শাহজাদপুর সংবাদ

নবী ইউসুফের জীবনে সংস্কার ও নেতৃত্ব

২৭ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১১:০০ AM

নবী ইউসুফের জীবনে সংস্কার ও নেতৃত্ব

মহান আল্লাহ নবী ইউসুফের জীবনের ঘটনাকে পবিত্র কোরআনে ‘আহসানুল কাসাস’ (সুন্দরতম কাহিনি) হিসেবে অভিহিত করেছেন। আসমানি কিতাবগুলোতে যত জীবনকথা রয়েছে, তার মধ্যে এই কাহিনি এক নৈতিকতার মহাকাব্য।

সাধারণত আমরা তাঁর জীবনকে কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়া, রূপ-লাবণ্যের প্রলোভন জয় করা, মিথ্যা অপবাদে কারাবরণ এবং পরবর্তী সময়ে মিসরের অর্থ ও খাদ্যমন্ত্রী পদে উন্নীত হওয়ার অলৌকিক পরিক্রমা হিসেবেই পাঠ করে থাকি।

তবে এই বহুল আলোচিত অধ্যায়গুলোর আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে তাঁর প্রজ্ঞা, আবেগ সংবরণ, অপরাধীদের মানসিক সংস্কার এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার যুগান্তকারী অধ্যায়। রাষ্ট্রক্ষমতা ও ব্যক্তিগত দুঃখ-বেদনাকে ছাপিয়ে তিনি প্রতিশোধের বদলে সমাজ সংস্কার এবং প্রজ্ঞাপূর্ণ নেতৃত্বের নজির স্থাপন করেছিলেন

ভাইদের মানসিক সংশোধন

ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছে শত্রুকে বিনাশ করা বা প্রতিশোধ নেওয়া অতি সাধারণ মানবীয় প্রবণতা। কিন্তু ইউসুফ (আ.) যখন মিসরের ক্ষমতার অধিকারী হলেন এবং তাঁর অত্যাচারী ভাইয়েরা খাদ্যশস্যের প্রয়োজনে মিসরে উপস্থিত হলো, তখন তিনি কোনো প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি। শুধু শারীরিক শাস্তি দিলে তাদের অপরাধবোধ জাগ্রত হতো না, এ জন্য অন্তরের হিংসা ও অহংকার দূর করে তাদের আত্মশুদ্ধি ঘটানোর রাস্তা অবলম্বন করলেন।

প্রথম সাক্ষাতেই নিজের পরিচয় প্রকাশ না করে তিনি কৌশল অবলম্বন করেন। ভাইদের কাছে ছোট ভাই বিন ইয়ামিনকে নিয়ে আসার শর্ত আরোপ করেন এবং পরবর্তী সময়ে কৌশলে তাঁকে মিসরে রেখে দেন। এই পুরো প্রক্রিয়াটির উদ্দেশ্য ছিল তাদের এত দিনের সুপ্ত অপরাধবোধকে জাগিয়ে তোলা।

যখন তারা বিন ইয়ামিনকে রক্ষায় পিতার কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কারণে অসহায় বোধ করল, তখন জ্যেষ্ঠ ভাই জুহুদা অতীতে ইউসুফের সঙ্গে কৃত অপরাধ ও পিতার বেদনার কথা স্মরণ করে আত্মগ্লানিতে ভেঙে পড়েছিল।

কোরআন এই দৃশ্যটি সুন্দরভাবে চিত্রায়িত করেছে। বলা হয়েছে, ‘তারা বলল, আল্লাহর কসম, আল্লাহ আপনাকে আমাদের ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন এবং আমরা অবশ্যই অপরাধী ছিলাম।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৯১)

তারা অপরাধ স্বীকার করার পর ইউসুফ (আ.) তাৎক্ষণিকভাবে তাদের ক্ষমার বার্তা ঘোষণা করে বললেন, ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন, তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৯২)

অপরাধী মনকে অনুশোচনার আগুনে পুড়িয়ে খাঁটি করে পুনর্গঠিত করার মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা ছিল এটি।

আত্মসংযমের পরীক্ষা

তাঁর জীবনের অন্যতম বিস্ময়কর দিক হলো দীর্ঘ নীরবতা ও আত্মসংযম। শৈশবে ধোঁকার শিকার হয়ে কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়া, অতঃপর দাস হিসেবে বিক্রি হয়ে আজিজে মিসরের ঘরে বন্দী হওয়া এবং যৌবনের সূচনাতেই কারারুদ্ধ হওয়া, প্রতিটি পদক্ষেপেই তিনি ছিলেন একাকী ও বিচ্ছিন্ন।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, মিসরের ক্ষমতা অর্জনের পরও তিনি তৎক্ষণাৎ কেনানে পিতা নবী ইয়াকুবের কাছে সংবাদ পাঠাতে পারতেন। তিনি জানতেন, পিতা বিরহে অন্ধ হয়ে গেছেন। তবু আল্লাহর বিশেষ নির্দেশনা ও সময়কালের প্রতি গভীর আস্থা রেখে ধৈর্য ধারণ করেছিলেন।

কারণ, অসময়ে নিজের পরিচয় প্রকাশ করলে তাঁর ভাইদের সংস্কারের পরিকল্পনা ব্যাহত হতে পারত এবং আল্লাহর নির্ধারিত বিচার পূর্ণতা পেত না।

