শাহজাদপুর সংবাদ

নেপাল–তিব্বতের প্রাণঘাতী বন্যার পেছনে জলবায়ু সংকট, ধারণা গবেষকদের

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১১:১৩ AM

নেপাল–তিব্বতের প্রাণঘাতী বন্যার পেছনে জলবায়ু সংকট, ধারণা গবেষকদের

জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে সম্ভবত হিমবাহটি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। পরে সেটি ধসে গত মাসে নেপাল ও তিব্বতে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। এতে শত শত মানুষ প্রাণ হারান। এ দুর্যোগ নিয়ে প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

গবেষকেরা হিমবাহধসের আগে ওই অঞ্চলে অস্বাভাবিক উষ্ণ আবহাওয়া শনাক্ত করেছেন। হিমবাহটি ধসে পড়ার পর প্রায় ১১ কোটি ঘনমিটার তুষার ও বরফ নিচের উপত্যকায় নেমে আসে। এতে প্রায় নজিরবিহীন আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। কোনো সতর্কতা ছাড়াই ভাটির জনপদগুলোয় আঘাত হানে সেই বন্যা।

লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের জলবায়ুবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফ্রিডেরিকে অটো বলেন, ‘হাজার হাজার মাইল দূরে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে হওয়া নিঃসরণ যে সংকট তৈরি করেছে, নেপালের মানুষ জীবন দিয়ে তার মূল্য দিচ্ছেন।’ ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন এ গবেষণা করেছে।

অটো বলেন, ‘উষ্ণায়ন যখন পৃথিবীর ছাদকে অস্থিতিশীল করে তোলে, তখন স্থানীয় পর্যায়ে যত অভিযোজনই করা হোক, ভাটির ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে এত বড় ধ্বংসযজ্ঞ থেকে পুরোপুরি রক্ষা করা সম্ভব নয়। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নিঃসরণ শূন্যে নামাতে আরও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আগামী বছরগুলোয় এমন আরও দুর্যোগ অনিবার্যভাবে দেখতে হবে।’

গত ২৬ আগস্ট লাংটাং লিরুং পর্বত থেকে ঝুলন্ত হিমবাহ ও শিলার একটি বিশাল অংশ ধসে পড়ে। এর আয়তন ছিল প্রায় দুই লাখ বর্গমিটার। এ দুর্যোগে ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। এখনো পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ।

হিমবাহ ও শিলার ওই অংশ প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিটার নিচে পড়ে। এত তীব্র শক্তিতে সেটি উপত্যকার মাটিতে আঘাত করে যে কম্পনটি ভূমিকম্প হিসেবেও ধরা পড়ে। এতে বরফ গলে যায় এবং হিমশীতল বন্যার সৃষ্টি হয়। সেই বন্যা ঘণ্টায় ১৭৭ কিলোমিটারের বেশি গতিতে নদীপথে নেমে আসে।

পানি, বরফ, শিলা ও পলির ভয়াবহ স্রোত পরিবার, ঘরবাড়ি, জনপদ, সড়ক, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বেঁচে যাওয়া অনেক মানুষ আটকা পড়েন এবং অন্য এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান।

গবেষণায় বলা হয়েছে, ‘এত বড় শিলাধসের ঘটনা বিরল। আনুমানিক হিসাবে এক হাজার থেকে দশ হাজার বছরে এ আকারের একটি ঘটনা ঘটতে পারে। এ ঘটনা দেখিয়েছে, অভিযোজনের সীমাও ইতিমধ্যে স্পর্শ করা হচ্ছে।’

অটো ও তাঁর দল এর আগে ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন বা ডব্লিউডব্লিউএর অধীন যেসব গবেষণা করেছেন, এটি সেগুলোর চেয়ে আলাদা। ডব্লিউডব্লিউএ হলো ইম্পেরিয়াল কলেজ ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জলবায়ুবিশেষজ্ঞদের একটি যৌথ উদ্যোগ।

আগের গবেষণাগুলোয় সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট আবহাওয়াজনিত ঘটনার সঙ্গে জলবায়ু বিপর্যয়ের সম্পর্ক নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তেমনটি করা যায়নি।

