শাহজাদপুর সংবাদ

প্রাণ না কাড়লেও তীব্র যন্ত্রণা দেয়, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এ কোন অস্ত্র

২৯ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৯:২৪ AM

প্রাণ না কাড়লেও তীব্র যন্ত্রণা দেয়, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এ কোন অস্ত্র

‘কেবল তাকিয়ে দেখি মার্চপাস্ট, কুচকাওয়াজ, লেফট–রাইট

এই রক্তাক্ত মাটিতে আর ফুল কই, শুধু অস্ত্রের উল্লাস’

বন্ধুর এই পৃথিবীতে কোমল ফুলের জন্য এমন হাহাকার কবি মহাদেব সাহার। ‘ফুল কই, শুধু অস্ত্রের উল্লাস’ কবিতায় তিনি অস্ত্রের ঝনঝনানির কথা, অস্ত্রের মুখে পৃথিবীর রক্তাক্ত হয়ে ওঠার কথা লিখেছেন। সেই সঙ্গে তাঁর কলমে উঠে এসেছে বেঁচে থাকার আকুতি, অস্ত্রের কঠোরতার বিরুদ্ধে ফুলের মতো কোমল এক পৃথিবীর প্রত্যাশার কথাও।

কবির এমন আকুতি, এমন প্রত্যাশা কি আর সব সময় বাস্তব হয়। কেননা, অস্ত্র মানেই তো ধ্বংস, যুদ্ধ, রক্তপাত ও প্রাণ কেড়ে নেওয়া। সেখানে কোমলতার জায়গা কোথায়? প্রাণভিক্ষার জায়গাই–বা কোথায়?

ভিন্নতাও আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভান্ডারে এমন অস্ত্র আছে, যেটা প্রাণ কেড়ে নেয় না; বরং তীব্র যন্ত্রণা দিয়ে নিজের কাজ হাসিল করে। তবে এই অস্ত্র ব্যবহারের উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে মহৎ নয়।

এই অস্ত্রের নাম অ্যাকটিভ ডিনায়াল সিস্টেম বা এডিএস। অনেকে একে ‘হিট রে’ বা ‘উত্তপ্ত রশ্মির’ অস্ত্র বলে থাকেন। এই অস্ত্র গুলি ছোড়ে না, কোনো বিস্ফোরণ ঘটায় না, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায় না। প্রাণ যায় না কারও। তবে এডিএস মানুষের শরীরে তীব্র জ্বালাপোড়া তৈরি করতে পারে। এতে সীমাহীন যন্ত্রণা ভোগ করে ভুক্তভোগী।

অর্থাৎ বিশেষ এ অস্ত্রটির মূল উদ্দেশ্য কাউকে আহত বা হত্যা করা নয়। তীব্র যন্ত্রণা দিয়ে নির্দিষ্ট কোনো এলাকা থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সরে যেতে বাধ্য করা।

সময়টা গত শতকের আশি দশকের শেষ ভাগ। তখনই এডিএস নিয়ে গবেষণা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী। চলে দীর্ঘ গবেষণা। এর প্রযুক্তি উন্নত করা হয়। ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত এটিকে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে পরিচালনা করা হয়।

এডিএস নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এর কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের একটি আদেশ। তিনি ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটিকে (ডিএইচএস) সীমান্তে অস্ত্রটির পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরুর আদেশ দিয়েছেন।

প্রতিরক্ষামন্ত্রীর আদেশে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের সীমান্তে অবৈধ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এডিএস ব্যবহার করতে হবে। এ জন্য পিট হেগসেথ গত সেপ্টেম্বরে একটি স্মারকে সই করেছেন।

নিউজউইকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের নির্যাতনবিষয়ক বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ারের নিষিদ্ধ সরঞ্জামের তালিকায় এডিএসের নাম রয়েছে। কাজেই যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তে অস্ত্রটি ব্যবহার করা হলে সীমান্ত নিরাপত্তা ও মানবাধিকার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হতে পারে। জাতিসংঘ বলেছে, কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে এডিএস ব্যবহার নিষিদ্ধ।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে সীমান্ত ইস্যুকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র–মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের স্রোত পুরোপুরি বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর। সে জন্যই এডিএসকে কাজে লাগানোর কথা ভাবছেন তিনি।

