শাহজাদপুর সংবাদ

নায়িকাদের একধরনের নখরামি থাকে, প্রাউডনেস থাকে, এটা আমি এখনো শিখিনি

১৭ আগস্ট, ২০২৬ এ ৮:০০ AM

নায়িকাদের একধরনের নখরামি থাকে, প্রাউডনেস থাকে, এটা আমি এখনো শিখিনি

ষাটের দশকে তাঁর অভিনয়ের শুরু। টানা কাজ করেছেন নব্বইয়ের দশকের শেষ পর্যন্ত। কয়েক দশকজুড়ে একচেটিয়া দর্শকদের মনের নায়িকা হয়ে রাজত্ব করেছেন শবনম। একচ্ছত্র এমন ধারাবাহিক সফলতা চলচ্চিত্রজগতে বিরল। অথচ ছোটবেলায় তিনি কখনো নায়িকা হতে চাননি। ছিলেন টমবয়। ক্রিকেট, ঘুড়ি ওড়ানো, মার্বেলসহ সব ধরনের খেলাধুলা ছিল তাঁর প্রিয়। স্কুলজীবন শেষ হতে না হতেই তিনি হয়ে উঠলেন পুরোদস্তুর নায়িকা। শুধু বাংলাদেশ নয়, পাকিস্তানের সবচেয়ে প্রভাবশালী নায়িকার তালিকায় উঠে আসে তাঁর নাম। ১৯৬১ সালে ‘হারানো দিন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পান শবনম। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৫। পরের বছর উর্দু চলচ্চিত্র ‘চান্দা’তে অভিনয় করে তৎকালীন সমগ্র পাকিস্তানে তারকাখ্যাতি পান। দুটি ছবি মুক্তি পায় ঢাকা থেকে, এরপর সমগ্র পাকিস্তানে মুক্তি পায় ‘তালাশ’, হয় ব্যবসাসফল। ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে পাকিস্তানের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিতি পান শবনম। দুই দেশ মিলিয়ে ১৮০টির বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন। বাবা-মায়ের ঝর্ণা বসাক একদিন দুই দেশের মানুষের কাছে হয়ে উঠলেন শবনম। আজও তিনি শবনম হয়েই আছেন। বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য ২০২৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাঁকে আজীবন সম্মাননা প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আজ তাঁর ৮০ বছর পূর্ণ হবে। জন্মদিন ও আজীবন সম্মাননাসহ জীবনের নানা দিক নিয়ে সম্প্রতি বরেণ্য অভিনয়শিল্পী শবনম তাঁর ঢাকার বারিধারার ডিপ্লোম্যাট এলাকার বাসায় দীর্ঘ আলাপচারিতায় মেতে ওঠেন প্রথম আলোর সঙ্গে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের জীবন নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। জানিয়েছেন, বাংলাদেশ স্বাধীনের পর কেন ফিরে আসেননি সে প্রসঙ্গেও। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মনজুর কাদের। সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব

আজ ১৭ আগস্ট ৮০ বছর পূর্ণ করছেন। জীবন নিয়ে কোনো অনুশোচনা বা অনুতাপ?

শবনম : ছেলেকে সময় দিতে পারিনি। এটা আমার জীবনের সবচাইতে বড় মিসিং। যখন ওর জীবনে আমরা বেশি দরকার ছিলাম, তখন আমরা ওকে সময়টা দিতে পারিনি। সঙ্গে থাকতে পারিনি। বুঝতেও পারিনি। এখন সেটা বুঝতে পারি। পেছনে তাকালে মনে হয়—অভিনয়, সংসার, ছেলেকে বড় করা, সবকিছুই যেন চোখের পলকে হয়ে গেল। কিছু অপূর্ণতা নিশ্চয়ই আছে, তবে আক্ষেপ খুব বেশি নেই। যা পেয়েছি, যতটুকু ভালোবাসা পেয়েছি, সেটিই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এখন শুধু চাই বাকি সময়টুকু ছেলের সঙ্গে হাসি-আনন্দে কাটাতে।

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০২৩–এ ঘোষিত পুরস্কারে আপনাকে আজীবন সম্মাননার জন্য মনোনীত করা হয়েছে।

