এক গোল, দুই অ্যাসিস্টে বিদায় রাঙালেন মেসি
৭ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৩:৪৫ AM

বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোর ৫টায় বেনিনের বিপক্ষে মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা। নীল-সাদা জার্সিতে এটাই লিওনেল মেসির শেষ ম্যাচ।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে যে জার্সি গায়ে কত স্বপ্ন দেখেছেন, কত রাতকে ভোর করেছেন, কতবার কাঁদিয়েছেন আর হাসিয়েছেন কোটি কোটি মানুষ, সেই জার্সি আজ শেষবারের মতো গায়ে চাপাবেন ৩৯ বছর বয়সী মেসি।
ম্যাচটি তাই শুধু আরেকটি ম্যাচ নয়। এটা বিদায়ের রাত। স্মৃতির রাত। একজন কিংবদন্তিকে শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার জার্সিতে দেখার রাত।
মনুমেন্তালের গ্যালারি থেকে বুয়েনস এইরেসের রাজপথ, আর্জেন্টিনা থেকে বাংলাদেশ। আজ থাকবে মেসিকে প্রিয় জার্সিতে শেষবার দেখার অপেক্ষা। কখন মাঠে নামছেন তিনি, সতীর্থরা কীভাবে তাঁকে বিদায় জানাচ্ছেন, গ্যালারিতে কী হচ্ছে, আর ম্যাচ শেষে সেই বহু প্রতীক্ষিত বিদায়ী আয়োজন কেমন হয়, সবই থাকছে প্রথম আলো অনলাইনের এই লাইভ ব্লগে।
ম্যাচ শুরুর আগে থেকে বিদায়ের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা থাকব আপনার সঙ্গে। থাকবে মুহূর্তে মুহূর্তে আপডেট, ছবি, ভিডিও, মেসিকে ঘিরে নানা গল্প আর আবেগের নানা খণ্ডচিত্র।
একটা মানুষ, একটা জার্সি, একটা যুগ। চলুন, একসঙ্গে দেখি তার শেষ দৃশ্যপট।
মনুমেন্তাল, রোজারিও কিংবা পুরো আর্জেন্টিনা। সময় যেন একটু থমকে ছিল দুদিন ধরে। জন্মশহর তাঁর জন্য বিছিয়ে দিয়েছে ৩০ মিটারের এক জার্সি, শেষ নাচের অপেক্ষায় থাকা মনুমেন্তাল যেন বলছিল—‘যেতে দিতে ইচ্ছা নাহি!’
আর মেসি? নিজেই অনুশীলনে লিখেছেন শেষ অধ্যায়ের প্রথম কয়েকটি লাইন।
‘আমি জানি, এই বিশেষ মুহূর্তগুলো মিস করব’
এস্তাদিও মনুমেন্তাল। রিভার প্লেটের এই মাঠই সাক্ষী হয়ে থাকবে আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে মেসির শেষ নাচের। জাতীয় দলের হয়ে ২০০৫ সালের ৫ অক্টোবর প্রথমবার খেলেছিলেন এই মাঠে। সেদিন গোল পাননি। কিন্তু এরপর মনুমেন্তাল তাঁকে দিয়েছে দুহাত ভরে। আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় এই স্টেডিয়ামে জাতীয় দলের হয়ে মেসি কখনো হারেননি। ২৮ ম্যাচে ২২ জয়, ৬ ড্র, ১৯ গোল।
পড়ুন: বিদায়ের মাঠ মনুমেন্তালই সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছে মেসিকে
যে হাওয়া-জল মেখে বেড়ে উঠেছিলেন লিওনেল মেসি, আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অন্তিম মুহূর্তে সেই জন্মভূমি রোজারিও মাথা নোয়াল তার সর্বকালের সেরা সন্তানের প্রতি। জাতীয় দলের জার্সিতে শেষ ম্যাচের আগে ঘরের ছেলেকে অভিনব শ্রদ্ধা জানাল শহরটি। পারানা নদীর তীরে আর্জেন্টিনার ন্যাশনাল ফ্ল্যাগ মেমোরিয়ালে রাখা হয়েছে মেসির বিশাল এক জার্সি। ৩০ মিটার দীর্ঘ জার্সিটি বানানো হয়েছে বিদায়ী ম্যাচের জন্য বানানো মেসির বিশেষ জার্সির আদলে। যার ১০ নম্বরের ওপরে নামের জায়গায় লেখা ‘গ্রাসিয়াস’, অর্থাৎ কৃতজ্ঞতা।
