ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্রের মানুষ-দর্শন
২৮ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১১:০০ AM

ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্র তার মানুষ অধ্যয়ন শুরু করে কিছু মৌলিক প্রশ্নের আশ্রয়ে। মানুষ কে, এবং সৃষ্টিজগতের মধ্যে তার অবস্থান ও ভূমিকা কী?
এই প্রশ্নের উত্তর থেকে নির্ধারিত হয় মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে কেমন সম্পর্ক স্থাপন করবে, তার জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থান কী হবে, তার নৈতিক দায়িত্ব কত দূর বিস্তৃত হবে, এবং সভ্যতার দিকনির্দেশ কোন পথে অগ্রসর হবে। কারণ, প্রকৃতির প্রতি মানুষের আচরণ মানুষের আত্মপরিচয়বোধের সরাসরি প্রতিফলন।
ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা এই আত্মপরিচয়কে এমন এক মানবতাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করে। যেখানে মানুষকে বোঝা হয় তিনটি পরস্পরসংলগ্ন পরিচয় দ্বারা। ক. খলিফা, খ. অংশগ্রহণকারী, গ. জবাবদিহিসম্পন্ন সত্তা।
এই তিন পরিচয়ের সমন্বয়ে মানুষের প্রকৃত অবস্থান নির্ধারিত হয়।
আধুনিক মানবকেন্দ্রিক সভ্যতা সাধারণত মানুষকে প্রকৃতির ওপর আরোপিত এক ব্যতিক্রমী শক্তি হিসেবে কল্পনা করে। এখানে মানুষকে এমন এক সত্তা হিসেবে দেখা হয়, যে প্রকৃতির সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার জন্য জন্মেছে; যার বুদ্ধিমত্তা তাকে নিয়ন্ত্রণ, রূপান্তর এবং আধিপত্য বিস্তারের বৈধতা দিয়েছে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি মানবসভ্যতার প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করলেও এর অন্তর্নিহিত প্রিমাইজ অত্যন্ত সমস্যাজনক। কারণ এটি মানুষকে সৃষ্টির সমগ্রতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক প্রভুত্বশালী অবস্থানে নিয়ে যায়।
এই বিচ্ছিন্নতা থেকেই জন্ম নেয় কর্তৃত্ববাদী প্যারাডাইম। যেখানে প্রকৃতি হয়ে উঠে প্রতিপক্ষ; জয়ের অঞ্চল, ব্যবহারের উপাদান।
ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা এই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে। সে মানুষকে প্রকৃতির বাইরে অবস্থিত কোনো সার্বভৌম সত্তা হিসেবে দেখে না। তার বিচারে মানুষ সৃষ্টির অন্তর্গত এক নৈতিক-সচেতন উপস্থিতি।
মানুষের স্বাতন্ত্র্য আছে, কিন্তু সেই স্বাতন্ত্র্য বিচ্ছিন্নতার নয়; দায়িত্বের।
মানুষ প্রথমত খলিফা। এই ধারণার দার্শনিক তাৎপর্য বিশ্লেষণযোগ্য। খলিফা মানে প্রভু নয়। এর অর্থ এমন এক প্রতিনিধি, যার ক্ষমতা স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়; বরং অর্পিত। তার কার্যকারিতা শর্তসাপেক্ষ। সেই শর্তের কেন্দ্রবিন্দু হলো জবাবদিহি।
অতএব খিলাফত কোনো সার্বভৌম দাবি নয়; এটি অর্পিত জিম্মাদারি।
এই বিচারে মানুষের সৃজনশীল ক্ষমতা, বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিনির্মাণের সামর্থ্য ইত্যাদি তাকে অধিকতর ভোগের লাইসেন্স দেয় না; বরং তার ওপর অধিকতর দায়িত্ব আরোপ করে।
এখানে যত বেশি ক্ষমতা, তত বেশি জবাবদিহি।
এই পুনর্বিন্যাস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এটি মানুষের শ্রেষ্ঠত্বকে পুনঃসংজ্ঞায়িত করে।
ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার দৃষ্টিতে আধিপত্য বিস্তারের সামর্থ্য মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দেয় না। মানুষের অনন্যতা তার দায়িত্ব গ্রহণের সক্ষমতায়।
ফিতরাতি বাস্ততন্ত্র সরাসরি বাতিল করে দেয় এমন ধারণাকে, যার দাবি হলো—একটি সভ্যতা যত বেশি প্রকৃতিকে শোষণ করতে পারে, তত বেশি উন্নত!