শবনম: রাষ্ট্র আমাকে এ ধরনের একটি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছে, এটা তো ভীষণ বড় ব্যাপার। খুব খুশি লাগছে। ছোটবেলায় যখন স্কুলে ছোট ছোট পুরস্কার পেতাম, সেটাতে কত খুশি হতাম। আর এই বয়সে এসে এত বড় একটা পুরস্কার পাচ্ছি, তাও রাষ্ট্র দিচ্ছে—খুশিরই তো কথা। আমি আমার বাংলাদেশ ও এখানকার মানুষের প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। দেশে-বিদেশে এত বছর পরও মানুষ আমাকে মনে রেখেছে, ভালোবাসে—এটাই একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় অর্জন। সেই অভিনয়জীবনের শুরুতে ‘হারানো দিন’ সিনেমায় ‘রূপনগরের রাজকন্যা’ গানে অভিনয় করেছিলাম। আজও অনেকেই দেখা হলে সেই গানের কথা মনে করিয়ে দেন, কেউ কেউ গেয়েও শোনান। বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন জায়গায় এমন অভিজ্ঞতা প্রায়ই হয়। তখন মনে হয়, একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবে আমার কাজ মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পেরেছে। এই ভালোবাসা ও স্বীকৃতিই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা সেই আনন্দ ও কৃতজ্ঞতাকে আরও বাড়িয়েছে।

এবার আপনার জীবনের একদম শুরুর দিকে তাকাতে চাই। শৈশব তো কেটেছে পুরান ঢাকার নবাবপুরে, কেমন ছিল আপনার শৈশবের সেই দিনগুলো?

শবনম: শৈশবের দিন অবশ্যই মজার ছিল। আমি কিন্তু আমার কাজিনদের সঙ্গে মার্বেল খেলা, ঘুড়ি ওড়ানো, ক্রিকেটসহ সব খেলা খেলতাম। ছোটবেলায় আমি ছিলাম টমবয় টাইপের। ফুটবল ছাড়া সবই খেলাই খেলতাম। কাজিনরাও আমার জন্য অপেক্ষা করত, ডাকত—‘এই ঝর্ণা, আয় আয়।’ আমাকে নিয়ে ওরা সবাই খুব মজা করত। মার্বেল রাখার জন্য আর আমার সব ফ্রকের মধ্যে পকেট থাকত (হাসি)।

আপনার পরিবার সম্পর্কে কিছু বলুন।

শবনম: আমার জন্ম ১৯৪৬ সালে, ঢাকার নবাবপুরের মদনমোহন বসাক লেনে (বর্তমান টিপু সুলতান রোড)। আমার মা উষা বসাক ছিলেন গৃহিণী। বাবা ননী বসাক গ্র্যাজুয়েট স্কুলের টিচার ছিলেন, ফুটবল রেফারিও ছিলেন। আমার দাদা–দাদি দুজনের কাউকে দেখিনি। নানা–নানিকে দেখেছি—কারও নামই মনে করতে পারছি না।

আপনার কয় ভাইবোন ছিলেন?

শবনম: আমরা ছিলাম দুই বোন, কোনো ভাই ছিল না। বড় বোনের নাম সন্ধ্যা বসাক। আমার আসল নাম ঝর্ণা বসাক।

বড় বোন কী করেন, কোথায় থাকেন, তাঁর পরিবারে কে কে আছেন?

শবনম : আমার বড় বোন সন্ধ্যা বসাক কলকাতায় থাকেন। অল্প বয়সেই তাঁর বিয়ে হয়ে যায়। তাঁর এক ছেলে, এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়েছে। গত এক বছরের মধ্যে বোনের ছেলে ও তাঁর স্বামী দুজনেই মারা গেছেন।

শৈশবে আপনি কেমন ছিলেন—চঞ্চল, নাকি শান্ত স্বভাবের?

