শাহজাদপুর সংবাদ

বীমা কোম্পানিতে প্রথমবারের মতো চার সংস্থার যৌথ বিশেষ নিরীক্ষা

৩ নভেম্বর, ২০২৬ এ ১১:৩৮ AM

বীমা কোম্পানিতে প্রথমবারের মতো চার সংস্থার যৌথ বিশেষ নিরীক্ষা

বীমা খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো চার নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বয়ে বীমা কোম্পানিগুলোর বিশেষ নিরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সমন্বয়ে একটি যৌথ নিরীক্ষার কার্যপরিধি (টার্মস অব রেফারেন্স বা টিওআর) খসড়া করা হয়েছে।

এই উদ্যোগের আওতায় বীমা কোম্পানির আর্থিক বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, বিনিয়োগ, প্রিমিয়াম সংগ্রহ, দাবি পরিশোধ, কর ও ভ্যাটসংক্রান্ত তথ্যসহ বিভিন্ন আর্থিক কার্যক্রম একসঙ্গে যাচাই করা হবে। প্রাথমিকভাবে গত পাঁচ অর্থবছরের তথ্য নিরীক্ষার আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রয়োজনে নিরীক্ষার সময়সীমা বাড়ানো বা কমানো যাবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক একাধিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার আওতাধীন। ফলে আলাদাভাবে নিরীক্ষা চালালে অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া কঠিন হয়। সমন্বিত নিরীক্ষার মাধ্যমে আর্থিক অনিয়ম, তথ্যের অসংগতি, অর্থের অপব্যবহার ও সম্ভাব্য জালিয়াতি শনাক্ত করা সহজ হবে।

জানা গেছে, অন্তত ডজন খানেক বীমা কোম্পানি নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ফাঁকি দিয়ে আর্থিক অনিয়ম, তথ্যের অসংগতি, অর্থের অপব্যবহার ও জালিয়াতির ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) শীর্ষ এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেসব কোম্পানি নিজেদের আর্থিক অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে তাদেরকে শাস্তি দেওয়া সহজ হবে। শুধু তাই নয়, এসব কোম্পানির তথ্যের অসংগতি রয়েছে তাদেরকেও শাস্তি দেওয়া সম্ভব হবে।’ তিনি বলেন, ‘চার নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বয়ে বীমা কোম্পানিগুলোর বিশেষ নিরীক্ষা কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতির ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা রোধ করা সম্ভব হবে।’

খসড়া কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, বীমা খাতে আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে আইডিআরএ বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। তবে একটি বীমা কোম্পানির কার্যক্রম শুধু বীমা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যাংকিং কার্যক্রম, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ এবং আয়কর ও ভ্যাটসংক্রান্ত বিষয়ও এর সঙ্গে জড়িত।

একটি কোম্পানির একাধিক ব্যাংক হিসাব, বিনিয়োগ, প্রিমিয়াম সংগ্রহ, দাবি পরিশোধ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন থাকে। এসব বিষয়ে বিভিন্ন সংস্থা আলাদাভাবে নিরীক্ষা করলে সময় ও অর্থ বেশি ব্যয় হয়। একই সঙ্গে এক সংস্থার কাছে থাকা তথ্যের সঙ্গে অন্য সংস্থার তথ্যের অসংগতি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপনের ঝুঁকি থেকে যায়।

এ পরিস্থিতিতে চার সংস্থার সমন্বয়ে বিশেষ নিরীক্ষা পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে একই তথ্য বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাধ্যমে যাচাই ও মিলিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হবে।

প্রস্তাবিত উদ্যোগটি ‘মাল্টি-রেগুলেটর কোঅর্ডিনেটেড স্পেশাল অডিট’ নামে পরিচালিত হবে। এতে প্রতিটি সংস্থা নিজ নিজ আইনি এখতিয়ারের মধ্যে থেকে নিরীক্ষা ও তথ্য যাচাই করবে। কোম্পানির নিয়ন্ত্রক প্রতিবেদন, নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, বিনিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেনসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি একসঙ্গে পরীক্ষা করা হবে।

এ জন্য আইডিআরএর মাধ্যমে চার সংস্থার কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি যৌথ নিরীক্ষা সমন্বয় কমিটি বা টিম গঠন করা হবে। আইডিআরএর পরিচালক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা এর সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর ও বিএসইসি প্রয়োজন অনুযায়ী এক বা একাধিক প্রতিনিধি মনোনয়ন দেবে।

পাশাপাশি আইডিআরএ একটি স্বাধীন ও যোগ্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়োগ কিংবা অনুমোদন করবে। প্রতিষ্ঠানটি পেশাদার নিরীক্ষার কাজ, নথিপত্র যাচাই এবং প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করবে। নিরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো নিজ নিজ এখতিয়ার অনুযায়ী সুপারিশ দেবে।

প্রস্তাবিত কার্যপরিধি অনুযায়ী, আইডিআরএ বীমা আইন, ২০১০, ইনস্যুরেন্স করপোরেশন আইন, ২০১৯ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান পরিপালনের বিষয়গুলো পরীক্ষা করবে। এর মধ্যে থাকবে প্রিমিয়াম আয়ের হিসাব ও পলিসিধারীদের তথ্য যাচাই, দাবি ব্যবস্থাপনা ও নিষ্পত্তির হার, ব্যবস্থাপনা ব্যয়, বিনিয়োগ পোর্টফোলিও এবং লাইফ ফান্ডের অবস্থা পর্যালোচনা।