বিস্তারিত পড়ুন: মেসিকে বিদায় জানাতে তাঁর জন্মশহরে নজরকাড়া শ্রদ্ধাঞ্জলি
বুয়েনস এইরেসের সময় মঙ্গলবার রাত আটটায় (বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোর পাঁচটায়) মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে নীল-সাদা জার্সিতে শেষবার মাঠে নামবেন লিওনেল মেসি। প্রতিপক্ষ বেনিন। তবে তাঁর বিদায়ী ম্যাচের নানা আয়োজন শুরু হয়ে যাবে আরও আগেই। যা চলবে ম্যাচ শেষেও। কী থাকছে সেই অনুষ্ঠানে? আজ ইনস্টাগ্রামে এক ফটোকার্ডে সেই সূচি প্রকাশ করেছে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)। বুয়েনস এইরেসের স্থানীয় সময় ধরে সাজানো তালিকাটা তিন ভাগে ভাগ করা। ম্যাচের আগে, বিরতিতে এবং ম্যাচ শেষে। একটা জিনিস কমন—গান আর আলোর ঝলকানি।
বিস্তারিত পড়ুন: মেসির বিদায়ের অনুষ্ঠানসূচি, শেষ লাইনে লেখা ‘চমক’
লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের বিদায় ঘিরে যেন পুরো ফুটবল দুনিয়াই আবেগে ভাসছে। সতীর্থ, সাবেক সতীর্থ, প্রতিপক্ষ, ভক্ত, ফুটবল কিংবদন্তি, সবাই কোনো না কোনোভাবে জানাচ্ছেন মেসিকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। সেই তালিকায় এবার যোগ হলো নেইমারের নাম।
মেসির খুব কাছের বন্ধু নেইমার। বার্সেলোনা ও পিএসজিতে দুজন ছিলেন সতীর্থ। শুরু থেকেই গড়ে উঠেছিল বন্ধুত্বও। মেসির বিদায়ী ম্যাচের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাই আবেগঘন এক বার্তা দিয়েছেন ব্রাজিলিয়ান তারকা।
বিস্তারিত পড়ুন: মেসির বিদায় বেলায় আপ্লুত নেইমার, ‘তোমার সঙ্গে ইতিহাসের অংশ হতে পারা সম্মানের’
একটা সময় আসে, যখন কিংবদন্তিরও থামতে হয়। লিওনেল মেসির জন্য সেই সময়টা এসে গেছে। আকাশি-সাদা জার্সিতে আজই শেষবার মাঠে নামবেন তিনি। বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্তালে বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে শেষ হবে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে তাঁর ২১ বছরের পথচলা।
বিদায়ী ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগে অবশেষে নীরবতা ভেঙেছেন মেসি। আর্জেন্টিনার মানুষের উদ্দেশে দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় বলেছেন, ‘আমি শান্তিতে বিদায় নিচ্ছি। আমি সবকিছু দিয়ে চেষ্টা করেছি।’
বিস্তারিত পড়ুন: ‘এই জার্সিটাই ছিল আমার জীবন’, বিদায়ী ম্যাচের আগে মেসির শেষ কথা
আর্জেন্টিনার হয়ে শেষবারের মতো খেলতে স্টেডিয়ামে যাওয়ার পথে মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন মেসি। এএফএ ট্রেনিং কমপ্লেক্স থেকে টিম বাস বের হওয়ার পর সড়কে মেসির জন্য দাঁড়িয়েছিলেন হাজারো মানুষ। টিওয়াইসি স্পোর্টস জানাচ্ছে, যাত্রাপথে ভক্তদের উপস্থিতি ও ভালোবাস দেখে দৃশ্যতই আবেগপ্লুত হয়ে পড়েন মেসি। লা ন্যাশিওনের ক্যামেরায় তাঁকে অশ্রুসিক্ত দেখা গেছে।