নিউজউইককে দেওয়া এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রটেকশন (সিবিপি) বিভাগের মুখপাত্র বলেন, নিয়মিত নতুন প্রযুক্তি যাচাই করে থাকে সিবিপি। বিশেষত যেসব প্রযুক্তি জীবন রক্ষার পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা বাড়াতে পারে, সেগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এডিএস এমন একটি অস্ত্র, যেটা সামরিক যানের ওপর বসানো যায়। অর্থাৎ এটা সহজে বহন ও স্থানান্তরযোগ্য। এডিএস তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ তৈরি করে। তা–ও প্রায় ৯৫ গিগাহার্টজ কম্পাঙ্কের। পরে সেটা চারপাশের নির্দিষ্ট একটি এলাকায় ছড়িয়ে দেয়।

এই তরঙ্গ খালি চোখে দেখা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, তরঙ্গটি প্রায় এক হাজার মিটার দূর অবধি সক্রিয় এডিএস ছড়িয়ে দিতে পারে।

তরঙ্গটি মানুষের শরীরের ত্বকের উপরিভাগে শোষিত হয়। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, মানুষের ত্বকের উপরিভাগের দশমিক ৩ থেকে দশমিক ৪ মিলিমিটার গভীরে তরঙ্গটি পৌঁছে যেতে পারে। ফলে দ্রুত ওই অংশের তাপমাত্রা অনেকটা বেড়ে যায়।

ত্বকের গভীরে পৌঁছার পর তরঙ্গটি ব্যথা অনুভব করার জন্য দায়ী স্নায়ুকে সক্রিয় করে দেয়। ফলে তীব্র জ্বালাপোড়া ও যন্ত্রণা হয়। স্বাভাবিকভাবে ওই সময় মানুষ অস্থির হয়ে ওঠে। দ্রুত সেখান থেকে অন্যত্র সরে যাওয়ার চেষ্টা করে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর সার্জেন্ট জেসন দেলাক্রুজ বলেন, সক্রিয় এডিএসের তরঙ্গ মানুষের ত্বকে ‘অসহনীয় উত্তাপের’ অনুভূতি তৈরি করে। এডিএস পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত সার্জেন্ট জেসন। ২০০৭ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ওভেনের দরজা খোলার পরপর গরম বাতাসের যে হল্কা লাগে, এডিএসের তরঙ্গের যন্ত্রণা তার চেয়ে তীব্র।’

সার্জেন্ট জেসন আরও বলেন, ‘মানুষের শরীরে এডিএসের তরঙ্গের প্রভাব খুব দ্রুত দেখা দেয়। তখন স্বভাবজাত প্রবৃত্তি ওই ব্যক্তিকে তাড়াতাড়ি জায়গাটি থেকে সরে যেতে প্রলুব্ধ করে।’

এডিএসের তরঙ্গ ছড়িয়ে দেওয়া বন্ধ করলে কিংবা ভুক্তভোগী জায়গাটি থেকে নিরাপদে সরে গেলে, তখন আর যন্ত্রণাবোধ হয় না। যদিও ১০ থেকে ১৫ মিনিট ধরে ত্বকে হালকা ব্যথা বা ঝিনঝিন বোধ অনুভূত হতে পারে।

পেন্টাগন ২০১২ সালে এডিএস প্রদর্শন করেছিল। ওই সময় অস্ত্রটির যে বিবরণ দেওয়া হয়েছিল, তাতে এসব কথা উল্লেখ ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর দাবি, এডিএস প্রাণঘাতী নয়। মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করার জন্যও এটি তৈরি করা হয়নি।

যদিও জাতিসংঘের মানবাধিকার–বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এডিএস নিয়ে নিজেদের উদ্বেগ জানিয়েছে। বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে এ অস্ত্র ব্যবহারের ফলে মানুষের শরীরে মাঝারি মাত্রার পোড়ার ক্ষত (সেকেন্ড ডিগ্রি বার্ন) দেখা দেয়।

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৭ সালে প্রশিক্ষণ চলার সময় এডিএস ব্যবহারে মার্কিন বিমানবাহিনীর এক সদস্য দগ্ধ হন। যদিও তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। ১৯৯৯ সালে পরীক্ষাগারে দুর্ঘটনাবশত এডিএসের সংস্পর্শে আসায় আরেকজনের ত্বকে ফোসকা পড়ে গিয়েছিল।

