমিও তার পিছু নিলাম। আমার চিৎকারে পাড়ার লোকজন ঘুম থেকে উঠে গেল। চারদিকে হইচই—‘চোর! চোর!’ আমি তখন চোরের পেছনে ছুটতে ছুটতে প্রায় আধা কিলোমিটার চলে গেছি। হঠাৎ খেয়াল হলো, আমার সঙ্গে তো কেউ নেই। এদিকে বাড়িতে আমাকে না দেখে কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেছে। কেউ বুঝতে পারছেন না, আমি কোথায় গেলাম। আমি ফিরে এলাম।

ঘটনার কয়েক দিন পর পাড়ার একটি ছেলে জ্বরে পড়ল। আমি ছেলেটাকে দেখতে গেলাম। আমাকে দেখে তাকে বেশ বিচলিত মনে হলো। কেন এমন করল, তখন বুঝতে পারিনি। অসুস্থ মানুষ, তাই আর কিছু ভাবিনি।

কয়েক দিন পর মা আমাকে বললেন, ‘ওই ছেলেটাকে দেখতে গিয়েছিলি না? ওকে কিছু বলিস না।’ আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন?’ মা তখন আসল কথাটা বললেন। সেই রাতে আমি যাকে চোর বলে তাড়া করেছিলাম, সে নাকি ওই ছেলেটিই! সে আমাদের বাড়িতে চুরি করতে এসেছিল। আমার তাড়া খেয়ে ভয়েই নাকি তার জ্বর এসেছিল। পরে ছেলেটি মায়ের কাছে এসে ক্ষমা চেয়েছিল।

রেডিওটা বহু আগেই হারিয়ে গেছে, কিন্তু তার ঘর্ঘর শব্দটি যেন আজও শুনতে পাই। আর সেই শব্দ শুনলে মনে পড়ে মায়ের মায়াময় মুখ, জোছনা রাত এবং এক ছেলের ভয়ে জ্বর আসার গল্প।

জহুরুল হক বুলবুল, সাবেক সহকারী অধ্যাপক, কালিহাতী শাজাহান সিরাজ কলেজ, টাঙ্গাইল

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