শবনম: বলব না আমি খুব শান্ত ছিলাম। ছোটবেলায় আমি খুবই দুষ্টু ছিলাম। তবে আমার বড় বোন খুব শান্ত ছিলেন। আমার জন্য সব সময় তাঁর খুব মায়া ছিল। এমনও হয়েছে, ছোটবেলায় স্কুলের পরীক্ষায় আমি ফেল করেছি, দিদি খুব ভালো পাস করেছেন। দেখা গেছে, আমার ফেল করার কারণে তিনি কান্নাকাটি করছেন! তাঁর কান্নাকাটি দেখে আমি বলতাম, আরে দিদি, তুই কেন কাঁদছিস? দিদি বলতেন, ‘তুই যে ফেল করেছিস।’ আরে চুপ কর। ঘরে ঢোকার পর দিদির অবস্থা দেখেই মা বুঝে যেতেন, নিশ্চয় ঝর্ণা ফেল করেছে।

একেবারে শৈশবে অভিনয়ে এসেছেন, যখন আপনি কিছুই বুঝতেন না। শুরুর গল্পটা একটু জানতে চাই।

শবনম : আমার বড় বোন নাচ শিখতেন, দূর থেকে তাঁর নাচ দেখে দেখে আমিও শিখে ফেলতাম। বড় বোনের নাচ দেখে, আমি আবার রুমে গিয়ে তোলার চেষ্টা করতাম। দূর থেকে বাবা এসব দেখতেন। বলতেন, বড় মেয়ের চেয়ে তো আমার ছোট মেয়েরই আগ্রহ অনেক বেশি। ওকে কেন আমি ভালোভাবে নাচ শেখাই না? তারপর আমাকে বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে ভর্তি করিয়ে দিলেন, সদরঘাট শাখায়। বাবা ওখানে সপ্তাহে এক দিন নিয়ে যেতেন। মন দিয়ে নাচ শিখতাম। এহতেশাম (চলচ্চিত্র পরিচালক) সাহেব আমার আব্বার বন্ধু ছিলেন, এটা আবার আমি জানতাম না। তিনি একটা ছবি বানান, ‘এ দেশ তোমার আমার’। সেই ছবিতে একটা কোরাস গানে চারজন মেয়ে, চারজন ছেলের দরকার ছিল—দৃশ্য ছিল একটা স্কুলের অনুষ্ঠানের। বুলবুল একাডেমি থেকে যে চারজন মেয়েকে নিলেন, তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। তখন সিনেমা কী, ক্যামেরা কী—এসব কিছুই জানতাম না।

তখন আপনি কোন ক্লাসে?

শবনম : সম্ভবত আমি তখন ক্লাস সেভেনে।

পুরোপুরি অভিনয়ে কীভাবে এলেন?

শবনম : বাবাকে এহতেশাম চাচা বললেন, ‘তোর মেয়েকে দে, ছবিতে অভিনয় করবে।’ তিনি বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে নাচের সময় যাদের দেখলেন, তাদের মধ্যে ফটোগ্রাফিতে আমিই সুন্দরী ছিলাম। বাবা সেদিন এহতেশাম চাচাকে কোনো উত্তর দিতে পারেননি, শুধু বলেছেন, ‘আচ্ছা দেখি। কিন্তু ও কি পারবে? ঝর্ণা যে কী দুষ্টু। এক জায়গায় তো সে বেশিক্ষণ বসেও থাকে না।’ তখন এহতেশাম চাচা বলেন, ‘তুই দে। বাকিটা আমরা শিখিয়ে নেব।’ এ কথা বাবা বাসায় এসে মায়ের কাছে বললেন। শুনেই মা বললেন, ‘কিছুতেই না। মাথা খারাপ তোমার? ও যাবে ফিল্মে, যেখানে পাঁচ মিনিট বসে থাকে না এক জায়গায়। ওর মাথার মধ্যে রয়েছে যত দুষ্টুমি, ও আবার ছবিতে কাজ করবে! বদনাম ছাড়া কিছুই হবে না।’ বাবা রোজই মাকে বলতেন, আর মা না করে দিতেন। এদিকে ক্যাপ্টেন চাচা (এহতেশামকে ক্যাপ্টেন চাচা বলতেন শবনম) বাবার পেছনে নাছোড়বান্দার মতো লেগেই ছিলেন। ‘কিরে, তোর মেয়েকে দিবি না?’ তখন আসলে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ছিলেনই তো অল্প কজন। সুলতানা জামান ছিলেন। সুমিতা দেবী ছিলেন। চিত্রা সিনহা ছিলেন। রওশন আরা ছিলেন। কিছুতেই মা দেবেন না। ক্যাপ্টেন চাচা একদিন বাবাকে বললেন, ‘দিবি না কেন তোর মেয়েকে? ও যদি কাজটা পারে করবে, নইলে তোর মেয়ে তোর ঘরে চলে আসবে।’ এদিকে আমার বাবার পরিবারের লোকজন জমিদার, মায়ের সাইডের ওরাও জমিদার। ওরা তো আরও দেবে না। মামারা এ খবর শুনে ভীষণ রাগ। মাকে বললেন, ‘মাথা খারাপ নাকি, মেয়েকে ফিল্মে দেবে।’ কিন্তু মাকে বোঝালেন বাবা। বললেন, ‘এহতেশাম আমাকে এত জোর করছে। ঝর্ণার মধ্যে তো শিল্পীসত্তা আছে। ওকে দাও। করুক না একটা ছবি। না পারলে চলে আসবে।’ তখন মা আর না বলতে পারলেন না। ‘ঠিক আছে, যাক, করুক।’ সেই যে গেলাম, করলাম…করতে থাকলাম—আর ফেরা হলো না। পেছন ফিরে তাকাতেও হয়নি।