আর্জেন্টিনার টিম বাসের প্রটোকলের দায়িত্বে থাকা পুলিশ মানুষকে বাসের পথ থেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও অনেকেই রাস্তায় নেমে আসেন মেসিকে কাছ থেকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য।
এক ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে মেসিদের দলটিকে বহন করা বাসটির মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে পৌঁছাতে।
মেসির শেষ ম্যাচে তাঁর সঙ্গে একাদশে নামার সুযোগ পাচ্ছেন সে সব খেলেোয়াড়, যারা দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে খেলছেন।
বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচ শুরুর আগে ওয়ার্মআপ করতে মাঠে নেমেছেন মেসি। উচ্ছ্বাসে ভেঙে পড়েছেন গ্যালারির দর্শক
ম্যাচ শুরুর আগে মেসির হাতে রিভার প্লেটের সম্মানসূচক সদস্যপদ কার্ড তুলে দিয়েছেন ক্লাবটির সভাপতি স্তেফানো দি কার্লো। এছাড়া মেসির হাতে একটি স্মারক এবং তার নাম লেখা রিভার প্লেটের একটি জার্সি তুলে দেওয়া হয় ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটির পক্ষ থেকে।
কিক-অফের আগে মাঠের কর্মীরা ১০ নম্বর পরা আর্জেন্টিনার একটি সুবিশাল জার্সি মাঠে বিছিয়ে দেন। তবে সেই জার্সিতে মেসির নামের জায়গায় লেখা রয়েছে ‘গ্রেসিয়াস’, মানের ধন্যবাদ।
আর তা দেখামাত্রই গ্যালারির দর্শক সমস্বরে ‘মেসি, মেসি’ বলে গর্জন ও স্লোগান তুলেছেন।
স্থানীয় সময় রাত ৮টায় খেলা শুরুর কথা থাকলেও তা ১৫ মিনিট পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আধা ঘণ্টা দেরিতে বাজল কিক-অফ বাঁশি। তার আগে তিন ছেলেকে নিয়ে মাঠে ঢুকেছেন মেসি।
ম্যাচের জন্য মেসি মাঠে নামার সময় ছিল আতশবাজির ঝলকানি। গ্যালারির দর্শকেরা সুর মিলিয়ে গাইতে থাকেন— ‘এসো, এসো... আমার সাথে গাও... তুমি একজন বন্ধু পাবে... হাতে হাত রেখে... লিও মেসির সাথে... আমরা সবাই জয়ের আনন্দ উদযাপন করতে যাচ্ছি।’একই সাথে মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে 'মালভিনাস (ফকল্যান্ডস) আর্জেন্টিনার' লেখা ব্যানার নিয়ে ফাবিও সান্তানার কণ্ঠে পরিবেশিত আর্জেন্টিনার জাতীয় সংগীত স্টেডিয়ামজুড়ে অত্যন্ত আবেগ ও উদ্দীপনার সাথে গাওয়া হয়। মেসিকেও আবেগাপ্লুত দেখা যায় এ সময়।
মেসির সম্মানে দশম মিনিটে খেলা থামিয়ে দিয়েছেন রেফারি। এ সময় দর্শক দুই মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে হাততালি আর ‘ওলে ওলে মেসি’ স্লোগানে মহাতারকাকে অভিবাদন জানান। মাঠে থাকা খেলোয়াড়েরাও মেসির সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাঁকে শুভেচ্ছা জানান। আর স্টেডিয়ামজুড়ে আরেক দফা দেখা মেলে আতশবাজির ঝলকানির।
মেসির বিদায়বেলায় স্টেডিয়ামের বক্সে হাজির পুরো পরিবার। স্ত্রী আন্তোনেল্লা রোকুজ্জে, তিন ছেলে থিয়াগো, মাতেও ও সিরো, মা সেলিয়া ও ভাই-বোনেরা মাতিয়াস, রদ্রিগো ও মারিয়া সোল), সঙ্গে ভাগ্নে-ভাতিজারাও।
