শাহজাদপুর সংবাদ

চ্যালেঞ্জের মধ্যেও তৈরি পোশাকের ব্যবসা বাড়ছে, মজুরিতে পিছিয়ে বাংলাদেশ

৩ নভেম্বর, ২০২৬ এ ১০:৩৫ AM

চ্যালেঞ্জের মধ্যেও তৈরি পোশাকের ব্যবসা বাড়ছে, মজুরিতে পিছিয়ে বাংলাদেশ

একের পর এক সংকট সামলেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়ছে। শুধু ব্যবসা বৃদ্ধি নয়, সরকারের সহায়তা পাওয়ার দিক থেকেও তৈরি পোশাকশিল্প অন্যান্য খাতের চেয়ে এগিয়ে আছে। তবে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরিতে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাওয়া শ্রমিকেরা মজুরি বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের শীর্ষ ক্রেতা সুইডেনভিত্তিক এইচঅ্যান্ডএম গ্রুপের গত মার্চের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চীন, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, ভারত ও তুরস্ক—এই সাত দেশেই পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। দেশের ট্যানারি, জাহাজভাঙা, স মিল এবং নির্মাণ—এই চার খাতে ন্যূনতম মজুরি পোশাকশিল্পের চেয়ে বেশি।

শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে গত রোববার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে শ্রম মন্ত্রণালয়। এরপরও বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। শ্রমিকনেতারা বলছেন, আগে বোর্ড গঠন করে মজুরি নির্ধারণের কাজ এগিয়ে নিলে এই অস্থিরতা এড়ানো যেত। অন্যদিকে মালিকপক্ষ বলছে, শ্রমিকের কম উৎপাদনশীলতা, কম দামের পোশাক এবং পোশাক তৈরিতে কম মুনাফা হওয়ায় শ্রমিকদের বেতন তুলনামূলক কম।

তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের এখন ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা হয়। ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর এই নতুন মজুরিকাঠামো বাস্তবায়ন হয়। আগে পাঁচ বছর অন্তর মজুরি বোর্ড গঠিত হতো। বর্তমান বিএনপি সরকার শ্রম আইন সংশোধন করে শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়কাল কমিয়ে তিন বছর করেছে। সেই হিসাবে আগামী ডিসেম্বর মাস থেকে নতুন মজুরিকাঠামো কার্যকর হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

জানতে চাইলে গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার প্রথম আলোকে বলেন, নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে শ্রমিকের জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। তাঁরা খাবারের খরচ কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছেন। শুধু তা–ই নয়, সংসারের খরচ মেটাতে ঋণ করার প্রবণতাও বেড়েছে। সব মিলিয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার কারণেই শ্রমিকেরা রাস্তায় নেমেছেন।

পোশাক রপ্তানি বাড়ছে

গত দেড় দশকে অন্তত সাতটি চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের রপ্তানি বেড়েছে। ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ড এবং পরের বছর রানা প্লাজা ধসের কারণে পোশাক রপ্তানিতে সাময়িক মন্দা আসে। তবে পোশাক কারখানায় কর্মপরিবেশ উন্নয়নে কাজ করায় ক্রেতাদের আস্থা ফেরে। রপ্তানিও বাড়ে। মাঝে কোভিড মহামারির কারণে পোশাকশিল্পে কঠিন সময় গেছে। তারপর আবার ব্যবসা ঘুরে দাঁড়ায়। গত পাঁচ বছরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক এবং চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যেও তৈরি পোশাকশিল্প রপ্তানি ধরে রেখেছে।

তৈরি পোশাকের রপ্তানি ২০১১ থেকে ২০২৫ সালে বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গত বছর ৩ হাজার ৮৮২ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি এর আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৮৮ শতাংশ বেশি।

গত জুলাইয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্যানুযায়ী, বিশ্ববাজারে গত বছর তৈরি পোশাক রপ্তানিতে সবচেয়ে বেশি হিস্যা (মার্কেট শেয়ার) ছিল চীনের, ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ। তারপরই বাংলাদেশের অবস্থান, ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এ ছাড়া ভিয়েতনামের হিস্যা ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ভারতের ৩ শতাংশ এবং তুরস্কের ২ দশমিক ৩ শতাংশ।

ছয় হাজার কোটি টাকার করছাড়

তিন দশকের বেশি সময় ধরে তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা বিভিন্ন ধরনের করসুবিধা পেয়ে আসছেন। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা ধরে রাখার লক্ষ্যের কথা বলে মালিকেরা এখনো প্রতিবছর কয়েক হাজার কোটি টাকার করছাড় আদায় করে নিচ্ছেন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত শুধু করপোরেট করে ৫ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার ছাড় পেয়েছে। এর কারণ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পোশাক খাতে করপোরেট করহার সবচেয়ে কম, মাত্র ১২ শতাংশ। পরিবেশবান্ধব কারখানা হলে করপোরেট করহার মাত্র ১০ শতাংশ। যদিও অন্য খাতের প্রতিষ্ঠানকে ২০ থেকে ৪৫ শতাংশ করপোরেট কর দিতে হয়।