জীবনের প্রথম দিককার সিনেমার শুটিং সময়ের কথা মনে পড়ে?

শবনম: আমার জীবনের প্রথম সিনেমা ‘এ দেশ তোমার আমার’। প্রথম দিনের শুটিং ছিল এফডিসিতে। তখন একটামাত্র শুটিং ফ্লোর ছিল। এরপরই ‘রাজধানীর বুকে’ ছবিতে কাজ করলাম। এই ছবিতে নায়িকা ছিলেন চিত্রা সিনহা। সেই ছবিতে একটা গান ছিল। বাইজির গান। ওই গানে ঠিকঠাক অভিব্যক্তি দিই। ক্লোজশট ছিল। ওই গানের পর মুস্তাফিজ চাচা সিদ্ধান্ত নিলেন, আমাকে পরের ছবির নায়িকা বানাবেন। ওই একটা গানই আমাকে নায়িকা বানিয়ে দেয়। এর বাইরে একটি ছবিতে খান আতার ছোট বোনের চরিত্রেও অভিনয় করেছি। ফজলুল হকের ‘আজান’ (‘উত্তরণ’ নামে মুক্তি পায়) ছবিতে অভিনয় করেছি। নায়িকা হিসেবে প্রথম মুস্তাফিজের ‘হারানো দিন’। তবে নায়িকা হওয়ার আগে ছোট ছোট চরিত্রের পাঁচ–ছয়টা ছবিতে অভিনয় করেছি।

আপনি নায়িকা হওয়ার মতোই সুন্দরী ছিলেন, এমনটা কি তখন কেউ বলত না?

শবনম: তা সবাই বলত। তবে সব সময় আমি ফিটফাট থাকতে পছন্দ করতাম। নিজের ব্যাপারে বেশ সচেতন ছিলাম। কিন্তু নায়িকা হব, এটা কোনো দিন আমার মনের মধ্যে কাজ করেনি।

নায়িকা হতে গিয়ে নিশ্চয় শিক্ষাজীবনে ছন্দপতন হয়েছে?

শবনম: আমার মামারা খুব শিক্ষিত ছিলেন। তাই পরিবার থেকে পড়াশোনার ব্যাপারে সবাই বেশ সিরিয়াস ছিলেন। আমিও ছিলাম, তবে বড় বোনের মতো কখনো না। আমি ম্যাট্রিক পর্যন্ত পড়েছিলাম, বাংলাবাজার স্কুল থেকে পরীক্ষা দিই। এরপর কলেজে উঠি, কলেজে ওঠার পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারিনি।

কেন?

