ব্যাংকিংয়ে নৈতিকতা ফেরাতে রাষ্ট্র ও ধনিক গোষ্ঠীর যোগসূত্র ছিন্ন করতে হবে: মাহবুব উল্লাহ
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১০:৫১ AM

আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী, লুটেরা ব্যবসায়ী ও বাংলাদেশ বাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগসাজশ না থাকলে ব্যাংকগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুণ্ঠন সম্ভব হতো না। লুণ্ঠনকারীরা শুধু লুণ্ঠন করেই চুপ ছিল না, তারা এই অর্থ দেশের বাইরে পাচার করে দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে চোরতন্ত্রের ক্ষমতাকাঠামো ভেঙে চুরমার করতে না পারলে ব্যাংক ব্যবস্থায় নিয়মকানুন ফেরানোর আশা করা দুরাশামাত্র। অর্থবহ কিছু অর্জন করতে হলে প্রভাবশালী ধনিক গোষ্ঠীর সঙ্গে রাষ্ট্রের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট আয়োজিত ‘ব্যাংকিংয়ে নৈতিকতা’শীর্ষক ২৩তম নুরুল মতিন স্মারক বক্তৃতায় জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ এ কথা বলেন। গতকাল শনিবার রাতে মিরপুরে বিআইবিএম মিলনায়তনে এই অনুষ্ঠান হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। বিআইবিএম মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম স্বাগত বক্তব্য দেন।
স্মারক বক্তৃতায় জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, ব্যাংকের মূল চালিকা শক্তি হলো ঘূর্ণায়মান তহবিল। ব্যাংক ঋণ দেবে, সেই ঋণের কিস্তি ও সুদ ফেরত আসবে, এবং তা দিয়ে আবার নতুন ঋণ দেওয়া হবে। কিন্তু বাংলাদেশে ৩২ শতাংশের বেশি ঋণখেলাপি হয়ে পড়ায় এই চক্র পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। সহজ কথায়, আমানতকারীদের রাখা প্রতি ৩ টাকার ১ টাকাই বাজারে আটকে গেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শেয়ারবাজারেও একই অবস্থা বিরাজ করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মাহবুব উল্লাহ বলেন, বিগত দিনে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত থেকে যে বিশাল অঙ্কের অর্থ বেহাত হয়েছে, তার ফলে অনেকগুলো ব্যাংক শূন্য হয়ে গেছে। ইসলামী ব্যাংকের মতো ভালো ব্যাংকও দুর্দশায় পড়েছে। দুর্দশাগ্রস্ত ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের টাকা পরিশোধ করতে পারছে না। সিংহভাগ আমানতকারী একসঙ্গে অর্থ পরিশোধের দাবি জানানোয় পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের আর্থিক খাত ভয়াবহভাবে রুগ্ণ হয়ে পড়েছে।
মাহবুব উল্লাহ আরও বলেন, পরিচালকেরা নিজ ব্যাংক ছাড়া অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারেন। নিয়ন্ত্রকদের চোখের সামনে কয়েকটি ব্যাংকের নিয়মকানুন দুমড়েমুচড়ে ফেলা হয়েছে। ব্যাংকগুলো হচ্ছে এক্সিম ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক।
মাহবুব উল্লাহ আরও বলেন, মনে হয়, ব্যাংকগুলো থেকে অর্থ লোপাট করার জন্য আঁতাত বা নেক্সাস গড়ে উঠেছিল। এই নেক্সাসে ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্তাব্যক্তি, আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী ও লুটেরা ব্যবসায়ীরা। এ রকম আঁতাত না থাকলে ব্যাংকগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করা সম্ভব হতো না।
ব্যাংক কোম্পানি আইন পরিবর্তন করে খেলাপিদের ঋণ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংক খাতে আইনের শাসনের পরিবর্তে শাসকদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন মাহবুব উল্লাহ।
অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতার পরিবর্তে স্বজন তোষণের প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন মাহবুব উল্লাহ। অনুপার্জিত আয় বা রেন্ট সিকিং সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে। দুর্নীতি সর্বব্যাপক। এমন অর্থনৈতিক কাঠামোতে পরিপক্ব পুঁজিবাদের উপযোগী ব্যাংকিং নৈতিকতা কার্যকর হবে, এমন চিন্তা বাস্তবসম্মত নয়।
এই বাস্তবতায় অর্থবহ কিছু অর্জন করতে চাইলে প্রভাবশালী ধনিক গোষ্ঠীর সঙ্গে রাষ্ট্রের সংযোগ ছিন্ন করতে হবে বলে মত দেন মাহবুব উল্লাহ। তাতেও সমস্যা আছে। কেননা এই প্রভাবশালী ধনিক গোষ্ঠী অর্থনীতির মূল্যশৃঙ্খলের সঙ্গে সম্পৃক্ত; অর্থনীতির সরবরাহব্যবস্থা তাঁদের হাতে। তাঁরা চাইলে বড় সংকট সৃষ্টি করতে পারেন। সে জন্য তাঁদের অসন্তুষ্টি রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের কাম্য নয়। এখানেই ব্যাংকিং নৈতিকতা ও বাস্তবতার মধ্যে আপাতস্ববিরোধ।
সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, মাহবুব উল্লাহ এক গভীর দার্শনিক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন। বিষয়টা হলো, বাংলাদেশের অপরিণত পুঁজিবাদী কাঠামোয়, যেখানে রাষ্ট্র ও গোষ্ঠীস্বার্থ পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, সেখানে প্রকৃত ব্যাংকিং নৈতিকতা বাস্তবসম্মত কি না। এ সংশয় অমূলক নয়।
গভর্নর বলেন, ‘রাষ্ট্র ও গোষ্ঠীস্বার্থের সেই বন্ধন ভাঙার প্রথম পদক্ষেপই হলো একক পরিবার বা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ সীমিত করা, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পর্ষদ থেকে সরিয়ে দেওয়া ও অর্জিত সম্পদের প্রকৃত মালিকানা আইনিভাবে প্রমাণ করা। এসব কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। ব্যাংক কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়; বরং তা সমাজ ও রাষ্ট্রের অগণিত আমানতকারীর সম্পদ, এ দর্শন বাস্তবায়নে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’
বক্তারা বলেন, ব্যাংকিং খাতে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু নিয়মকানুন নয়, রাষ্ট্র ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর যোগসূত্র ভাঙতে হবে। ব্যাংককে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে আমানতকারীর স্বার্থ, আইনের শাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই প্রধান কাজ।
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পর্কিত সংবাদ
নিজেরা সংস্কার করে বদলে যেতে চায় এনসিসি ও এসবিএসি ব্যাংক
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১০:১৫ AM · প্রথম আলো
জমকালো আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ‘জেডএফসি ২: প্রাইড অব বাংলাদেশ’
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১১:১১ AM · রাইজিংবিডি
দেশে বিভিন্ন গাড়ির টায়ার আমদানি দুই বছরে ৫০% বেড়েছে
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৯:০০ AM · প্রথম আলো
