বুলডোজারের পর কৃত্রিম দাবানল—দক্ষিণ লেবাননে যেভাবে বসতি ও ইতিহাস মুছে দিচ্ছে ইসরায়েল
১৩ আগস্ট, ২০২৬ এ ৮:০০ AM

ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে বনাঞ্চল পুড়ে ছারখার হওয়ার পাশাপাশি দেশটির সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে দক্ষিণ লেবাননে ইচ্ছাকৃতভাবে দাবানল সৃষ্টি করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা, জরুরি সেবা বিভাগ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেছেন।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর দাবি, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় ছড়িয়ে পড়া এ আগুন লেবাননের প্রাকৃতিক পরিবেশকে ধ্বংস করার দীর্ঘদিনের ইসরায়েলি অভিসন্ধিরই অংশ।
গত মঙ্গলবার দক্ষিণ লেবাননের খিয়াম এলাকার বাইরের একটি বনাঞ্চলে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ফ্লেয়ার বা অগ্নিগোলক নিক্ষেপ করলে সেখানে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়।
লেবাননের নাবাতিয়েহ অঞ্চলের সিভিল ডিফেন্সের প্রধান হুসেইন ফাকিহ জানান, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যখন সেই আগুন নেভানোর চেষ্টা করছিলেন, তখন তাঁদের খুব কাছে একটি ড্রোন হামলা চালানো হয়। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার স্বার্থে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সেখান থেকে পিছু হটতে বাধ্য হন।
পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে হুসেইন ফাকিহ বলেন, ‘আমাদের এখনকার বেশির ভাগ অভিযানই আগুন নেভানোর কাজের সঙ্গে যুক্ত। বিশাল এলাকার বন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আমার কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে সীমান্ত বা যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি এলাকাগুলোর ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ জমি আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
গত ১৭ জুন লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা হয়। এরপর দুই পক্ষের লড়াই অনেকটাই কমে এসেছে। তবে প্রথম সারির উদ্ধারকারীদের দেওয়া সাক্ষ্য ও ভিডিও ফুটেজ অনুযায়ী, এ দুই মাসের মধ্যে ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননজুড়ে, বিশেষ করে জলপাইবাগান ও কৃষিজমিতে ক্রমাগত আগুন লাগিয়ে চলেছে।
দাবানল সৃষ্টির এসব ঘটনার বিষয়ে মন্তব্য জানতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
হুসেইন ফাকিহ বলেন, যুদ্ধবিরতির পরপরই তারা এ কাজ শুরু করেছে। এখন প্রতিদিন সেখানে অগ্নিবোমা ফেলা হচ্ছে। ছোট ছোট ড্রোন এসে ওপর থেকে দাহ্য পদার্থ ছড়াচ্ছে, বনাঞ্চল লক্ষ্য করে সাদা ফসফরাস শেল নিক্ষেপ করা হচ্ছে। এমনকি দিনের বেলাতেও তারা ইলুমিনেশন ফ্লেয়ার বা আলো উৎপাদনকারী অগ্নিগোলক ফেলছে, যাতে গাছপালায় সহজে আগুন ধরে যায়।
দক্ষিণ লেবাননের অন্যান্য এলাকার ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ও বাসিন্দারা একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, ইসরায়েলি ড্রোন ও গোলাবারুদের আঘাতে শুষ্ক ঝোপঝাড় ও বনাঞ্চলে আগুন ছড়িয়ে পড়ছে। গত শুক্রবার ইসরায়েলি গোলায় ঘন বনাঞ্চল পরিবেষ্টিত দুটি বড় এলাকায় ভয়াবহ দাবানল সৃষ্টি হয়। এর একটি সীমান্তসংলগ্ন কাফরশুবা এলাকায় এবং অন্যটি জেজ্জিন ও পশ্চিম বেকা উপত্যকার মধ্যবর্তী অঞ্চলে।
কাফরশুবা এলাকার সিভিল ডিফেন্স স্টেশন প্রধান সমীর হারদান বলেন, গত শুক্রবার বিকেলে একটি বনাঞ্চলে ইসরায়েলি ড্রোন থেকে গোলাবারুদ ফেলার পর আগুনের সূত্রপাত হয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সারা রাত লড়াই করে গত শনিবার সেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