শবনম: কলেজে ওঠার পর আমি তখন পুরোদস্তুর হিরোইন। ‘হারানো দিন’ মুক্তি পেয়েছে। ‘চান্দা’, ‘তালাশ’—সবই মুক্তি পেয়েছে। তখন ক্লাসে গেলে শুটিংয়ের আলাপই হতো বেশি। সহপাঠীরা খুব আগ্রহ নিয়ে বসে থাকত শুটিংয়ের গল্প শুনতে। এই যেমন—কী রে, কালকে কী করলি? অমুক নায়ক কেমন, তমুক আর্টিস্ট কেমন—এসব আলাপ। আমার আবার এসবে খুব বিরক্ত লাগত। যেদিনই কলেজে যেতাম সবাই জানতে চাইত, এই কালকে কার সঙ্গে শুটিং ছিল? কী ডায়ালগ দিয়েছিস? তখন বাবাকে বললাম, আমি দুটো একসঙ্গে চালাতে পারব না, হয় পড়ালেখা করাও, নয়তো ফিল্ম করতে দাও। কারণ, দুটোতেই মনোযোগ দরকার। ফিল্মে আমাকে ডায়ালগ মুখস্থ করতে হতো, আরও নানা কাজ। বাবাকে বলার পর, আমার ওপরই ছেড়ে দিলেন। তখন আমার ‘চান্দা’, ‘তালাশ’ হিট। তত দিনে এই লাইনে আমিও একটু একটু আনন্দ পাচ্ছিলাম। সাবজেক্টটাও বেশ ইন্টারেস্টিং লাগছিল। তারপর পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে ফিল্মটাই বেছে নিলাম আরকি।

পড়াশোনা যে ছেড়ে দিলেন, তা নিয়ে পরবর্তী সময়ে মনে কোনো কোনো আফসোস হয়েছে?

শবনম: যত যা–ই হই না কেন, পড়ালেখার মূল্য সব সময় আলাদা। নায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি, সঙ্গে পড়ালেখা থাকলে খুব ভালো হতো। এটা খুবই দরকার। যখন আমি পুরোদস্তুর নায়িকা, পাকিস্তানের সময়টায়—বিভিন্ন জায়গা থেকে সাংবাদিকেরা আসত, তখন আমার একটুখানি মনে হতো, পড়াশোনাটা চালিয়ে নিতে পারলে ভালো হতো। তবে এটাও ঠিক, আমি যা করেছি, সেটাও কম কী। এখন মাঝেমধ্যে যখন শুয়ে–বসে থাকি, তখন চিন্তা আসে—এত এত ছবির কাজ কীভাবে করলাম! উর্দু শেখা, লেখা, পড়া—সেই ভাষার সিনেমায় একের পর এক অভিনয় করা! প্রথম যখন উর্দু ছবির স্ক্রিপ্ট পাই, অনেক কিছু বুঝতে পারতাম না, ওখানে একজন টিচারের মতো ছিলেন, যেখানে আটকে যেতাম, তখন ওই টিচারের কাছ থেকে সহযোগিতা নিতাম। এভাবে নিজেকে তৈরি করেছি।

সিনেমায় আসবেন চিন্তাও করেননি। অথচ সেই মানুষটা আস্তে আস্তে সিনেমায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ফিল্মে প্রথম যখন শুটিং করেন, তখন ফিল্ম সম্পর্কে সেভাবে কিছু জানেনও না। কোন ছবিতে এসে বুঝতে পারলেন যে আপনি অভিনয় করছেন, নায়িকা হয়ে উঠছেন?

শবনম: সত্যিই আশ্চর্য লাগে। ভাবি, চিন্তা করি, কী করে হলো এটা! ‘হারানো দিন’ সিনেমায় শুটিং করতে গিয়ে বুঝতে পেরেছি, আমি নায়িকা হয়ে গেছি। কিন্তু নায়িকাদের একধরনের নখরামি থাকে, প্রাউডনেস থাকে, এটা আমি এখন পর্যন্ত জানি না, শিখিনি। হয়তো এটা আল্লাহ আমাকে গিফট করেছেন। এটা যদি জানতাম, ঝর্ণা কখনোই শবনম হতে পারত না, ঝর্ণাই থেকে যেতে হতো। প্রাউডনেস ছিল না বলে আমি এগিয়ে যেতে পেরেছি। আমার এখনো পরিষ্কার মনে আছে, এই জীবনে কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করিনি। পাকিস্তানে ৩০ বছর কাজ করলাম, একটা লোকও বলতে পারবে না, কারও ক্ষতি করেছে শবনম। আমার কথার কারণে কেউ কষ্ট পেয়েছে, এটাও কেউ বলতে পারবে না।

আপনার সঙ্গে রবিন ঘোষের পরিচয়টা কীভাবে?

