শাহজাদপুর সংবাদ

কেউ যখন বলে, ‘আপনাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি’—এর অর্থ কী

৮ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৬:০০ PM

কেউ যখন বলে, ‘আপনাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি’—এর অর্থ কী

ইসলামি সংস্কৃতিতে পরিচিত ও হৃদয়স্পর্শী বাক্য হলো, ‘আমি তোমাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি।’ তবে অনেকে এই বাক্যের আসল বার্তাটি বুঝতে পারেন না। ভাবেন, কেন তিনি কি আমাকে সাধারণ মানুষ হিসেবে ভালোবাসতে পারছেন না? ভালোবাসার জন্য আবার কোনো কারণের প্রয়োজন কেন?

রাসুল (সা.) ছিলেন আত্মিক শক্তি, সংযম ও সাহসিকতার সর্বোচ্চ প্রতীক। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি ছিলেন পরিবারের সদস্য, সাহাবি ও শিশুদের প্রতি অসীম দয়ালু ও আবেগপ্রবণ।

একদিন তিনি তাঁর আদরের দৌহিত্রকে পরম মমতায় চুম্বন করছিলেন। তখন পাশে বসা সাহাবি আকরা ইবনে হাবিস বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার ১০টি সন্তান রয়েছে, কিন্তু আমি কখনো তাদের কাউকে এমন চুম্বন করিনি!’

রাসুল (সা.) বললেন, যিনি অন্যের প্রতি দয়া করেন না, তাঁর ওপরও দয়া করা হয় না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৯৭)

ইসলামে ভালোবাসা ও আত্মিক উষ্ণতা শুধু অন্তরে চেপে রাখার বিষয় নয়; বরং তা সুন্দর আচরণের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। রাসুল (সা.) পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়ন ও ভালোবাসা বৃদ্ধির জন্য কয়েকটি সুন্দর অভ্যাসের শিক্ষা দিয়েছেন।

তিনি উপহার আদান-প্রদানের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, তোমরা একে অপরকে উপহার দাও, কারণ উপহার অন্তরের বিদ্বেষ ও ক্ষোভ দূর করে দেয়। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২১৩০)

একইভাবে অন্যকে ভালোবাসলে তা মুখে প্রকাশ করার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেছেন, যখন কোনো মানুষ তার অপর ভাইকে ভালোবাসে, তখন তার উচিত তাকে জানিয়ে দেওয়া যে সে তাকে ভালোবাসে। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৫১২৪)

এমনকি হাসিমুখে অন্যের দিকে তাকানোকেও এক বিশেষ ইবাদত ও সদকা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। (সুনান তিরমিজি, হাদিস: ১৯৫৬)

কেউ যখন বলে যে সে আপনাকে ‘আল্লাহর জন্য ভালোবাসে’, তার অর্থ এটি নয় যে সে আপনার ব্যক্তিগত সত্তা, বুদ্ধিমত্তা বা গুণাবলিকে উপেক্ষা করছে। বরং এর প্রকৃত অর্থ হলো, সে গভীরভাবে উপলব্ধি করে যে আপনার ভেতরের সৌন্দর্য, উদারতা, চঞ্চলতা কিংবা অনন্য গুণাবলি—এর সবই মূলত স্রষ্টার দান।

আল্লাহর জন্য ভালোবাসার অর্থ হলো নিজের অন্তরকে পরম আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত রাখা। জাগতিক উদ্দেশ্য এখানে নেই।

জাগতিক উদ্দেশ্যে তৈরি হওয়া ভালোবাসার সঙ্গে এই ভালোবাসার পার্থক্য আকাশ-পাতাল। মানুষ কখনো বাহ্যিক রূপ-সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ে, কিন্তু সেই আকর্ষণ ত্বক বা বাহ্যিকতার গভীরে যেতে পারে না।

মানুষ কখনো আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের দ্বারা প্রভাবিত হয়, কিন্তু পরিচয়ের গভীরতায় তা স্তিমিত হয়ে পড়ে। কিংবা মানুষ ধন-সম্পদের মোহে সম্পর্ক তৈরি করে, কিন্তু দুনিয়ার সব সম্পদ মিলে মানুষের অন্তরের একাকী শূন্যতা পূরণ করতে পারে না।

বিপরীতে আল্লাহর জন্য ভালোবাসা মানুষকে কোনো শর্ত বা স্বার্থের ওপর দাঁড়িয়ে ভালোবাসে না; এটি পরম স্রষ্টার সন্তুষ্টির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

পবিত্র ও নিষ্কলুষ এই ভালোবাসার জন্য পরকালে পরম আল্লাহ তাআলা মহা পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন।

হাদিসে এসেছে, বিচার দিবসে যখন আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না, তখন মহান আল্লাহ ঘোষণা করবেন, ‘আমার মহিমার উদ্দেশ্যে যারা একে অপরকে ভালোবেসেছিল, তারা আজ কোথায়? আজ আমি তাদের আমার বিশেষ ছায়ায় আশ্রয় দেব।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৬)।

অন্য এক বর্ণনায় রাসুল (সা.) বলেছেন, মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, যারা শুধু আমার মহিমার উদ্দেশ্যে একে অপরকে ভালোবাসে, পরকালে তাদের জন্য থাকবে নুরের তৈরি আসন, যা দেখে নবী ও শহীদগণও আনন্দিত হবেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৯০)

কেউ যখন আন্তরিকভাবে এই ভালোবাসার বাণী উচ্চারণ করে, তখন বোঝা যায় যে এই অনুভূতির পেছনে কোনো মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, স্বার্থ কিংবা সাময়িক মোহের স্থান নেই।

ইসলামি ঐতিহ্যে কেউ যদি বলে যে ‘আমি তোমাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি’, তবে তার জবাবে একটি দোয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, ‘যার উদ্দেশ্যে তুমি আমাকে ভালোবেসেছ, তিনি তোমাকেও ভালোবাসুন।’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৫১২৫)

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