আয়কর ছাড়াও বিভিন্ন বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নগদ সহায়তা পায় পোশাকশিল্প। বন্ড সুবিধাও পান পোশাকমালিকেরা। এই সুবিধার আওতায় পোশাক খাতের কাঁচামাল যেমন সুতা, কাপড়সহ বিভিন্ন পণ্য বিদেশ থেকে আনতে কোনো শুল্ক-কর দিতে হয় না। চামড়া খাতসহ হাতে গোনা কয়েকটি খাত শুধু বন্ডসুবিধা পায়। অন্য খাতগুলো এসব সুবিধা পায় না।

প্রতিযোগী দেশের তুলনায় মজুরি কম

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যখন তৈরি পোশাকশিল্পে ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা কার্যকর হয়, তখন ডলারের বিনিময় হার ছিল ১১০ দশমিক ৫০ টাকা। সেই হিসাবে ন্যূনতম মজুরি দাঁড়ায় ১১৩ ডলার। তিন বছরের ব্যবধানে প্রতি ডলারের দাম বেড়ে হয়ে হয়েছে ১২৪ টাকা। অর্থাৎ ডলারের হিসাবে এখন ন্যূনতম মজুরি দাঁড়ায় ১০১ ডলার।

যদিও এইচঅ্যান্ডএম গ্রুপের গত মার্চের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১০২ ডলার। পার্শ্ববতী দেশ ভারতে নিম্নতম মজুরি ১২৪ মার্কিন ডলার। এ ছাড়া চীনে ২৯৪, কম্বোডিয়ায় ২০৮, ইন্দোনেশিয়ায় ১৭২, ভিয়েতনামে ১৬৩ এবং পাকিস্তানে ১৩৫ ডলার।

মজুরি কম কেন জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতিযোগী কোনো দেশে পোশাকশিল্পে হেলপার পদ না থাকলেও আমাদের দেশে আছে। কাজের কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা না থাকলেও এই পদে সাড়ে ১২ হাজার টাকায় নিয়োগ পাচ্ছেন যে কেউ। ওভারটাইম ছাড়া মাসে বেতন ১৮ হাজার টাকা পাচ্ছেন মেশিন অপারেটররা। যাঁরা অভিজ্ঞ, তাঁরা ২৫ হাজার টাকাও পান। তা ছাড়া অন্য দেশের তুলনায় আমাদের শ্রমিকদের উৎপাদশীলতা কম। কম দামের তৈরি পোশাক ও সিএম (কাটিং-মেকিং) কম হওয়ার কারণেও শ্রমিকের মজুরি তুলনামূলক কম হয়।’

জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে

তিন বছর আগে তৈরি পোশাকশিল্পে মজুরি বৃদ্ধি হলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে শ্রমিকেরা সেটির সুফল পাননি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে পৌনে ১০ শতাংশে দাঁড়ায়। তারপর আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে সরকার পরিবর্তনের পর শ্রমিকেরা মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে নামেন। সেই আন্দোলনের মুখে গত বছরের জানুয়ারিতে শ্রমিকেরা ৫ শতাংশের পরিবর্তে ৯ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট (মজুরি বৃদ্ধি) পান।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ শতাংশ। বিদায়ী অর্থবছরে তা কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ দাঁড়ায়। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা ৫৬ মাস মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম ছিল। চলমান মধ্যপ্রাচ্যের সংকট প্রকট হওয়ার পর জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্যের দাম আরেক দফা বাড়ে।

গত মাসে প্রকাশিত বিবিএসের এক জরিপে উঠে এসেছে, সিটি করপোরেশন এলাকায় পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় সবচেয়ে বেশি, ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা। আর শহরাঞ্চলে প্রতি পরিবারের মাসিক ব্যয় ৩৭ হাজার ৩৪৪ টাকা এবং গ্রামাঞ্চলে ৩২ হাজার ৫৩২ টাকা। জাতীয় পর্যায়ে পরিবারের মাসিক ব্যয়ের অর্ধেক খাবার এবং অর্ধেক খাবারবহির্ভূত খাতে ব্যয় হয়।

জানতে চাইলে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্টের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, প্রতিযোগী দেশের মজুরি, উৎপাদশীলতাসহ ১১টি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। এসব বিষয় বিবেচনা নিয়ে তিন বছর আগে আমরা বলেছিলাম, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার উপযোগী ন্যূনতম মজুরি হওয়া উচিত ১৭ হাজার ৫০০ টাকা। এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মজুরি অনেক বৃদ্ধির সুযোগ আছে।’ খাদ্য ও চিকিৎসা ভাতার পাশাপাশি শিক্ষা, যাতায়াত ও বিনোদন ভাতা যুক্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