শবনম: ‘হারানো দিন’ সিনেমার সংগীত পরিচালনা করেন রবিন ঘোষ। ওই ছবির কাজ করতে গিয়ে রবিনের সঙ্গে পরিচয়। এহতেশাম সাহেবের অফিসে আমাদের দেখা। আমি, দত্তদা (সুভাষ দত্ত) যেতাম মহড়া করতে, কাপ্তান বাজারে এহতেশাম চাচার অফিসে। রবিন সাহেব বিকেলে আসতেন। ঢাকায় চেনাজানা হলেও লাহোরে গিয়ে আমাদের প্রেমের সম্পর্ক হয়। বন্যার তহবিল সংগ্রহে লাহোরে একটি প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ খেলার জন্য সুমিতা দেবী, রোজী সামাদ, আমি, নাসিমা খানসহ সবাই গেলাম। সেবার মা-বাবা কেউ সঙ্গে যাননি। সুমিতা দিদি ছিলেন আমাদের অভিভাবক। খেলা হয়ে গেছে, আমরা ঢাকায় ফিরে আসব। এর মধ্যে সুমিতা দিদি বললেন, একটু শপিং করি। সবাই যার যার মতো করে গেল। আমি হোটেলে একা ছিলাম, সুযোগটা কাজে লাগিয়েছেন রবিন সাহেব। হোটেলে আমাকে একা পেয়ে সেদিনই তিনি প্রেমের প্রস্তাব দেন। এরপর পাঁচ বছরের প্রেম। তারপর ‘তালাশ’ ছবির সময়ে আমরা বিয়ে করে ফেলি।

আপনাদের বিয়ে নিয়ে দুই পরিবারের কোনো আপত্তি ছিল কি?

শবনম: এই একটা বিষয়ে মা হ্যাঁ করেছিলেন। অথচ মা-ই আমাকে ফিল্মে যেতে না করেছিলেন। রবিনের সঙ্গে বিয়ে নিয়ে শুরুতে বাবার অমত ছিল। বিয়ের ব্যাপারে মা বলেছিলেন, ‘আমার মেয়ে যেখানে ভালো থাকবে, ওর যাকে পছন্দ, তার সঙ্গেই বিয়ে হবে।’ রবিন সাহেব খুবই শান্ত স্বভাবের একজন মানুষ। আমাদের বোঝাপড়াটা চমৎকার ছিল—দারুণভাবে আমাকে বুঝতে পারত। আমি যে শবনম হতে পেরেছি, এটা তার গাইডেন্সে হয়েছি। আমার সব কাজে তার সমর্থন ছিল। পাকিস্তানে যাওয়ার পর প্রথম দিককার শুটিংয়ে সে আমার সঙ্গে যেত। যখন বুঝতে পারল, আমি ওখানকার পরিবেশ ধরে ফেলেছি, কীভাবে চলতে হয়, কার সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়, এসব বুঝে গেছি, তখন আমার সঙ্গে আর যেত না।

উর্দু ছবিতে কাজের শুরুটা কীভাবে?

শবনম: ‘চান্দা’, ‘তালাশ’ হিট হওয়ার পর ক্যাপ্টেন চাচা (এহতেশাম) আমাদের বোঝালেন, ‘তোমরা উর্দু ছবিতে কাজ করো। উর্দু ছবি করলে ভালো হয়। আমরা পয়সাটা আরও বেশি পাব, আরও ভালো ছবি বানাতে পারব।’ তখন তো মাত্র দেড়-দুই লাখ টাকা বাজেটে একটা ছবি হতো। ‘চান্দা’, ‘তালাশ’ হিট হওয়ার পর অনেকে উর্দু ছবি বানাতে শুরু করল। সব কটি যদিও হিট হয়নি, বেশির ভাগই ফ্লপ হলো। ফ্লপ হওয়ায় ফোক ধাঁচের ছবির দিকে ঝুঁকল। এরপর ‘রূপবান’ তৈরি হলো। আমরাও এদিকে উর্দু ছবির দিকে আগ্রহী হলাম।

পাকিস্তান যাওয়ার আগপর্যন্ত কতগুলো উর্দু ছবিতে কাজ করলেন? ছবিগুলো কী কী?

