শাহজাদপুর সংবাদ

দুর্নীতি যেভাবে ইমান ক্ষয় করে

২৬ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৯:০০ AM

দুর্নীতি, ঘুষ, স্বজনপ্রীতি, সরকারি বা অপরের সম্পদ আত্মসাৎ এবং আমানতের খেয়ানত মানুষের এই আত্মিক ভিত্তি তথা ইমানকে ধীরে ধীরে ক্ষয়িষ্ণু করে ফেলে।

অসাধু উপায়ে উপার্জিত অর্থ বা ক্ষমতা আপাতদৃষ্টিতে বাহ্যিক সাফল্য এনে দিলেও তা মানুষের নৈতিক চেতনাকে পঙ্গু করে দেয় এবং আত্মিক জীবনকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।

পবিত্র কোরআন–হাদিসের আলোকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দুর্নীতি কীভাবে পর্যায়ক্রমে মানুষের ইমানকে দুর্বল ও নিঃশেষ করে।

অন্যায় ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বা সুবিধা মানুষের অন্তরে পাপের দাগ তৈরি করে। মানুষ যখন বারবার দুর্নীতিতে লিপ্ত হয়, তখন তার বিবেকবোধ লোপ পায় এবং অন্যায় কাজকেও সে স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করে।

এই অবস্থাকে কোরআনের ভাষায় ‘রান’ বা অন্তরের মরিচা বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘কখনো নয়, বরং তারা যা অর্জন করত, তা-ই তাদের অন্তরে মরচে ধরিয়েছে।’ (সুরা মুতাফফিফীন, আয়াত: ১৪)

অন্তরে যখন অন্যায়ের মরচে পড়ে, তখন ইমানের শুভ্র আলো আর সেখানে স্থায়ী হতে পারে না।

দুর্নীতিতে লিপ্ত অবস্থায় মানুষের সক্রিয় ইমানি সচেতনতা সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।

মহানবী (সা.) অন্যায় ও আত্মসাতের ভয়াবহতা বুঝাতে গিয়ে বলেছেন, ‘ব্যভিচারী যখন ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তখন সে মুমিন থাকে না; চোর যখন চুরি করে, তখন সে মুমিন থাকে না এবং কোনো লোক যখন মানুষের দৃষ্টির সামনে মূল্যবান সম্পদ লুণ্ঠন বা আত্মসাৎ করে, তখন সে মুমিন থাকে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৭৫)

অর্থাৎ দুর্নীতির মুহূর্তে মানুষের অন্তর থেকে ইমানের সতর্ক পাহারা উঠে যায়।

দুর্নীতির সবচেয়ে বড় আত্মিক পরিণতি হলো হারাম উপার্জন। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত খাদ্য বা সম্পদে কোনো বরকত থাকে না, বরং তা ইবাদত কবুলের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

মহানবী (সা.) এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যিনি দীর্ঘ সফর করে ধূলিধূসরিত অবস্থায় দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে আকুল আবেদন জানান, কিন্তু তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং তার লালন-পালনও হয়েছে হারামে; সুতরাং তার দোয়া কীভাবে কবুল হতে পারে? (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)

অবৈধ ও অসৎ উপায়ে অর্জিত অর্থ মানুষের শরীর ও আত্মাকে এমনভাবে বিষাক্ত করে যে তার ইবাদতের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায় এবং দোয়ার ইতিবাচক প্রভাব বিলুপ্ত ঘটে। (আল-হাম্বলি, জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম, ১/২৭৫, দারুল হাদিস, কায়রো, ২০০১)

দুর্নীতি হলো আমানতের মারাত্মক খেয়ানত। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক বা ব্যক্তিগত যেকোনো দায়িত্ব একটি পবিত্র আমানত। দায়িত্বে অবহেলা করা বা পদের অপব্যবহার করে অসৎ সুবিধা নেওয়া অপরাধ।

কোরআনে এর কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে, ‘হে ইমানদারগণ, তোমরা জেনে-বুঝে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সঙ্গে খিয়ানত করো না এবং নিজেদের আমানতেও খিয়ানত করো না।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ২৭)

যে ব্যক্তি জেনে-শুনে খেয়ানত করে, তার অন্তর থেকে আমানতদারির মতো মৌলিক ইমানি গুণ বিদায় নেয়।

দুর্নীতি শুধু ব্যক্তিগত পাপ নয়, এটি এক ধরনের সামাজিক জুলুম বা অত্যাচার। এর ফলে সাধারণ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়। পরকালের ভয় এবং আল্লাহর দরবারে জবাবদিহির অনুভূতি লোপ না পেলে কেউ অন্যের অধিকার হরণ করতে পারে না।

ইমাম আল-মাওয়ার্দি লিখেছেন, যখন কোনো সমাজে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থনৈতিক অসাধুতা স্বাভাবিক রূপ নেয়, তখন মানুষের মধ্য থেকে পরকালীন জবাবদিহির ভয় উঠে যায়, যা সমাজের নৈতিক পতন ঘটায় এবং মানুষের ধার্মিকতার ভিত্তি ধসিয়ে দেয়। (আল-মাওয়ার্দি, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, ১/৮২, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৮৫)

দুর্নীতি ও প্রকৃত ইমান কখনো এক পাত্রে পাশাপাশি থাকতে পারে না। সত্যিকারের ইমান মানুষকে অন্যায় ও পাপাচার থেকে বিরত রাখার শক্তিশালী বর্ম হিসেবে কাজ করে।

সমাজ ও জীবনকে দুর্নীতির অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে হলে শুধু আইনই যথেষ্ট নয়; বরং প্রতিটি মানুষের অন্তরে আল্লাহর সান্নিধ্য ও পরকালের জবাবদিহির বোধ জাগিয়ে তোলা অপরিহার্য।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ

দুর্নীতি যেভাবে ইমান ক্ষয় করে | শাহজাদপুর সংবাদ