গবেষকেরা দেখেছেন, কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করে এই দুর্যোগ ঘটিয়েছে। কয়েক দশক ধরে গ্রিনহাউস গ্যাসদূষণের কারণে বায়ুমণ্ডল উষ্ণ হওয়ায় এসব কারণের প্রভাব আরও বেড়েছে।

ইম্পেরিয়াল কলেজে চরম আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করেন বেন ক্লার্ক। তিনি বলেন, ভয়াবহ ধসের আগে হিমবাহটির আশপাশে দীর্ঘ মেয়াদে যেসব পরিবর্তন ঘটেছিল, সেখানে ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ছাপ’ স্পষ্ট।

গবেষণায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে।

যে অঞ্চলে ধসটি ঘটেছে, সেখানে শিল্পবিপ্লবের আগের সময়ের তুলনায় জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে তাপমাত্রা প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। শুধু জুলাই ও আগস্টে তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস।

স্থানীয়ভাবে ২০২৬ সালের জুলাই ও আগস্ট ছিল রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ দুই মাস। হিমবাহধসের আগের দিনগুলোয় তাপমাত্রা ৩০ বছরের গড়ের চেয়ে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।

১৯৮০-এর দশক থেকে হিমালয়ে হিমাঙ্কের উচ্চতা প্রতি দশকে প্রায় ১০০ মিটার করে ওপরে উঠেছে। অর্থাৎ বরফ গলার মতো তাপমাত্রা এখন আরও উঁচু এলাকায় এবং বেশি সময় ধরে থাকছে। এতে স্থায়ীভাবে জমাট মাটি বা পারমাফ্রস্টে গঠিত পাহাড়ি ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ছে।

উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে এরই মধ্যে হিমবাহটি উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে গেছে। ধসের স্থানটির চারপাশে স্থিতিশীলতা ধরে রাখা বরফ সরে গেছে। পাশাপাশি বরফগলা পানিও জমেছে।

২০১৫ সালের ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্প পাহাড়ি ঢাল দুর্বল হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল। তবে আগস্টের দুর্যোগে ওই ভূমিকম্পের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা নিশ্চিত করা যায়নি।

অটো, ক্লার্ক ও ডব্লিউডব্লিউএর গবেষক দল সরাসরি বলেনি যে জলবায়ু বিপর্যয়ই এ দুর্যোগের মূল কারণ। তাঁদের মতে, বিদ্যমান ভূতাত্ত্বিক কাঠামোকে অস্থিতিশীল করে তোলার একটি কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকে দেখাই বেশি যুক্তিসংগত।

ক্লার্ক বলেন, ‘আমরা দেখেছি, জলবায়ু পরিবর্তন উঁচু পাহাড়ি পরিবেশকে বদলে দিচ্ছে। এই ধসের সম্ভাব্য অনেক কারণের ওপরই এর প্রভাব পড়ছে।’

বন্যায় হওয়া ধ্বংস মোকাবিলায় আর্থিক সহায়তা চেয়ে জাতিসংঘের ক্ষয়ক্ষতি তহবিলে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে নেপাল। এই তহবিল থেকে সহায়তা পেতে দুর্যোগটির সঙ্গে জলবায়ু সংকটের সম্পর্কের প্রমাণ দিতে হয়।

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল চীন ও ভারতের মতো বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোকে ‘জেগে ওঠার’ এবং এই দুর্যোগের যৌথ দায় স্বীকার করার আহ্বান জানিয়েছেন।

ডব্লিউডব্লিউএর অংশ রেডক্রস রেড ক্রিসেন্ট ক্লাইমেট সেন্টারের জ্যেষ্ঠ কারিগরি উপদেষ্টা মাধব উপ্রেতি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ও সম্মুখসারির জনগোষ্ঠীর ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার পথ তৈরি হতে পারে শুধু বিশ্বজুড়ে নিঃসরণ ব্যাপকভাবে কমানোর মাধ্যমে।

মাধব উপ্রেতি আরও বলেন, ‘কল্পনাতীত মানবিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি এ দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতেও বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। যে দেশটি এ সমস্যা তৈরিতে কার্যত কোনো ভূমিকা রাখেনি, তার এ পরিস্থিতি একটি বিষয় আরও স্পষ্ট করে, জলবায়ুঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে তাদের সৃষ্টি না করা সংকট মোকাবিলায় সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে।’

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