এ ছাড়া বীমা বিনিয়োগ প্রবিধানমালা, ২০১৯ অনুযায়ী বিনিয়োগ হয়েছে কিনা, আইডিআরএর অনুমতি ছাড়া এফডিআরের ওপর লিয়েন সৃষ্টি করা হয়েছে কিনা, সলভেন্সি মার্জিন প্রবিধানমালা, ২০২৪ এবং আইএফআরএস-১৭ অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা, তা দেখা হবে। ট্যারিফ রেট, পুনঃবীমার নিয়ম, গাড়ি কেনা ও জ্বালানি ব্যয়, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং পরিচালনা পর্ষদের সভার কার্যবিবরণীও যাচাইয়ের আওতায় থাকবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বীমা কোম্পানির নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাব, ঋণ ও অন্যান্য ব্যাংকিং সম্পর্ক পরীক্ষা করবে। বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর, অস্বাভাবিক লেনদেন, নগদ উত্তোলন এবং উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সঙ্গে অর্থের লেনদেনের উৎস ও গন্তব্য অনুসন্ধান করা হবে। বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন, রেমিট্যান্স এবং পুনঃবীমার অর্থ দেশে এসেছে কিনা, তাও যাচাই করা হবে।

বিশেষ করে পরিশোধিত মূলধন প্রকৃতপক্ষে ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছিল কিনা এবং সার্কুলার বা কৃত্রিম লেনদেনের মাধ্যমে মূলধন দেখানো হয়েছে কিনা, তা পরীক্ষা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) নির্দেশনা পরিপালন, অর্থের উৎস ও চূড়ান্ত সুবিধাভোগী মালিকের পরিচয়ও যাচাই করা হবে।

এনবিআর কোম্পানির আয়কর ও ভ্যাটসংক্রান্ত তথ্য পরীক্ষা করবে। আর্থিক বিবরণী, হিসাবের খাতা এবং আয়কর রিটার্নের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কিনা, ঘোষিত আয়ের সঙ্গে প্রকৃত আয় মিলছে কিনা, তা যাচাই করা হবে। অঘোষিত আয়, গোপন লেনদেন, ভুয়া বা অগ্রহণযোগ্য ব্যয় এবং কর ফাঁকির লক্ষণও খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি ভ্যাট নিবন্ধন, রিটার্ন, উৎসে কর কর্তন, দ্বৈত কর পরিহার চুক্তির প্রয়োগ এবং বিচারাধীন কর মামলা পর্যালোচনা করা হবে। কর নির্ধারণ বা জরিমানার মতো ব্যবস্থা এনবিআর নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়ায় নেবে।

অপরদিকে বিএসইসি কোম্পানির হিসাব ও আর্থিক বিবরণীর সঙ্গে স্টক এক্সচেঞ্জে দাখিল করা তথ্য মিলিয়ে দেখবে। অনুমোদিত, ইস্যুকৃত ও পরিশোধিত মূলধন, উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার ধারণ, শেয়ার বন্ধক এবং লক-ইন শর্ত পরিপালন যাচাই করা হবে। এ ছাড়া মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ, লভ্যাংশ ঘোষণা, বোনাস শেয়ার ইস্যু, করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড, ইনসাইডার ট্রেডিং ও শেয়ার কারসাজির লক্ষণ পরীক্ষা করা হবে। আইপিও বা রাইট শেয়ারের মাধ্যমে সংগ্রহ করা অর্থ নির্ধারিত খাতে ব্যবহার হয়েছে কিনা, তাও দেখা হবে।

খসড়া অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে গত পাঁচ অর্থবছরের কার্যক্রম নিরীক্ষা করা হবে। কোম্পানিগুলোকে হিসাবের খাতা, ভাউচার, ব্যাংক লেনদেনের নথি, কর ও বীমা দাবিসংক্রান্ত রেকর্ড এবং পরিচালনা পর্ষদের সভার কার্যবিবরণীসহ প্রয়োজনীয় সব তথ্য সরবরাহ করতে হবে। নিরীক্ষা দলের সরেজমিন যাচাইয়েও সহযোগিতা করতে হবে।

নিরীক্ষার সময় পাওয়া গ্রাহকের তথ্য, বাণিজ্যিক ও আর্থিক নথি গোপন রাখার বাধ্যবাধকতা থাকবে। শেয়ারদর বা আর্থিক অবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, এমন কোনো তথ্য অনুমোদন ছাড়া প্রকাশ করা যাবে না।

প্রতিটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিজ নিজ এখতিয়ারের আওতায় পাওয়া অনিয়ম, আর্থিক পরিমাণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রযোজ্য আইনি ধারার তথ্য প্রতিবেদনে তুলে ধরবে। তবে সব তথ্য সমন্বয় করে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হবে।

নিরীক্ষার সময় কোনও তথ্য, সিদ্ধান্ত বা মূল্যায়ন নিয়ে সংস্থাগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিলে প্রথমে যৌথ নিরীক্ষা সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে তা সমাধানের চেষ্টা করা হবে। তাতেও ঐকমত্য না হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থা নিজস্ব মতামত ও তার কারণ চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আলাদাভাবে উল্লেখ করতে পারবে।

খসড়া কার্যপরিধিতে স্পষ্ট করা হয়েছে, প্রতিটি সংস্থা নিজ নিজ আইনি এখতিয়ার অনুযায়ী কাজ করবে। কোনও সংস্থার প্রতিনিধি অন্য সংস্থার আইনি কাঠামোর আওতাধীন বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন না। সমন্বয় ও সহযোগিতার ভিত্তিতে নিরীক্ষা সম্পন্ন করাই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

সম্পর্কিত সংবাদ