শাহজাদপুর সংবাদ

যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের ড্রোনের গতি কমার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের হাত, কী বলছেন ইলন মাস্ক

১৫ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১২:২২ PM

যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের ড্রোনের গতি কমার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের হাত, কী বলছেন ইলন মাস্ক

ইউক্রেনের কিছু অস্ত্রের গতি সীমিত করে দিয়েছে ইলন মাস্কের মহাকাশবিষয়ক সংস্থা স্পেসএক্সের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান স্টারলিংক। এতে ঘণ্টায় ১০০ মাইলের (১৬০ কিলোমিটার) বেশি গতিতে চলা অস্ত্রগুলো স্টারলিংকের ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের সংযোগ হারাচ্ছে। তবে এই বিধিনিষেধের পেছনে মার্কিন সরকারের ভূমিকা থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ইলন মাস্ক।

রাশিয়ার লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন পরিচালনা করা এবং নিজেদের আকাশসীমা সুরক্ষিত রাখতে ইউক্রেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম স্টারলিংক। তবে গত মঙ্গলবার রাতে ইউক্রেন জানায়, স্টারলিংক অপ্রত্যাশিতভাবে দেশটির অস্ত্রে নতুন গতিসীমা আরোপ করায় যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের সামরিক অভিযান ব্যাহত হচ্ছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির এক উপদেষ্টা বলেছেন, তাঁর ধারণা, অস্ত্রের গতি সীমিত করার এই ঘটনা কাকতালীয় নয়। কিয়েভ ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।

ইলন মাস্ক বলেছেন, স্টারলিংকের সামরিক ও গোয়েন্দা পরিষেবা স্টারশিল্ড নিয়ন্ত্রণ করে মার্কিন সরকার। তিনি বলেন, ‘অস্ত্রের গতি বা ব্যবহারের ওপর যেকোনো বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং শেষ পর্যন্ত [মার্কিন প্রেসিডেন্ট]।’

ইউক্রেনের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা স্টারলিংকের সংযোগ স্বাভাবিক করার জন্য ইলন মাস্কের কাছে একের পর এক অনুরোধ পাঠাতে থাকেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এসব বার্তার জবাব দেন মাস্ক। এর আগে ব্রিটিশ সাংবাদিক পিয়ার্স মরগানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও এ নিয়ে কথা বলেন।

জেলেনস্কি বলেন, ‘আমার মনে হয়, এটা হয়তো ভুলবশত হচ্ছে বা বড় কোনো কারিগরি সমস্যার কারণে। আমি জানি না। তবে আমরা সংযোগটি আবার চালু করার অনুরোধ জানাচ্ছি।’

স্টারলিংক গত মঙ্গলবার রাতে আকস্মিকভাবে একটি নতুন নিয়ম চালু করে। এই নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ডিভাইস ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চললে তার ইন্টারনেট সংযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ইউক্রেনের সামরিক অভিযানে। ইউক্রেনের যেসব অত্যাধুনিক ড্রোন বা অস্ত্র এর চেয়ে দ্রুতগতিতে লক্ষ্যবস্তুর দিকে যাচ্ছিল, সংযোগ হারিয়ে সেগুলো মাঝপথেই অকেজো হয়ে পড়ে।

ইউক্রেনের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরোভ জানান, পরদিন অর্থাৎ বুধবার সন্ধ্যার দিকে ইন্টারনেট সংযোগ কিছুটা স্বাভাবিক করা হয়। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘ইউক্রেনকে রক্ষা করতে হলে স্টারশিল্ডের ওপর থেকে গতিসীমার এই কড়াকড়ি পুরোপুরি তুলে নেওয়া এখন সময়ের দাবি।’

ইন্টারনেট সংযোগ কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় ওই এক্স পোস্টে ইলন মাস্ককে ধন্যবাদ জানান মিখাইলো ফেদোরোভ। তিনি এই সমর্থন ধরে রাখারও অনুরোধ করেন। এর ঘণ্টাখানেক পর সেই পোস্টের উত্তর দেন মাস্ক। ইউক্রেন যুদ্ধে তাঁর প্রতিষ্ঠানের অবস্থান ও পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন তিনি।

ইলন মাস্ক বলেন, স্টারশিল্ড ব্যবস্থাগুলোর মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ আসলে মার্কিন সরকারের হাতে। এর গতি কমানো বা ব্যবহারের ওপর কোনো ধরনের কড়াকড়ি আরোপ করার সিদ্ধান্ত মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নেন।

