শাহজাদপুর সংবাদ

বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ গলার ফাঁস : Daily Naya Diganta (দৈনিক নয়া দিগন্ত)

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১:১০ AM

বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ গলার ফাঁস : Daily Naya Diganta (দৈনিক নয়া দিগন্ত)

এ দেশে উন্নয়ন প্রকল্পে খরচের মিটার ছোটে রকেটের গতিতে! পাঁচ বছরের জন্য অনুমোদিত প্রকল্পের কাজ গড়াতে গড়াতে এখন সাড়ে ১২ বছর। আর তার সাথে তরতরিয়ে বেড়েছে ব্যয়ের বহর। এক ধাক্কায় প্রায় ৮০ শতাংশ! বাংলাদেশের যোগাযোগ খাতের করুণ ও পরিচিত এই চিত্রটি আবারো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ‘বগুড়া হতে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ (১ম সংশোধিত) প্রকল্পে। সরকারি নথি ও প্রকল্প প্রস্তাবনার নথি পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, মূল অনুমোদিত পাঁচ হাজার ৫৭৯.৭০ কোটি টাকার প্রকল্পটি প্রথম সংশোধনের পর এসে ঠেকেছে ১০ হাজার ৫৭০.২৯ কোটি টাকায়! অর্থাৎ খরচ বেড়েছে চার হাজার ৯৯০.৫৯ কোটি টাকা বা ৭৯.০৭ শতাংশ (প্রায় ৮০ শতাংশ)। ২০২৩ সালের জুনে সমাপ্ত হওয়ার কথা থাকলেও সেই প্রকল্পটি এখন ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গড়ালো। মাত্র ৭৬ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের জন্য দেশকে গুনতে হচ্ছে সাড়ে ১২টি দীর্ঘ বছর! এই রেলপথ বানাতে প্রতি কিলোমিটারে সার্বিক ব্যয় হবে ১৩৯ কোটি টাকার বেশি বলে প্রকল্প দলিলের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়। আট বছরে প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ২৭.৭২ শতাংশ। পাঁচ বছর থেকে সাড়ে ১২ বছর :সরকারি নথির তথ্য বলছে, এই রেলপথ প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পায় ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর। মূল মেয়াদ ছিল ২০১৮ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ৩০ জুন, অর্থাৎ পাঁচ বছর। এরপর ব্যয় না বাড়িয়ে দুই দফা মেয়াদ বাড়ানো হয়, প্রথমে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত, পরে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। এখন প্রথম সংশোধনীতে মেয়াদ ২০৩০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। মূল মেয়াদের পর আরো সাড়ে সাত বছর লাগবে প্রকল্পটি সমাপ্ত করতে। আদৌ সেই সময়ে এবং সেই ব্যয়ে হবে কি না সন্দেহ খোদ পরিকল্পনা কমিশনের। দৌড়িয়ে খরচ বাড়ল :এ দিকে খোদ প্রকল্প দলিলে ব্যয়বৃদ্ধির কারণ দেখানো হয়েছে যে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশা হালনাগাদের পর কাজের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জমি অধিগ্রহণের হার বাড়ায় মোট অধিগ্রহণ ব্যয় বেড়েছে। নকশা চূড়ান্ত হওয়ার পর একটি রেল ওভারপাস ও একটি সড়ক ওভারপাস যুক্ত হয়েছে। স্টেশন ভবনের নকশা বদলেছে। সেতু ও কালভার্টের সংখ্যা বেড়েছে। কাজের পরিধি বাড়ায় সুপারভিশন কনসালট্যান্সি ব্যয়ও বেড়েছে। ইউটিলিটি স্থানান্তর ও পুনর্বাসনের ব্যয় প্রথম সংশোধনীতে ঢুকেছে, মূল ডিপিপিতে এর হিসাব ছিল না।মূল ডিপিপিতে ডলারের বিনিময় হার ধরা হয়েছিল ৮২.৯৬ টাকা, এখন ধরা হয়েছে ১২২ টাকা। নির্মাণকালের জন্য ৯ শতাংশ প্রাইস অ্যাডজাস্টমেন্ট (বছরে ৩ শতাংশ হারে তিন বছর) এবং কাজের ওপর ৩ শতাংশ ফিজিক্যাল কন্টিনজেন্সির সংস্থান রাখা হয়েছে। মূল ডিপিপিতে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে বগুড়া স্টেশন রিমডেলিংয়ের সংস্থানও রাখা হয়েছিল, এখনো তা আছে। ভারতীয় এলওসি পাল্টে এলো এআইআইবি :প্রকল্প দলিলের তথ্য থেকে জানা গেছে, প্রকল্পের অর্থায়নের কাঠামোও বদলে গেছে। শুরুতে এটি ছিল ভারতের লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি-৩) কাঠামোর আওতায়। সেখানে প্রকল্প ঋণ ছিল তিন