তার বিচারে একটি সভ্যতা তখনই উন্নত, যখন সে তার শক্তিকে সংযত করতে পারে, তার প্রযুক্তিকে নৈতিকতার আওতাধীন রাখতে পারে, এবং তার উন্নয়নকে সৃষ্টির ভারসাম্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পারে।
ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্র মানুষকে বুঝে অংশগ্রহণকারী সত্তা হিসেবে। এর অর্থ হলো মানুষ প্রকৃতির বাইরে দাঁড়িয়ে নেই। সে নিজেই এখানে প্রকৃতির একটি সক্রিয় উপাদান।
মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাস বৃক্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত, তার খাদ্য মাটির সঙ্গে সম্পর্কিত, তার জলের জরুরত বৃষ্টি ও নদীর সঙ্গে সম্পর্কিত, তার মানসিক ও সাংস্কৃতিক গঠন ভূদৃশ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক কোনো জাহেরি ব্যবহারিক রিশতা নয়। মূলত এ রিশতা অস্তিত্বগত পারস্পরিক নির্ভরতা। প্রকৃতি ছাড়া মানুষের কোনো অস্তিত্ব টিকে থাকা সম্ভব নয়।
এই উপলব্ধি আধুনিক আধুনিক বিজ্ঞান ও দর্শনের কতিপয় বিচারকে চ্যালেঞ্জ করে। বিশেষত যখন সে মানুষকে ‘সাবজেক্ট’ বা কর্তা (যে দেখছে ও ব্যবহার করছে) এবং প্রকৃতিকে ‘অবজেক্ট’ বা জড় বস্তু (যা ব্যবহার করা হচ্ছে) মনে করে।
যদি মানুষ প্রকৃতির অংশ হয়, তবে প্রকৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা মানে নিজেকেই ক্ষতিগ্রস্ত করা। এই সম্পর্ক তাই অস্তিত্বগত।
একটি নগরায়িত মানুষ হয়তো নিজেকে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবতে পারে, কিন্তু তার প্রতিটি নিশ্বাস, প্রতিটি আহার, প্রতিটি কোষীয় ক্রিয়া পৃথিবীর বৃহত্তর পরিবেশগত মেটাবলিজমের অংশ।
‘মেটাবলিজম’ বা বিপাক মানে, একটি জীবন্ত শরীরের ভেতরে শক্তির আদান-প্রদান ও রূপান্তর। পৃথিবী নামক বাস্তুতন্ত্রটি একটি বিশাল জীবন্ত শরীরের মতো। মানুষ যতই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করুক না কেন, সে আসলে এই বিশাল বৈশ্বিক শরীরের একটি অতি ক্ষুদ্র কোষ মাত্র। পৃথিবী যেভাবে শ্বাস নেয়, জলবায়ু পরিবর্তন করে এবং শক্তি আদান-প্রদান করে, মানুষ সেই চক্রেরই একটি অংশ।
ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা এই অংশগ্রহণমূলক অবস্থানকে মানবতত্ত্বের কেন্দ্রে স্থাপন করে।
কারণ মানুষ যদি নিজেকে অংশগ্রহণকারী হিসেবে অনুভব না করে, তবে তার মধ্যে প্রকৃতির প্রতি নৈতিক দায় জন্মায় না।
দায়িত্ববোধ জন্মায় কেবল তখন, যখন সম্পর্কের বোধ জন্মায়।
মানুষের তৃতীয় দিক হলো জবাবদিহিসম্পন্ন সত্তা। এটি মানুষের নৈতিক এজেন্সির ভিত্তি। তার নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং সেই অনুযায়ী কাজ করার স্বাধীন ক্ষমতা আছে।
প্রকৃতির অন্যান্য সত্তাও অস্তিত্বের ভারসাম্যের অংশ। কিন্তু তাদের কোনো নৈতিক আত্মসচেতনতা নেই। একটি বাঘ যখন শিকার করে, সে আত্মজিজ্ঞাসা করতে পারে না যে ‘আমার এই কাজ কি ন্যায়সংগত হলো?’ সে প্রকৃতির অবচেতন নিয়মেই চলে।
অন্যদিকে, মানুষ অনন্য। কারণ, সে নিজের দিকে তাকাতে পারে, নিজের কাজের ‘অর্থ’ ও ‘উদ্দেশ্য’ বিচার করতে পারে। কোনো কাজ করার আগে বা পরে মানুষ নিজেকে প্রশ্ন করতে পারে। এই ক্ষমতাকে দর্শনে ‘রিফ্লেক্সিভিটি’ বা আত্মসচেতনতা বলা হয়।
এই সক্ষমতাই মানুষকে জবাবদিহির পরিসরে আনে।
ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার মতে, আমরা যখন একটা বনাঞ্চল কেটে ফেলি, নদী ভরাট করি বা কলকারখানার বর্জ্য দিয়ে মাটি দূষণ করি, তখন এর মধ্য দিয়ে আসলে নিজেদের ‘মানুষ হিসেবে নিজের পরিচয়’ (অ্যান্থোপ্রলজিক্যাল সেল্ফ–ডেফিনিশন) ঠিক করি।