ইলন মাস্ক আরও স্পষ্ট করে বলেন, তাদের মূল সেবা ‘স্টারলিংক’ কেবল বেসামরিক মানুষ এবং আত্মরক্ষার খাতিরে ব্যবহারের জন্য তৈরি। কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সামরিক অভিযানে ইন্টারনেট সরবরাহ করা নীতিগতভাবে ঠিক নয়। মাস্ক মার্কিন সরকারের ওপর দায় চাপালেও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্টারলিংক ও স্টারশিল্ড—দুটির মালিকই ইলন মাস্কের স্পেসএক্স। তবে দুটির কাজ আলাদা। স্টারলিংক সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য, যা দুর্গম এলাকায় কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে ইন্টারনেট পৌঁছে দেয়। আর স্টারশিল্ড তৈরি করা হয়েছে শুধু সরকারি ও সামরিক প্রয়োজনে।

গত মঙ্গলবার রাতে যখন হঠাৎ ইউক্রেনের এই ইন্টারনেট সংযোগে কড়াকড়ি করা হয়, ঠিক সেই সময়েই দেশটির ওপর বড় ধরনের হামলা শুরু করে রাশিয়া।

ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাশিয়ার ওই হামলায় কিয়েভে বেশ কয়েকজন নিহত হন। ইউক্রেনীয় বাহিনীর সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে নিশানা করে ওই হামলা চালানো হয়েছিল।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাশিয়ার এই হামলাকে অন্যতম বড় আক্রমণ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ঝাঁকে ঝাঁকে ধেয়ে আসা রুশ ড্রোনের বড় একটি অংশ তাদের প্রতিরক্ষা বাহিনী আকাশেই ধ্বংস করে দিয়েছে। তবে কিছু ড্রোন ঠিকই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।

হামলার ফলে পুরো ইউক্রেনে অন্তত ছয় লাখ মানুষ বিদ্যুৎ–বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ড্রোনগুলো আঘাত করার আগে তাদের কোনো সতর্কসংকেত বা সাইরেন দেওয়া হয়নি।

এদিকে গতকাল বুধবার সকালে টেলিগ্রামে এক বার্তায় জেলেনস্কির উপদেষ্টা সের্হি বেসক্রেস্টনভ এই পরিস্থিতি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি সরাসরি বলেন, একদিকে স্টারলিংকের গতি কমিয়ে দেওয়া আর অন্যদিকে রাশিয়ার এত বড় হামলা— এ দুই ঘটনা কখনোই কাকতালীয় হতে পারে না। এর পেছনে নিশ্চিতভাবেই বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির যোগসূত্র রয়েছে।

রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোগুলোয় ইউক্রেন ক্রমাগত হামলা চালানোয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ অসন্তুষ্ট। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেন, ট্রাম্পের দেওয়া জ্বালানিসংক্রান্ত যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে রাজি না হলে ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধের হুমকি দিয়েছিল ওয়াশিংটন। যদিও গত মঙ্গলবার ট্রাম্প এই দাবি পুরোপুরি নাকচ করে দেন।

এদিকে গতকাল এক সংক্ষিপ্ত সফরে যুক্তরাজ্যে যান জেলেনস্কি। সেখানে রাশিয়ার কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ৩ লাখ টন ডিজেল আমদানি চুক্তির বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন তিনি।

ব্রিটিশ সাংবাদিক পিয়ার্স মরগান জেলেনস্কির কাছে জানতে চান, এ চুক্তির কারণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ক্ষুব্ধ কি না। জবাবে জেলেনস্কি বলেন, ‘সত্যি বলতে, হ্যাঁ...তবে পুরো বিষয়টি আমার রাগ বা আবেগের চেয়েও অনেক বেশি জটিল।’

মাত্র এক দিনের সফরে লন্ডনে পৌঁছালে ডাউনিং স্ট্রিটে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম জেলেনস্কিকে স্বাগত জানান। এ সময় রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন তিনি।

জেলেনস্কি যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর আগেই দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঘোষণা দেয়, ইউক্রেনকে বিশেষ ধরনের হালকা বহুমুখী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করার গতি আরও বৃদ্ধি করা হবে। রাশিয়ার ড্রোন হামলা ঠেকাতে এবং আকাশেই রুশ ড্রোন ধ্বংস করতে ইউক্রেনীয় বাহিনী এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো বেশ কার্যকরভাবে ব্যবহার করছে।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ

যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের ড্রোনের গতি কমার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের হাত, কী বলছেন ইলন মাস্ক | শাহজাদপুর সংবাদ