হাজার ১৪৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং সরকারি তহবিল প্রায় দুই হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। ভারতীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্যতা যাচাই করেছিল। জমি অধিগ্রহণের অর্থ পরিশোধের আগেই ২০২৫ সালের ৫ মার্চ এলওসি পর্যালোচনা সভায় প্রকল্পটি এলওসি-৩ কাঠামো থেকে বাদ দেয়া হয়। পরে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) অর্থায়নে আগ্রহ দেখায়। সংশোধনীতে এআইআইবির ঋণ ধরা হয়েছে সাত হাজার ৩৮৫ কোটি টাকার মতো। সরকারি তহবিল আনুমানিক তিন হাজার ৭৭ কোটি টাকা এবং অনুদান আট কোটি ৮৯ লাখ টাকা। মোট ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ আসবে ঋণ থেকে। মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় বৃদ্ধি প্রায় ৮৮ শতাংশ।কিলোমিটারপ্রতি খরচ : প্রতিবেশীদের সাথে তুলনা :অনুমোদিত ব্যয় ১০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকাকে ৭৬ কিলোমিটার দিয়ে ভাগ করলে প্রতি কিলোমিটার খরচ আসে ১৩৯ কোটি আট লাখ টাকা। ডলারে প্রায় ১১.৩ মিলিয়ন (১ ডলার = ১২২ টাকা ধরে)। দেশের আরেকটি সাম্প্রতিক প্রকল্প দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনদুম সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ রেলপথ। ১২৯ কিলোমিটার লাইনের প্রকল্প সংশোধন করে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। কিলোমিটারপ্রতি হিসাব প্রায় ১৪০ কোটি টাকা, প্রায় বগুড়া-সিরাজগঞ্জের সমান। সেই প্রকল্পের ক্ষেত্রেও ২০১০ সালের মূল অনুমোদনে ব্যয় ছিল মাত্র এক হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। এ দিকে, ভারতে আসামের কোকরাঝাড় থেকে ভুটানের গেলেফু পর্যন্ত ৬৯ কিলোমিটার লাইনে ব্যয় ধরা হয়েছে তিন হাজার ৪৫৬ কোটি রুপি। কিলোমিটারপ্রতি প্রায় ৫০ কোটি রুপি, যা ডলারে প্রায় ৫৭ লাখ এবং টাকায় প্রায় ৬৯ কোটি। আর অন্ধ্রপ্রদেশের রাজধানী অমরাবতীর জন্য ৫৭ কিলোমিটার নতুন লাইনে ব্যয় দুই হাজার ২৪৫ কোটি রুপি। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি প্রায় ৩৯ কোটি রুপি, টাকায় প্রায় ৫৫ কোটি। মহারাষ্ট্র-মধ্যপ্রদেশের ৩০৯ কিলোমিটার ইন্দোর-মানমাড নতুন লাইনে ব্যয় প্রায় ১৮ হাজার ৩৬ কোটি রুপি, কিলোমিটারপ্রতি প্রায় ৫৮ কোটি রুপি, টাকায় প্রায় ৮০ কোটি। এই লাইনে টানেল ও পাহাড়ি অংশ আছে। পাকিস্তানের আরব নিউজের তথ্য থেকে জানা গেছে, করাচি-পেশোয়ার এক হাজার ৮৭২ কিলোমিটারের এমএল-১ প্রকল্পের ব্যয় শুরুতে ধরা হয়েছিল ৬৮০ কোটি ডলার। পরে সংশোধিত ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৬৬০ কোটি ডলার। কিলোমিটারপ্রতি প্রায় ৩৫ লাখ ডলার। টাকায় প্রায় ৪৪ কোটি। এর প্রথম ধাপ ৪৮০ কিলোমিটার করাচি-রোহরি অংশের ব্যয় ধরা হচ্ছে প্রায় ২০০ কোটি ডলার। কিলোমিটারপ্রতি প্রায় ৪২ লাখ ডলার, যা টাকায় প্রায় ৫১ কোটি। তবে এটি বিদ্যমান লাইন আধুনিকায়ন, পুরোপুরি নতুন লাইন নয়। মালয় মেইলের তথ্য থেকে জানা গেছে, জেমাস-জোহর বারু ১৯২ কিলোমিটার বিদ্যুতায়িত ডাবল ট্র্যাকের ব্যয় ৮৯০ কোটি রিঙ্গিত। এটি ২০২৫ সালে সমাপ্ত হয়েছে। কিলোমিটারপ্রতি প্রায় ৪.৬ কোটি রিঙ্গিত, অর্থাৎ প্রায় ১.১ কোটি ডলার বা টাকায় প্রায় ১৩৩ কোটি। প্রায় বগুড়া-সিরাজগঞ্জের সমান। তবে এটি হলো বিদ্যুতায়িত রেলপথ। টেনেও কাজে গতি ফিরছে না :প্রকল্প দলিলের তথ্য বলছে, ২০১৮ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি আট বছরে, অর্থাৎ ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত বাস্তব কাজ হয়েছে মাত্র ২৭.৭২ শতাংশ। এই কাজ করতে প্রকল্পের অর্থ খরচ হয়েছে ৩৮.৫৩ শতাংশ বা দুই হাজার ২৭৪.৬৬ কোটি টাকা। বাকি প্রায় ৭২ শতাংশ বা তিনগুণের বেশি কাজ আগামী সাড়ে ৪ বছরে শেষ করতে হবে। যা সত্যিই অবাস্তব হবে।

সূত্র: Daily Naya Diganta

সম্পর্কিত সংবাদ