আর্জেন্টিনার ম্যাচে মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামের ভিআইপি বক্সে অবশ্য বরাবরই দেখা যায় মেসির পরিবারের সদস্যদের। তবে মেসির খেলা দেখার সময় খুব সরব দেখা যেত যাঁকে, সেই হোর্হে মেসি নেই। দু মাস আগে প্রয়াত হয়েছেন মেসির বাবা।
প্রথমার্ধের খেলা শেষ। গোল পায়নি কোনো দলই। এই ম্যাচে অবশ্য গোলের চেয়েও বড় আকর্ষণ মেসি। বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। আকাশী নীল জার্সি তুলে রাখা থেকে আর মাত্র ৪৫ মিনিট দূরে তিনি।
প্রথমার্ধে মোট ৬ বার বেনিনের বক্সে বল টাচ করেছেন মেসি, নিয়েছেন সর্বোচ্চ ৪টি শটও। এমনকি, এই সময়ে আর্জেন্টিনার সবচয়ে বড় সুযোগ যেটি এসেছিল, সেটিও ছিল তাঁরই সামনে।
৩২ মিনিটের সেই সুযোগটি যে কাজে লাগাতে পারেননি, সেটি ম্যাচের স্কোরলাইনই বলে দিচ্ছে। লাওতারো মার্তিনেজের পাস খুঁজে পেয়েছিল মেসিকে। বাঁ পায়ে বল টাচও করেছেন, তবে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলায় ঠিকঠাক মেলাতে পারেননি, বল চলে যায় পোস্টের বাইরে দিয়ে।
প্রথমার্ধের পর স্টেডিয়ামে সংগীত পরিবেশন করেছে আর্জেন্টিনার বিখ্যাত গানের দল 'লোস ফুন্দামেনতালিস্তাস'।
আর্জেন্টিনা ১ : ০ বেনিন
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই এগিয়ে গেল আর্জেন্টিনা। ৪৮তম মিনিটে মেসির কর্নার থেকে পাওয়া বল ভলিতে জালে জড়িয়েছেন নিকোলাস ওতামেন্দি।
আজ আর্জেন্টিনার জার্সিতে শুধু মেসিরই বিদায়ী ম্যাচ নয়, ওতামেন্দিরও। ৩৮ বছর বয়সী এই সেন্টার ব্যাক শেষটা রাঙালেন দলকে এগিয়ে দিয়ে।
গোলের মিনিট দুয়েক পরই ওতামেন্দিকে তুলে নিয়েছেন আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি। তাঁর উঠে যাওয়ার সময় ‘স্টান্ডিং ওভেশন’ দিয়েছে গ্যালারি, হাত মিলিয়ে তাঁকে বিদায় জানিয়েছেন সতীর্থরা।
আর্জেন্টিনা ২ : ০ বেনিন
আবারও মেসির ছোঁয়ায় আর্জেন্টিনার গোল। বাম দিক থেকে মেসির বাড়ানো বল গেছে নিকো পাজের কাছে। গোলপোস্টের দিকে ঘুরে বাঁকানো শটে বল পাঠিয়ে দেন বাম কোণ দিয়ে। বেনিনের গোলরক্ষকের পক্ষে এই বল ঠেকানোর কোনো সুযোগই ছিল না।
বিদায়ী ম্যাচে আর্জেন্টিনার দুই গোলে অ্যাসিস্ট করলেন মেসি।
আর্জেন্টিনা ৩ : ০ বেনিন
সতীর্থদের দিয়ে দুটি গোল করানোর পর এবার নিজেও গোল পেয়েছেন লিওনেল মেসি। গোল নম্বর ১২৬!
বেনিন বক্সে অগাস্টিন জিয়াই ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। ৭১ মিনিটে বল স্পটে বসিয়ে মেসি যে কিক নিয়েছেন, সেটি ধরারই উপায় ছিল না বেনিন গোলকিপারের। একে তো ভুল দিকে ঝাঁপিয়েছেন, তার ওপর জোরাল গতিতে বলটা গেছে ওপরের কোণায়।
গোলের পর মেসিকে বৃত্তের মাঝে রেখে উদ্যাপন করেছেন সতীর্থরা।
শেষের বাঁশি বাজালেন রেফারি। এই শেষ শুধু আর্জেন্টিনা-বেনিন ম্যাচের নয়, আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসি নামের এক অতিমানবের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারেরও।
স্টেডিয়াম জুড়ে ড্রোন শোর ঝলকানি!
