মেসির বিদায়ের রাতে ওতামেন্দিরও শেষ গান
৭ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১১:২৯ AM

লিওনেল মেসির বিদায় বলেই রাতটা আলাদা ছিল। মনুমেন্তালে আলো ছিল তাঁকে ঘিরে। গ্যালারির চোখ ছিল তাঁর দিকে। কিন্তু আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে একই রাতে আরেকজনও শেষবারের মতো মাঠে নেমেছিলেন। নিকোলাস ওতামেন্দি।
বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ে মেসির মতোই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলেছেন আর্জেন্টিনার এই ৩৮ বছর বয়সী ডিফেন্ডারও। তাঁরও বিদায়টা হয়েছে স্মরণীয়।
ম্যাচের প্রথম গোলটি যে তাঁর!
২০২৬ বিশ্বকাপের পরই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন ওতামেন্দি। বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচটাকেই ভেবেছিলেন শেষ। কিন্তু লিওনেল স্কালোনি তাঁকে এই ফিফা আন্তর্জাতিক বিরতিতে শুধু বেনিন ম্যাচের জন্য দলে ডাকেন। কারণটা ছিল স্পষ্ট, মেসির বিদায়ের দিন সতীর্থদের একজন হয়ে পাশে থাকার সুযোগ। সুযোগটা ওতামেন্দি পেয়েছেন। তার চেয়েও বেশি কিছু পেয়েছেন।
ক্রিস্তিয়ান ‘কুতি’ রোমেরোর সঙ্গে এদিন আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ সামলেছেন তিনি। বেনিন প্রথমার্ধে কয়েকবার আর্জেন্টিনাকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। কিন্তু ওতামেন্দি ছিলেন নিজের জায়গায় দৃঢ়। প্রতিপক্ষকে আর্জেন্টিনার গোলমুখের কাছে খুব বেশি যেতে দেননি।
তারপর দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই এল সেই মুহূর্ত। মেসির নিখুঁত ক্রস। বক্সে একেবারে অরক্ষিত ওতামেন্দি। পা বাড়িয়ে বল জালে পাঠালেন। শেষ ম্যাচে শেষ গোল। এর চেয়ে সুন্দর বিদায়ের চিত্রনাট্য আর কী হতে পারে!
কিছুক্ষণ পর তাঁকে তুলে নেওয়া হলো। লিসান্দ্রো মার্তিনেজ মাঠে নামলেন। আর ওতামেন্দি যখন মাঠ ছাড়ছেন, তখন মনুমেন্তাল উঠে দাঁড়িয়েছে। চারপাশে করতালি। বিদায়ের আগে একে একে সতীর্থদের সঙ্গে আলিঙ্গন করলেন। হাত মেলালেন। শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরলেন অধিনায়ক মেসিকেও।
পরে টিওয়াইসি স্পোর্টসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওতামেন্দি বললেন, ‘এই ম্যাচটা ছিল বাড়তি পাওয়া। আমি ভেবেছিলাম, বিশ্বকাপের আগের ম্যাচটিই আমার শেষ। কারণ তখনই বিদায় বলে দিয়েছিলাম। কিন্তু মেসি আমাকে এখানে আসতে বলল। ওর বিদায়ের অংশ হতে, এই ঐতিহাসিক দিনটা উপভোগ করতে বলল। জাতীয় দলের হয়ে ১৭ বছর কাটিয়েছি। আর এই ১৭ বছর ওর সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারাটা ছিল অসাধারণ।’
শেষ ম্যাচে গোল করার আনন্দের কথাও আলাদা করে বলেছেন তিনি, ‘আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে নিজের শেষ ম্যাচে শেষ গোলটা করা এমন একটা ব্যাপার, যেটা আমি সারা জীবন মনে রাখব।’
মেসির বিদায় নিয়ে বলতে গিয়ে ওতামেন্দির কণ্ঠেও ছিল আবেগ, ‘ও একেবারে মাটির মানুষ। এটা ওর শেষ ম্যাচ, ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়। জানতাম, এই ম্যাচটা একদিন আসবেই। একই সঙ্গে দুঃখ আর আনন্দ হচ্ছিল। কারণ ওর বিদায়টা ঠিক যেভাবে প্রাপ্য ছিল, সেভাবেই হয়েছে।’
মেসির সঙ্গে সম্পর্কটা কতটা গভীর, সেটাও বোঝা গেছে তাঁর কথায়, ‘আমরা ওর খুব কাছের মানুষ ছিলাম। হয়তো কখনো কখনো ওকে কিছু কথা বলার থাকত, কিন্তু বলা হয়ে ওঠেনি। কারণ তখন মনে হয়, কিছু বলার চেয়ে ওর সঙ্গে সময়টা উপভোগ করাই ভালো। আমি ওকে ধন্যবাদ জানাই। ও পৃথিবীর সবচেয়ে বিনয়ী মানুষগুলোর একজন। আর ফুটবল দিয়ে সে যা করেছে, সেটাও অবিশ্বাস্য। সে আর্জেন্টিনার পতাকাটা অনেক উঁচুতে রেখে গেছে।’
স্কালোনি যুগের অন্যতম স্তম্ভ ছিলেন ওতামেন্দি। শুরু থেকেই ছিলেন এই দলের সঙ্গে। সময়ের সঙ্গে হয়ে উঠেছেন আর্জেন্টিনার জার্সিতে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়দের একজন। এই সময়ে তাঁর অর্জনের তালিকাও কম নয়। একটি বিশ্বকাপ। দুটি কোপা আমেরিকা। একটি ফিনালিসিমা। বিশ্বকাপের ইতিহাসেও তাঁর জায়গাটা আলাদা। চারটি বিশ্বকাপে খেলেছেন ওতামেন্দি। ২০১০ সালে ৩ ম্যাচ, ২০১৮ সালে ৪ ম্যাচ, ২০২২ সালে ৭ ম্যাচ এবং ২০২৬ সালে ৭ ম্যাচ। আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা খেলোয়াড় মেসি। এরপরই ওতামেন্দি। ডিয়েগো ম্যারাডোনার সমান, ২১টি!
মেসির বিদায়ের রাতে তাই আরেকটি বিদায়ও লেখা হয়ে গেল। একজন ছিলেন আর্জেন্টিনার ফুটবলের সবচেয়ে বড় গল্প। আর অন্যজন সেই গল্পের এক নির্ভরযোগ্য চরিত্র।
সূত্র: প্রথম আলো