সমীর হারদান আরও জানান, এরপর গত রোববার আরেকটি ড্রোন এসে ওই এলাকায় নতুন করে আগুন লাগিয়ে দেয়। এমন পরিস্থিতিতে আগুন নেভানোর কাজও কঠিন হয়ে পড়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের যেকোনো অভিযানের আগে লেবানন সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। সেনাবাহিনী এ অনুরোধ ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীসহ গঠিত একটি ‘ডি-কনফ্লিকশন’ বা সংঘাত নিরসন কমিটির কাছে পাঠায়। সেখান থেকে অনুমতি পাওয়ার পরই শুধু ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা কাজ করতে পারেন।
তবে লেবাননের বিশাল বনাঞ্চলজুড়ে আগুন জ্বলতে থাকলেও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের মাত্র দুটি সুনির্দিষ্ট জায়গায় আগুন নেভানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
পরিবেশবাদী সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এ আগুন লেবাননের পরিবেশের ওপর ইসরায়েলি আক্রমণের একটি ধারাবাহিক রূপ। এটি দেশটির বনাঞ্চল এবং এর ওপর নির্ভরশীল জীববৈচিত্র্যকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
লেবাননের পরিবেশ সংরক্ষণবিষয়ক সংগঠন গ্রিন সাউদার্নার্সের প্রতিষ্ঠাতা হিশাম ইউনেস বলেন, ‘এগুলো বহু বছরের পুরোনো প্রাচীন বন। সেখানে ওকগাছের পাশাপাশি মূলত বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনশীল পাইনগাছের প্রাধান্য রয়েছে। এই বনাঞ্চল পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া এ বিশাল এলাকাটি পরিযায়ী পাখিদের যাতায়াত ও বিশ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।’
হিশাম ইউনেস এ ইসরায়েলি হামলাকে ‘ইকোসাইড’ বা ‘পরিবেশগত হত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, গোলাবারুদ, আগুন ও রাসায়নিক ব্যবহার করে দক্ষিণ লেবাননের বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম ধ্বংস করার যে পদ্ধতিগত সামরিক ছক ইসরায়েলের রয়েছে, এটি তারই অংশ।
হিশাম ইউনেস আরও বলেন, এটি শুধু কোনো একটি একক আগুন বা হামলার ঘটনা নয়, বরং ধ্বংসযজ্ঞের এমন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যা ধীরে ধীরে পরিবেশের জীবন ধারণ, পুনরুৎপাদন এবং টিকে থাকার ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়।
হিশাম ইউনেস বলেন, এ ধ্বংসের প্রভাব যখন মানুষের জীবিকাকে সংকটে ফেলে এবং নিজ ভূমিতে ফিরে আসার বা টিকে থাকার পথ বন্ধ করে দেয়, তখন এ ধ্বংসযজ্ঞ আর প্রকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা পুরো ভূখণ্ডের অস্তিত্ব বদলে ফেলার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পরদিন, অর্থাৎ ৮ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলে রকেট হামলা শুরু করে হিজবুল্লাহ। ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে শুরু করা ওই লড়াইয়ের পর থেকেই ইসরায়েল ক্রমাগত লেবাননের বনাঞ্চলগুলো লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে আসছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা নিজেদের লুকিয়ে রাখতে এবং তাঁদের সুড়ঙ্গ বা টানেলগুলো আড়াল করতে বনাঞ্চলগুলো ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। তবে পরিবেশবিদ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই অগ্নিকাণ্ড ও ব্যাপক পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞের সুদূরপ্রসারী প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ছে সাধারণ বেসামরিক জনগণের ওপর।
