শাহজাদপুর সংবাদ

নিজেরা সংস্কার করে বদলে যেতে চায় এনসিসি ও এসবিএসি ব্যাংক

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১০:১৫ AM

নিজেরা সংস্কার করে বদলে যেতে চায় এনসিসি ও এসবিএসি ব্যাংক

দুই বছরের বেশি সময় ধরে ব্যাংক খাতের সংস্কার করে চলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অনিয়ম ঠেকাতে নানা নীতিমালা জারি করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। ব্যাংকের পরিচালকদের যোগ্যতা, দায়িত্ব ও কর্তব্য সুস্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) জন্য ১০০ নম্বরের একটি মূল্যায়ন-কাঠামোও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে এক ডজনের বেশি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালক ও পর্যবেক্ষক বসিয়ে সুশাসন নিশ্চিতের চেষ্টা করে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর বাইরেও কিছু ব্যাংক নিজস্ব উদ্যোগে সংস্কার শুরু করেছে, যাতে ভবিষ্যতে পরিচালনা পর্ষদের নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দলের কারণে ব্যাংক সংকটে না পড়ে। এ রকম ঘটলে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়ে ব্যাংক আস্থার সংকটে পড়ে। আবার কোনো কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের শেয়ারধারী পরিচালকেরা স্বতন্ত্র পরিচালককে চেয়ারম্যান হিসেবে বেছে নিয়েছেন, যা সুশাসন নিশ্চিত করে ভালো ব্যাংক হিসেবে গড়ে তোলার একটি লক্ষ্য হিসেবে সামনে এসেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ পরিচালককে পরবর্তী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে এনসিসি ব্যাংক। এভাবে ব্যাংকটির সব পরিচালকই জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে একসময় চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এই প্রস্তাব অনুমোদন করলে আগামী অক্টোবর থেকে ন্যাশনাল ক্রেডিট এন্ড কমার্স ব্যাংক(এনসিসি) ব্যাংকের সিদ্ধান্তটি কার্যকর হবে।

যমুনা ব্যাংক বেশ আগে থেকে প্রতিবছর চেয়ারম্যান পরিবর্তনের নতুন ধারা অনুসরণ করে আসছে, যা ব্যাংকটির ভাবমূর্তি ও আর্থিক পরিস্থিতি উন্নতি করতে ভূমিকা রাখছে। ফলে যমুনা ব্যাংক এখন দেশের শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তিসম্পন্ন ব্যাংকে পরিণত হয়েছে এবং খেলাপি ঋণের হার ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। এনসিসি ব্যাংকেও অবশ্য খেলাপি ঋণের হার ৫ শতাংশের নিচে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মানুযায়ী, এখন চেয়ারম্যানের মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই বছর। তবে যমুনা ব্যাংকের চেয়ারম্যানের মেয়াদ করা হয়েছে এক বছর। আবার এনসিসি ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম মেনে চেয়ারম্যানের মেয়াদ দুই বছর রাখার পক্ষে।

এদিকে নতুন প্রজন্মের এসবিএসি ব্যাংক একজন স্বতন্ত্র পরিচালককে পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছে। পর্ষদে শেয়ারধারী পরিচালকেরাই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বর্তমানে সংকটে পড়া কিছু ব্যাংক ছাড়া আর কোনো ব্যাংকে কোনো স্বতন্ত্র পরিচালক চেয়ারম্যান পদে নেই। তবে এসবিএসি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

জানা গেছে, এসবিএসি ব্যাংকের বর্তমান পরিচালকদের বেশির ভাগই ব্যবসায়ী হওয়ায় তাঁরা ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিতে রাজি নন। আবার যাঁরা চেয়ারম্যান হতে আগ্রহী, তাঁদের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন আছে। এ জন্য কোনো শেয়ারধারী পরিচালককে চেয়ারম্যান করার পক্ষে একমত হতে পারেনি পরিচালনা পর্ষদ। এমন পরিস্থিতিতে স্বতন্ত্র পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. মাকছুদুর রহমান সরকারকে এক বছরের জন্য চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে এসবিএসি ব্যাংকে সুশাসন নিশ্চিতের পাশাপাশি আর্থিক ভিত্তি সুসংহত হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।

এসবিএসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মাকছুদুর রহমান সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে থেকে যেভাবে চলে আসছে তা যে ব্যর্থ হয়েছে, সেটি আজ প্রমাণিত। এ জন্য দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও ব্যাংক খাতে নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। শেয়ারধারী পরিচালকেরা মনে করেছেন, একটা পরিবর্তন দরকার। তাই তাঁরা সবাই মিলে আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন।’