ম্যাচশেষের সংক্ষিপ্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষে মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামের আকাশে ড্রোনের চমৎকার প্রদর্শনী ফুটে ওঠে। যার শেষে ছিল ‘গ্রেসিয়াস লিও‘ (ধন্যবাদ লিও)।
মেসির বিদায়ে ভারী আয়োজন নয়, উদ্যাপনের আবহ রেখেছে আর্জেন্টাই ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)। ম্যাচের পর ড্রোন শো, এরপর সংগীত পরিবেশনা।
গায়িকা সোলেদাদ পাস্তোরুত্তি তার জনপ্রিয় গান ‘ব্রিনদিস’ পরিবেশন করেন। সংগীতের সময় মেসিকে হাসতে দেখা গেছে। আশপাশের পরিবেশও উপভোগের আবহের।
সবাই এখন মেসির কথা শোনার অপেক্ষায়।
মাইক হাতে নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন মেসি।
‘আজকের দিনে কিছু বলা সত্যিই কঠিন; অনেক আবেগ, অনেক স্মৃতি মনের ভেতর ভিড় করে আসছে। সবার আগে আমার বাবার কথাই মনে পড়ছে। আমার বিদায়ী চিঠিতে যেভাবে বলেছিলাম, আমি শুধু আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি। দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই জার্সির প্রতিনিধিত্ব করা আমার জন্য এক চরম সম্মানের বিষয় ছিল। কঠিনতম মুহূর্তগুলোতেও আমি কখনও লড়াই থামাইনি, নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়া বন্ধ করিনি এবং দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিইনি। এই আকাশি-সাদা আঙিনায় আর ফিরে না আসার বেদনাটা হবে বিশাল। স্রষ্টার কসম, জীবনের বাকিটা সময়ও আমি এখানে ফিরে আসতে চাইতাম, কারণ আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে মাঠ মাতানো একজন ফুটবলারের জীবনে ঘটা সবচেয়ে দারুণ অনুভূতি।
‘যদিও মন চায় আজীবন এখানেই থেকে যাই, তবে আমার মনে হচ্ছে এটাই সরে দাঁড়ানোর সঠিক সময়। গত বিশ্বকাপটি আমার জন্য অনেক বেশি মানসিক ও শারীরিক চাপের ছিল। আমরা আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম, জয়ের একদম কাছেও পৌঁছে গিয়েছিলাম, আর সত্যি বলতে অলৌকিক কিছু ঘটেনি। আমরা আমাদের সবকিছু উজাড় করে দিয়েছিলাম। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি আমাদের দৈহিক ও মানসিকভাবে ভীষণ নিঃশেষ করে দিয়েছিল। সত্যি বলতে, আমরা কোনোমতে লড়াইটি টেনে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমরা যথারীতি লড়াই করেছি, যেমনটা এই জার্সির জন্য সবসময় করে এসেছি—আমার সেইসব সতীর্থদের সাথে নিয়ে যাদের পাশে পেয়েছি। এই বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ রাখবেন না যে, আমার পাশে থাকা প্রতিটি সতীর্থ এই শার্টের জন্য সর্বদা তাদের সর্বোচ্চটা নিংড়ে দিয়েছে।
‘আমার এই দলটির সাথে কাটানো সময়ের জন্য সতীর্থদের ধন্যবাদ জানাতে চাই। তারা আমার শৈশবের স্বপ্নপূরণে সাহায্য করেছে। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, কোপা আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন, ফিনালিসিমার চ্যাম্পিয়ন, অর্থাৎ যা যা প্রতিযোগিতায় খেলেছি সবকিছুর বিশ্বজয়ী বানিয়েছে। মাঠ এবং মাঠের বাইরে তাদের সাথে মুহূর্তগুলো ভাগ করে নেওয়া ছিল আমার জীবনের বড় এক প্রাপ্তি। আমি যেকোনো প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত ছিলাম, কারণ আমি জানতাম আমার চারপাশে এমন কিছু বীর যোদ্ধা রয়েছে যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে লড়বে।
