শাহজাদপুর সংবাদ

মুমিন কেন হতাশ হয় না

৮ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১০:৩২ AM

মুমিন কেন হতাশ হয় না

কখনো কখনো মানুষ এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে, যখন নিজের জীবনটাকেই অর্থহীন মনে হবে। অনেক চেষ্টার পরও যখন কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না আসে, মানুষ তখন হতাশায় ভুগতে থাকে।

অথচ মুমিনের জীবনে হতাশার কোনো স্থান নেই। পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, আল্লাহর রহমত তার চেয়েও বিস্তৃত। আল্লাহ চাইলে মুহূর্তেই সমস্ত দৃশ্যপট বদলে যেতে পারে।

কোরআন-হাদিসে এমন কিছু পথনির্দেশনা রয়েছে, যা বিপর্যস্ত হৃদয়কে নতুন করে আশাবাদী হতে শেখায়। এমন ৭ নির্দেশনা আলোচনা করা হলো।

১. কষ্টকে শেষ পরিণতি না ভাবা

দুঃসময়ে মানুষ সবচেয়ে বড় যে ভুলটি করে, তা হলো, বর্তমানের কষ্টকে ভবিষ্যতেরও বাস্তবতা মনে করা। আজ যে দরজা বন্ধ, কালও তা বন্ধ থাকবে, এমন ধারণা ধীরে ধীরে মনকে দুর্বল করে দেয়।

অথচ জীবনের কোনো অবস্থাই স্থায়ী নয়। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে।’ (সুরা ইনশিরাহ, আয়াত: ৫)

লক্ষ্য করার বিষয় হলো, পরের আয়াতেও একই ঘোষণা পুনরায় এসেছে। যেন আল্লাহ মানুষকে আশ্বস্ত করছেন, কষ্টের আড়ালে স্বস্তি আসছে, অন্ধকারের পর আলো আসবেই।

তাই কঠিন সময়কে জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত মনে না করে ধৈর্য ধরে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

২. আল্লাহর ওপর আস্থা

হতাশার সময় আল্লাহর সাহায্য মুমিনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন। এ সময় নিজের অক্ষমতার দিকে না তাকিয়ে আল্লাহর অসীম ক্ষমতার ওপর আস্থা রাখা জরুরি।

কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যে আল্লাহকে ভয় করবে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেবেন এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিজিক দেবেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। আর যে আল্লাহর ওপর আস্থা রাখবে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক, আয়াত: ২-৩)‌

যে পথে কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না, আল্লাহ সেখান থেকেও পথ বের করে দিতে পারেন। তাই পরিস্থিতি কঠিন হলেও আল্লাহর সাহায্য থেকে আশাহত হওয়া যাবে না।

৩. আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া

কিছু মানুষ পুরোনো ব্যর্থতা ও ভুলের স্মৃতি বয়ে বেড়াতে বেড়াতে বর্তমান জীবনটাকেও বিষণ্ন করে তোলে। অথচ ইসলাম মানুষকে এমন নিরাশায় ডুবে যেতে নিষেধ করেছে।

কোরআনে এসেছে, ‘আল্লাহর রহমত থেকে তোমরা নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩)

অতীত মুছে ফেলার ক্ষমতা মানুষের নেই, কিন্তু তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ তার রয়েছে। তাই যা হয়ে গেছে, তা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। অতীত আকড়ে ধরে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নষ্ট করা যাবে না।

৪. আন্তরিক দোয়া

কিছু পরিস্থিতি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে। সবক্ষেত্রেই চেষ্টার পাশাপাশি আল্লাহর কাছে দোয়া অব্যাহত রাখা জরুরি। এটি আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্কও মজবুত করে।

আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সুরা মুমিন, আয়াত: ৬০)

দোয়ার ফলাফল কখনো খুব দ্রুত আসে, কখনো আসে বিলম্বে। কখনো মানুষ যা চায় তা-ই পায়, আবার কখনো তার চেয়েও কল্যাণকর কিছু তার জন্য নির্ধারিত থাকে।

তাই ফলাফল আসতে বিলম্ব মানেই দোয়া প্রত্যাখ্যাত নয়।

৫. নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ

অপ্রাপ্তির দিকে তাকিয়ে থাকলে প্রাপ্তিকেও একসময় তুচ্ছ মনে হয়। মানুষের স্বভাব হলো, যা নেই, তার দিকে বেশি আগ্রহী হওয়া। ফলে কাছে থাকা অসংখ্য নেয়ামতেও তার চোখ পড়ে না।

অথচ আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা করো, তবে তা গণনা করে শেষ করতে পারবে না।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৩৪)

এই অসংখ্য নেয়ামতের জন্য মানুষের উচিত আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। এতে মানসিক প্রশান্তি আসবে এবং নিয়ামত বৃদ্ধি পাবে।

আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি আমার নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করো, তাহলে অবশ্যই আমি তোমাদের আরও বেশি দান করব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি অত্যন্ত কঠিন।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৭)

কৃতজ্ঞতা মূলত মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। ফলে সে অপ্রাপ্তির প্রতি ভ্রূক্ষেপ করে হতাশায় ডুবে যায় না। নিয়ামতের মূল্য উপলব্ধি করতে পারলে জীবনের প্রতি বিরক্তিও অনেকটা কমে আসে।

৬. সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া

আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। বরং মুমিন নিজের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করবে এবং ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেবে।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যা তোমার উপকারে আসে, তার প্রতি আগ্রহী হও, আল্লাহর সাহায্য চাও এবং অক্ষম হয়ে যেয়ো না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪)

ব্যর্থতার ভয় অনেক সময় মানুষকে চেষ্টা থেকেই দূরে সরিয়ে দেয়। অথচ ব্যর্থতা মানেই পথ শেষ হয়ে যাওয়া নয়। কখনো ব্যর্থতা মানুষকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে সঠিক পথের দিকে নিয়ে যায়।

তাই ফলাফল অনুকূলে না এলেও চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

৭. নিজেকে একা মনে না করা

হতাশার একটি বড় কারণ হলো নিঃসঙ্গতার অনুভূতি। মানুষ যতই একাকীত্ব অনুভব করুক, আল্লাহ তার অবস্থা ও অন্তরের খবর সম্পর্কে পূর্ণ অবগত।

আল্লাহ বলেন, ‘আমি তার ঘাড়ের ধমনির চেয়েও নিকটতর।’ (সুরা কাফ, আয়াত: ১৬)

পৃথিবীর মানুষ না বুঝলেও আল্লাহ জানেন কী কষ্ট নিয়ে সে দিন পার করছে, কত অশ্রু লুকিয়ে রাখছে এবং কত সংগ্রাম করে নিজেকে সামলে রাখছে। এই বিশ্বাস একজন মুমিনকে ভেতর থেকে সাহসী করে তোলে।

হতাশা জীবনে আসতেই পারে, কিন্তু তাকে হৃদয়ের স্থায়ী বাসিন্দা হতে দেওয়া যাবে না। রাত যত দীর্ঘই হোক, ভোর তার নিয়মেই আসে। মানুষের দায়িত্ব হলো চেষ্টা করা, দোয়া করা, ভুল থেকে ফিরে আসা এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রাখা।

যে হৃদয় আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখবে, তার কাছে সংকট কখনোই শেষ কথা হয়ে থাকবে না। সীমাহীন হতাশার মধ্যেও সে ধৈর্য ও আশার পথ খুঁজে পাবে।

নাহিদা সুলতানা: আলেমা ও প্রাবন্ধিক

nahidasultana753375@gmail.com

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