আগের স্বতন্ত্র পরিচালকদের ভূমিকা নিয়ে মাকছুদুর রহমান সরকার বলেন, ‘আগে তাঁরা যথাযথ দায়িত্ব পালন করেননি। আমি যেহেতু দায়িত্ব নিয়েছি, সেহেতু নতুন একটা ধারা তৈরি করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, যাতে পরবর্তী সময়ে অন্য ব্যাংকগুলো সেটা অনুসরণ করতে পারে।’

এনসিসি ব্যাংক সম্প্রতি ১২তম বিশেষ সাধারণ সভার আয়োজন করে সংঘবিধির পরিবর্তন করেছে। যেখানে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচনসংক্রান্ত বিষয়ে সংশোধনী অনুমোদিত হয়েছে।

নতুন নিয়মানুযায়ী, ব্যাংকে সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদে দায়িত্ব পালনকারী শেয়ারহোল্ডার-পরিচালক জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে (রোটেশনাল ভিত্তিতে) চেয়ারম্যান পদের দায়িত্ব পাবেন। এতে করে ব্যাংকের সব শেয়ারহোল্ডার-পরিচালকেরই পর্যায়ক্রমে চেয়ারম্যান হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

নতুন নিয়মে চেয়ারম্যানের মেয়াদ শেষ হলে বা পদ খালি হলে পরবর্তী জ্যেষ্ঠতম শেয়ারধারী পরিচালক এই পদে আসবেন। পরিচালনা পর্ষদে দুই বা ততোধিক পরিচালকের কার্যকাল বা জ্যেষ্ঠতা সমান হলে বয়সের ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারিত হবে। জ্যেষ্ঠতম পরিচালক যদি লিখিতভাবে চেয়ারম্যান হতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন, তখন পরবর্তী জ্যেষ্ঠতম শেয়ারধারী পরিচালক চেয়ারম্যান হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবেন। কোনো পরিচালক নিজ ক্রমানুসারে চেয়ারম্যান হতে রাজি না হলে তা পরিচালক হিসেবে তাঁর পর্ষদে থাকার ক্ষেত্রে বাধা হবে না। তবে তিনি পরবর্তী সময়ে কেবল বিদ্যমান সব পরিচালকের পর্যায়ক্রমিক মেয়াদ শেষ হওয়ার পরই চেয়ারম্যান হওয়ার সুযোগ পাবেন।

সংশোধনীতে আরও বলা হয়েছে, মনোনীত ও নতুন পরিচালকদের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে এবং এই সংশোধনী পর্ষদে যুক্ত হওয়ার তারিখ থেকে তাঁদের জ্যেষ্ঠতা গণনা করা হবে। পরবর্তী সময়ে আবার যুক্ত হওয়া সাবেক পরিচালকেরাও ‘নতুন পরিচালক’ হিসেবে গণ্য হবেন এবং বিদ্যমান পরিচালকদের পর্যায়ক্রমিক মেয়াদ শেষে চেয়ারম্যান হওয়ার সুযোগ পাবেন। চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালনকালে কোনো পরিচালককে পর্যায়ক্রমিক অবসরে যেতে হলে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনক্রমে আবার পরিচালক হিসেবে নির্বাচিত হলে তিনি চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ করবেন। কোনো চেয়ারম্যান শারীরিকভাবে বা মানসিকভাবে দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে পড়লে অথবা তাঁর কার্যক্রমে ব্যাংকের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে হলে তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তিসংগত সুযোগ দেওয়া হবে। এরপর পরিচালনা পর্ষদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের মতে তাঁকে পদচ্যুত করা যাবে। এ ছাড়া জ্যেষ্ঠতার নিয়ম অনুযায়ী খালি পদ পূরণ করা হবে।

জানতে চাইলে এনসিসি ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুন নেওয়াজ সেলিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেক বছর চেয়ারম্যান ও পরিচালক হিসেবে দেখে আসছি, চেয়ারম্যানের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অনেকে পদ পেতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এ নিয়ে পরিচালকদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এটা বন্ধের জন্য ২০২৫ সালে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে চেয়ারম্যন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে আদালতের স্থগিতাদেশ থাকায় সেটা আর এগোয়নি। এখন নতুন করে আবার উদ্যোগ নেওয়ায় ব্যাংকের সব পর্যায়ের অনুমোদন হয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন পেলে আগামী অক্টোবর থেকে নতুন নিয়মে চেয়ারম্যান নির্বাচন শুরু হবে। ফলে এনসিসি ব্যাংকের পরবর্তী নেতৃত্ব নিয়ে আর কোনো অসম প্রতিযোগিতা হবে না। সবাই ব্যাংকের ভালোর দিকে মনোযোগ দিতে পারবেন, যা ব্যাংকের ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখবে।’

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