‘এখানে খেলাটা আমি বড্ড মিস করব। পুরো দেশজুড়ে ভ্রমণের সৌভাগ্য আমার হয়েছিল এবং প্রতিটা জায়গায় আমি অবিশ্বাস্য ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছি। যা যা অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি তার জন্য আমি চিরকৃতজ্ঞ। ম্যাচ যাই হোক না কেন—বিশ্বকাপ কিংবা কোপা আমেরিকা যেখানেই গিয়েছি, গ্যালারি সবসময় কানায় কানায় পূর্ণ রাখার জন্য আমি ধন্য। অনেক কষ্ট করে সমর্থকরা এসেছিলেন, আমরা জানি এটা কতটা কঠিন, কিন্তু যেখানেই খেলেছি মনে হয়েছে নিজেদের ঘরের মাঠেই খেলছি। আমরা সত্যিই সেই ভালোবাসা প্রতি মুহূর্তে অনুভব করেছি।
‘এই মাঠেই আমি আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম আনন্দের এক দিন উদযাপন করেছিলাম—বিশ্বকাপ জেতার পর যখন আমরা আবার খেলতে নেমেছিলাম। সেদিন যা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলাম, তা আমি জীবনেও ভুলব না। পুরো বিষয়টি ছিল অপরূপ সুন্দর। আজ অব্দি আমি যখনই সেই স্মৃতিগুলোর ভিডিও দেখি, আবেগে ভেসে যাই। সেই দিনটি আমার ইতিহাসে, আমার পরিবারের ইতিহাসে এবং সমর্থকদের ইতিহাসে চিরকালের জন্য খোদাই হয়ে থাকবে... এটা সত্যি অসাধারণ ছিল, আপনাদের অনেক অনেক ধন্যবাদ।
‘আজ আবার এই মাঠে ফিরে এসে, আমি নিঃসন্দেহে আমার ফুটবল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বিষাদময় দিনটি পার করছি। কারণ আজ সেই দিন, যেদিন আমি জাতীয় দল এবং আপনাদের সবাইকে বিদায় জানাচ্ছি। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে লড়াই করাটা আমি খুব মিস করব। তবে এখন থেকে আমি আপনাদের পাশে ওপারে দাঁড়াব—এই তরুণদের এবং সামনে যারা আসবে, তাদের সবাইকে সমর্থন জুগিয়ে যাব। আমরা সর্বদা ঐক্যবদ্ধ থাকব।
‘এটা বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে, আমরা যখন একত্রিত হই এবং একতাবদ্ধ থাকি, তখন আমরা অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠি এবং যেকোনো কিছু জয় করতে পারি। সামনে নিশ্চিতভাবেই কঠিন সময় আসছে, কারণ এই সময়ে আমরা যা যা অর্জন করেছি তা সাধারণ কোনো বিষয় নয়। আর সেই কঠিন মুহূর্তগুলোতে আমাদের আরও বেশি করে ওদের পাশে দাঁড়াতে হবে, সমর্থন জোগাতে হবে। আমি ওদেরকে যেমনটা সবসময় বলি, আর আমাদের শেষ বৈঠকেও যেটা বলেছি: মহৎ কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ দল গড়ে তোলা জরুরি; কারণ কিছু মানুষ সবসময় ওৎ পেতে থাকে জাতীয় দলের ব্যর্থতা দেখার জন্য। আমাদের কোনোভাবেই তাদের সেই সন্তুষ্টি দেওয়া যাবে না।
‘প্রতিকূল ও কঠিন সময়গুলোতেই বোঝা যায় একটি দলের ভেতরে কতটা শক্তি লুকিয়ে আছে। ভেতরে যখন দলের বাঁধন শক্ত না হয়, তখন কোনো কিছু অর্জন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর বিশ্বাস করুন, আমরা ছিলাম একটি অসাধারণ একতাবদ্ধ দল—আর সে কারণেই আমরা যা যা অর্জন করেছি তা সম্ভব হয়েছে।
‘সত্যি বলতে, আজ আমি অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি কথা বলছি। আসলে আমার যেতে ইচ্ছে করছে না, এই সবুজ গালিচা ছেড়ে যেতে মন চাইছে না। আমি শুধু এটুকু বলতে চাই—আমি আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি, আমি আপনাদের খুব মিস করব। একজন আর্জেন্টাইন হতে পেরে আমি ঈশ্বরের কাছে চিরকৃতজ্ঞ, আমি আর্জেন্টাইন হিসেবে গর্বিত এবং আপনাদের সকলকে সাথে নিয়ে আমার স্বপ্নগুলো পূরণ করতে পেরে আমি পরম গর্বিত।
আপনাদের সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ, আমি আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি।’
সূত্র: প্রথম আলো