যে মানুষ সৃষ্টির ভারসাম্য রক্ষা করে, সে নিজেকে দায়িত্ববান সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
যে মানুষ ধ্বংসকে উন্নয়ন বলে দাবি করে, সে নিজের অস্তিত্বগত সম্মানকে ক্ষুণ্ন করে। প্রকৃতি ধ্বংস করে নিজেকে উন্নত দাবি করা একধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা বা ভণ্ডামি।
ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা মনে করে, মানুষের পরিবেশগত বিপর্যয় মূলত মানবতাত্ত্বিক বিচ্যুতির ফল। এই বিচ্যুতি তিনভাবে ঘটে।
১. যখন মানুষ প্রকৃতিকে পণ্য বানায়: যখন প্রকৃতির মূল্য কেবল বাজারমূল্যে নির্ধারিত হয়, তখন তার সত্তাগত মর্যাদা বিলুপ্ত হয়। প্রকৃতিকে এই ‘পণ্যকরণ’ বা ক্যাপিটালিস্টিক কমেডিফিকেশন মানুষের এক মৌলিক বিচ্যুতি।
দার্শনিক বিচারে এটি সংকীর্ণতাবাদ বা অবমাননাকরণ (রিডাকশনিজম), যা কোনো বিশাল এবং মহান বিষয়ের আসল রূপকে ছোট করে দেখে। প্রকৃতির বিশাল অস্তিত্ব, সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিকতাকে যখন মানুষ কেবল ‘উপযোগিতা’ বা ‘আমার কী কাজে লাগবে’-ধরনের স্বার্থপর চিন্তার ভেতর বন্দী করে ফেলে, তখন প্রকৃতির পুরো অস্তিত্বটাই মানুষের কাছে সংকুচিত বা ছোট হয়ে যায়।
২. যখন উন্নয়ন ধ্বংসের ছদ্মনামে পরিণত হয়: মানুষের আরেক বিচ্যুতি ঘটে তখন, যখন উন্নয়নকে এমন এক সর্বজনগ্রাহ্য আদর্শে রূপ দেওয়া হয়, যার নামে যেকোনো ধ্বংস বৈধতা পায়।
ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা উন্নয়নের বিরোধিতা করে না। বরং প্রশ্ন তোলে-উন্নয়ন কিসের, কার জন্য, কত দূর, এবং কোন মূল্যে?
যদি উন্নয়ন এমন হয় যে সে নদী মেরে শহর গড়ে, বন ধ্বংস করে শিল্পায়ন ঘটায়, মাটি বিষিয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়ায়—তবে তা প্রকৃত উন্নয়ন নয়; এটি গুরুতর বিচ্যুতি।
এটি এমন অগ্রগতি, যার ভেতরেই ভবিষ্যৎ বিপর্যয়ের বীজ নিহিত।
৩. যখন মানুষ নিজের ফিতরাত ভুলে যায় এটাই সবচেয়ে গভীর বিচ্যুতি। ফিতরাত মানে মানুষের সেই অন্তর্গত নৈতিক-অস্তিত্বগত গঠন, যা তাকে সামঞ্জস্য, সংযম, সৌন্দর্যবোধ এবং সম্পর্কের দিকে আহ্বান করে।
যখন মানুষ নিজের ফিতরাত থেকে বিচ্যুত হয়, তখন তার প্রযুক্তি হতে থাকে নৈতিকতাহীন, তার জ্ঞান হয় প্রজ্ঞাহীন, তার উন্নয়ন সীমাহীন ভোগে পরিণত হয়।
এই বিচ্যুতির ফলেই মানুষ এমনভাবে পৃথিবীর ওপর কাজ করতে শুরু করে, যেন সে নিজেই অস্তিত্বের চূড়ান্ত মানদণ্ড। এটি মানবিক অহংকারের চরম রূপ।
ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার দাবি হলো-পরিবেশ সংকট মূলত প্রকৃতিতে নিহিত নয়; সংকট নিহিত মানুষের মধ্যেই ।
মূল রোগ মানুষের আত্মপরিচয়ের বিপর্যয়। যে মানুষ নিজেকে প্রভু মনে করে, সে শোষণ করবে। যে মানুষ নিজেকে বিচ্ছিন্ন ভাবে, সে ধ্বংস করবে। যে মানুষ নিজের ফিতরাত ভুলে যায়, সে ভারসাম্য হত্যা করবে।
অতএব পরিবেশ পুনরুদ্ধারের প্রকৃত সূচনা হবে মানুষের আত্মবোধের পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে ।
মানুষকে আবার শিখতে হবে সে কে। সে প্রকৃতির মালিক নয়, অংশীদার। সে বিধ্বংসী নিয়ন্তা নয়, জবাবদিহিসম্পন্ন প্রতিনিধি। সে বিচ্ছিন্ন সত্তা নয়, সৃষ্টির সমগ্রতার অন্তর্গত এক নৈতিক উপস্থিতি।
এই আত্মস্মরণে নিহিত আছে ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার মানবতাত্ত্বিক পুনর্জাগরণ। এই পুনর্জাগরণ ছাড়া কোনো পরিবেশগত পুনরুদ্ধার স্থায়ী হতে পারে না।
মুসা আল হাফিজ : লেখক, গবেষক এবং ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের চেয়ারম্যান
সূত্র: প্রথম আলো