২০২৪ সালের গ্রীষ্মে ইসরায়েলি সেনারা লেবানন সীমান্তে মধ্যযুগীয় একধরনের গুলতি ব্যবহার করে দেয়ালের ওপার থেকে জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ ছুড়ে মারেন। অন্যদিকে, লেবানন সেনাবাহিনী এমন কিছু ইসরায়েলি ড্রোনের ছবি প্রকাশ করে, যেগুলোতে লাগানো পাইপের সাহায্যে বনাঞ্চলে দাহ্য পদার্থ ছিটানো হচ্ছিল।
গত ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ লেবাননের খামারগুলোয় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান থেকে আগাছানাশক রাসায়নিক ছিটানো হলে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। কারণ, এই রাসায়নিকের সঙ্গে ক্যানসারের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।
এ আগুনের কারণে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ক্ষতির বাইরেও দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দারা শৈশবের চেনা সেই সবুজ গ্রাম ও প্রকৃতি হারিয়ে ফেলার শোকে গভীরভাবে মর্মাহত। ১ আগস্ট সীমান্তবর্তী গ্রাম ইয়ারুনের বাস্তুচ্যুত বাসিন্দারা জানতে পারেন যে দখলদার ইসরায়েলি সেনারা তাঁদের ঘরবাড়ির পাশাপাশি জলপাই ও ফলের বাগানগুলোয় আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন।
কাছাকাছি খ্রিষ্টান-অধ্যুষিত শহর রমিশ ও আইন ইবেলের বাসিন্দারাও সেই আগুনের বেশ কিছু ছবি পাঠিয়েছেন। ইসরায়েল সীমান্তসংলগ্ন হাতে গোনা যে কয়েকটি গ্রাম ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এখনো খালি করতে বলেনি, এ দুটি সেগুলোর অন্যতম।
ইয়ারুনের মেয়র হাফেজ ঘাসাম বলেন, ‘তারা (ইসরায়েলি বাহিনী) ইতিমধ্যে আমাদের গ্রাম বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এরপর গাছগুলোয় আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এই অঞ্চলের সুনির্দিষ্ট কিছু জায়গায় শুধু জলপাইগাছগুলো টিকে ছিল, সেগুলো ছিল বিশাল বাগান ও গাছগুলো অনেক পুরোনো। তারা সেখান থেকেই আগুন লাগানো শুরু করে, যা পরে গ্রামের পুরো সীমানায় ছড়িয়ে পড়ে।’
গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হওয়া ইয়ারুনের বাসিন্দারা এর আগে নিজেদের অর্থ জোগাড় করে আকাশচুম্বী মূল্যে স্যাটেলাইট বা উপগ্রহের ছবি কিনে দেখেছিলেন কীভাবে ইসরায়েলি বাহিনী তাঁদের গ্রামের ৯০০টি বাড়ির মধ্যে ৮৮০টি বুলডোজার দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে।
মেয়র হাফেজ ঘাসাম আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘এ গাছগুলোর বেশির ভাগই আমাদের দাদা-দাদি আর মা–বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি আমরা। এগুলোর সঙ্গে আমাদের গভীর আবেগ জড়িত। এ ছাড়া এ গাছগুলো গ্রামের মানুষের আয়েরও একটি বড় উৎস ছিল।’
মেয়র আরও বলেন, ‘তারা আসলে এ ভূমিকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলতে চাইছে। তারা আমাদের পুরো ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সব স্মৃতি মুছে দেওয়ার চেষ্টা করছে। হয়তো তাদের পরিকল্পনা হলো কিছুদিন পর যাতে মনেই না হয় যে এ মাটিতে কখনো কোনো মানুষের বসতি ছিল।’
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পর্কিত সংবাদ
জেন জির পর এবার ‘জেন আলফা’: উন্নত স্কুলের দাবিতে কাঁপছে ভারত
১৩ আগস্ট, ২০২৬ এ ১:০৪ PM · বাংলা ট্রিবিউন
এক প্রজন্ম পর নাটকীয় সূর্যগ্রহণ দেখল কোটি কোটি মানুষ, আবার কবে দেখা যাবে এমন মহাজাগতিক দৃশ্য
১৩ আগস্ট, ২০২৬ এ ১০:০৮ AM · প্রথম আলো
পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ আজ: কারা কখন দেখতে পাবেন, বাংলাদেশে কি দেখা যাবে
১২ আগস্ট, ২০২৬ এ ১২:২৯ PM · প্রথম আলো