২০২৩ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের নির্যাতনবিষয়ক বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার বলেন, এডিএসের মতো বিশেষ শক্তির অস্ত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে ব্যবহার করা উচিত নয়। এমন অস্ত্রের ব্যবহার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এডিএসের তরঙ্গের কোনো শব্দ নেই। খালি চোখে দেখা যায় না। এ ধরনের নির্দেশিত শক্তির রশ্মির সংস্পর্শে দীর্ঘ সময় থাকলে গুরুতর শারীরিক ক্ষতি হতে পারে। এমনকি যন্ত্রণা শুরু হলে আতঙ্কে ছোটাছুটি করতে গিয়ে পদদলিত হয়ে হতাহত হওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে।

এ অস্ত্রের তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এ অস্ত্র জাতিসংঘের নির্যাতনবিষয়ক বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ারের নিষিদ্ধের তালিকায় থাকবে।

এডিএসের তরঙ্গ ক্যানসার সৃষ্টি করে না এবং প্রজননসংক্রান্ত সমস্যাও তৈরি করে না বলে ২০০৮ সালে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ওপর ২০১৮ সালেও একবার এডিএস ব্যবহারের অনুমতি চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি–বিষয়ক মন্ত্রী ক্রিস্টজেন নিয়েলসেন অনুমতি দেননি।

বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সই করা স্মারকটি নিয়ে প্রথম খবর প্রকাশ করেছে সিএনএন। সংবাদমাধ্যমটি জানায়, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে সাত মাসের জন্য এডিএসের পরীক্ষামূলক ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এ সময়ের মধ্যে এডিএস ব্যবস্থাটি কীভাবে ব্যবহার করা হবে, এর কৌশল, পদ্ধতি আর কার্যপ্রণালি কী হবে, সেসব বিষয়ে এককভাবে দায়িত্ব পালন করবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (ডিএইচএস)।

ওই স্মারকে আরও বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের (এখন যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় নামে পরিচিত) কেউ এডিএস ব্যবহার করতে পারবে না। এ থেকে বোঝা যায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন শুধু অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে এডিএস ব্যবহার করতে চায়, সরাসরি কোনো যুদ্ধে নয়।

সাত মাসের পরীক্ষামূলক ব্যবহার শেষ হলেও প্রয়োজনে সীমান্ত এলাকায় অভিযানের সময় এডিএস ব্যবহারের অনুরোধ জানাতে পারবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার বরাতে সিএনএন এ কথা জানিয়েছে।

এডিএস নৈতিক ও আইনি নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ, এই অস্ত্রের নকশা করা হয়েছে মানুষের শরীরে তীব্র যন্ত্রণা দেওয়ার জন্য। এই মত প্রতিরক্ষাপ্রযুক্তি–বিষয়ক নিউজলেটার ‘লেজার ওয়ারস’–এর লেখক জ্যারেড কিলারের।

অ্যাক্সিওসকে জ্যারেড কিলার বলেন, ‘দক্ষিণের সীমান্তে মোতায়েনের জন্য এ অস্ত্র উপযুক্ত কি না, তা নির্ভর করছে এর প্রভাবকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করছেন, সেটার ওপর। ব্যক্তিগতভাবে আমি এটা করতাম না।’

নতুন নতুন প্রযুক্তি পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সীমান্তকে ‘যুদ্ধক্ষেত্রের পরীক্ষাগারে’ পরিণত করেছে বলেও মন্তব্য করেন জ্যারেড কিলার।

সাধারণত প্রচলিত অস্ত্রের কাজ ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো, শত্রুপক্ষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া। সেই বিবেচনায় এডিএস প্রচলিত কোনো অস্ত্র নয়। কারণ, এটি মানুষ হত্যা করে না, কিন্তু মানুষকে তীব্র যন্ত্রণা দেয়। তবে প্রশ্ন রয়ে যায়, তীব্র যন্ত্রণা দেওয়ার এ অস্ত্রটি আদতে কতটা গ্রহণযোগ্য?

তথ্যসূত্র: সিএনএন, দ্য গার্ডিয়ান, অ্যাক্সিওস ও নিউজউইক।

অনিন্দ্য সাইমুম: প্রথম আলোর সহসম্পাদক

ইমেইল: emon@prothomalo.com

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ

প্রাণ না কাড়লেও তীব্র যন্ত্রণা দেয়, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এ কোন অস্ত্র | শাহজাদপুর সংবাদ