এটি ছিল আত্মসংযমের অগ্নিপরীক্ষা। গভীর কষ্ট থাকা সত্ত্বেও তিনি তাড়াহুড়ো করেননি। কোরআনে নবী ইউসুফের এই নীতিই প্রতিধ্বনিত হয়। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহভীতি অবলম্বন করে এবং ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ সেরূপ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৯০)

বন্দিজীবনে ধর্ম প্রচার

কারাগার হলো মানুষের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের কেন্দ্রস্থল। কিন্তু ইউসুফ (আ.) জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠকেও সমাজ সংস্কারের উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত করেছিলেন।

বন্দী দুই যুবক যখন স্বপ্নের ব্যাখ্যা চাইতে এল, তখন তিনি শুধু স্বপ্নের বৈষয়িক উত্তর দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি। তাদের মানসিক অবস্থা ও দুর্বলতা বুঝতে পেরেছিলেন। এ জন্য প্রথমে নিজের নৈতিক অবস্থান ও একত্ববাদের দাওয়াত উপস্থাপন করলেন। বললেন, ‘হে আমার কারাসঙ্গীদ্বয়, পৃথক পৃথক বহু পালনকর্তা ভালো, নাকি পরাক্রমশালী এক আল্লাহ?’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৩৯)

এমনকি কারাগারে থাকাকালীন নৈতিকতা ও অনুপম চরিত্রের কারণে কয়েদিরা তাঁকে ‘আল-মুহসিন।’ (সৎকর্মশীল ব্যক্তি) উপাধিতে ভূষিত করেছিল। কোরআনে এসেছে, ‘তারা বলল, আমরা আপনাকে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত দেখতে পাচ্ছি।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৩৬)

প্রতিকূল ও বিষাদময় পরিবেশেও নিজের চরিত্র ও দাওয়াতি মিশন ধরে রেখে কীভাবে বন্দীদেরও সঠিক পথ দেখানো যায়, নবী ইউসুফের জেলজীবন তার অতুলনীয় দৃষ্টান্ত।

সংকট ব্যবস্থাপনা

ইউসুফ (আ.) যখন মিসরের ক্ষমতার কেন্দ্রে এলেন, তখন মিসর ও তার আশপাশের অঞ্চল ভয়াবহ সাত বছরের মহাদুর্বিপাক ও দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে যাচ্ছিল। তৎকালীন যুগে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মহামারি বা দুর্ভিক্ষ সামাল দেওয়ার মতো বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি ছিল না। ফলে তিনি দূরদর্শী ও বিজ্ঞানসম্মত অর্থনীতির সূচনা করলেন।

রাজার স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদানের পাশাপাশি তিনি দুর্ভিক্ষের জন্য ১৪ বছরের মহাপরিকল্পনা প্রদান করেন, যা কোরআনে বর্ণিত হয়েছে এভাবে, ‘ইউসুফ বললেন, তোমরা টানা সাত বছর চাষাবাদ করবে, অতঃপর যে ফসল তোমরা কাটবে, তার মধ্য থেকে যা তোমরা খাবে, সে অল্প কিছু খাদ্য ছাড়া বাকিটা শিষসহ রেখে দেবে।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৪৭)

এই ‘শিষসহ খাদ্য সংরক্ষণের’ আধুনিক বৈজ্ঞানিক নীতি খাদ্যকে দীর্ঘকাল পর্যন্ত পচন থেকে রক্ষা করেছিল। মিসরের মতো একটি বহু ঐশ্বরিক বিশ্বাসে বিশ্বাসী জাতিকে দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা করে শুধু রাষ্ট্র পরিচালনা নয়, আন্তর্জাতিক খাদ্য কূটনীতিরও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ইউসুফ (আ.)। এত বড় ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থান করার পরও তিনি কখনোই অহংকারী হননি।

যখন ক্ষমতা অর্জন করেন, তখন নিজের স্বার্থ না দেখে দায়িত্ব ও সেবা করার যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। কোরআনে এসেছে, ‘তিনি (ইউসুফ) বললেন, আমাকে দেশের ধনভান্ডারের দায়িত্বে নিযুক্ত করুন; নিশ্চয়ই আমি হেফাজতকারী ও সুবিজ্ঞ।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৫৫)

এখানে ‘হেফাজতকারী’ দ্বারা তাঁর অসামান্য সততা এবং ‘সুবিজ্ঞ’ দ্বারা প্রশাসনিক প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যায়।

নবী ইউসুফের জীবনকথা মানব ইতিহাসের অন্যতম নৈতিক ও প্রশাসনিক মাইলফলক। ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছে শত্রুকে ক্ষমা করা, বৈরী পরিবেশে নিজের নীতি ও ইমানকে অক্ষুণ্ন রাখা, অপরাধীকে শাস্তির বদলে অনুশোচনার সুযোগ করে দেওয়া এবং সংকটের মুখে দূরদর্শী নেতৃত্ব দিয়ে একটি জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা, তাঁর জীবনের এই দিকগুলো আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতাদের জন্য অনন্ত দিকনির্দেশনা।

আজকের প্রতিশোধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভরা পৃথিবীতে নবী ইউসুফের দূরদর্শী সামাজিক সংস্কারের মডেল বাস্তবায়নের গুরুত্ব অপরিসীম।

নাহিদা সুলতানা: আলেমা ও প্রাবন্ধিক

nahidasultana753375@gmail.com

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ

নবী ইউসুফের জীবনে সংস্কার ও নেতৃত্ব | শাহজাদপুর সংবাদ