শবনম: ছয়–সাতটা হবে। তখন তো বছরে একটা করে ছবিতে কাজ করা হতো। ‘চান্দা’, ‘তালাশ’ তো সুপারহিট এরপর ‘নাজ ঘর’, ‘কাজল’, ‘প্রীত না জানে রিত’সহ কয়েকটি ছবি ছিল।

‘এ দেশ তোমার আমার’ ছবির পর ‘রাজধানীর বুকে’, তারপর ‘হারানো দিন’-এ এসে নায়িকা হলেন। মুক্তি পায় ‘চান্দা’ ও ‘তালাশ’। একটা সময় এসে পাকিস্তানের ছবিতেও কাজ শুরু করলেন। পাকিস্তানের সিনেমার সঙ্গে আপনার যোগাযোগটা হলো কীভাবে?

শবনম: যখন আমি বাংলাদেশে আলোচিত, ওই সময়টায় পাকিস্তান থেকে সাংবাদিকেরা ফোন করতেন। যে নিগার অ্যাওয়ার্ড আমি ১৬ বার পেয়েছি, সেই নিগার পত্রিকার প্রধান মানুষ ইলিয়াস রশিদী কীভাবে যেন রবিন ঘোষের নম্বরটা জোগাড় করেন। তিনি তখন প্রায়ই ফোন করতেন। সিনেমারও একজন চমৎকার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘রবিন, পাকিস্তানে চলে এসো। এখানকার বাজার অনেক বড়। এসে পড়ো তোমরা।’ রবিন তো আর ওদেরকে বলত না, আমরা উর্দু জানি না। পরে আমাকে এসে বলল, ‘যাইবা নাকি?’ আমি বলেছি, কী করতে যাব ওখানে? আমি তো উর্দু জানি না। কথা বলতে পারব না। তখন মানুষজন হাসবে, মনে করবে অশিক্ষিত। এ কথা–ও কথা বলে ১০ বছর পার করে দিই। এই ১০ বছরের মধ্যে আমার কিছুটা উর্দু ভাষার ওপর দখল হলো।

একদিন রবিন আমাকে বলল, ‘চলো যাই পাকিস্তানে, দেখি কী হয়। তোমার ভালো লাগলে লাগল, নইলে আমরা আমাদের দেশে এসে পড়ব। ওখানে যদি ভালো ছবি হয়, তোমার বড় নাম হবে। কারণ, বাজারটাও বড়।’ আমি তখন এত কিছু বুঝতামও না। যাহোক শুরুতে পাকিস্তানের করাচি গেলাম। গিয়ে প্রথমে করাচির জাবীস হোটেলে উঠলাম। সপ্তাহখানেক পর ওয়াহিদ মুরাদ এলেন হোটেলে। কথা হলো। ছবি বানালেন, তিনি প্রযোজক, আমি নায়িকা, তিনি নায়কও। ছবিটা ভালো চললও।

আপনি কি ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব নিয়েই তখনকার পাকিস্তানে গেলেন, নাকি যাওয়ার পর ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব আসে?

শবনম: ওখানে যাওয়ার পর। কারণ, সাংবাদিক ইলিয়াস রশিদীকে বলে রেখেছিলাম, আমরা আসছি। করাচিতে আমরা এক বছর থাকার চিন্তা নিয়েই গিয়েছিলাম। এর মধ্যে যদি কিছু হয় হলো, নইলে চলে আসব। যাওয়ার পর ওয়াহিদ মুরাদ এল, কথাবার্তা বলে একপর্যায়ে শুটিংয়ের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করলেন। ওখানে যাওয়ার ঠিক দেড় মাস পর শুটিং শুরু। আমি পাকিস্তান যাওয়ার পর ওখানকার অন্য নির্মাতা-প্রযোজকেরাও তৈরি ছিল। প্রথম ছবির শুটিংয়ে যাওয়ার আগে আমি বলে দিয়েছি, শুটিংয়ের আগে আমাকে স্ক্রিপ্ট দিতে হবে। আমি মুখস্থ করে শুটিংয়ে যাই। জানানো হলো, শুটিংয়ের সেটে স্ক্রিপ্ট পাবেন। তখন বললাম, সেটে পেলে তো অভিনয় করতে পারব না। কারণ, এটা তো আমার ভাষাও না। পরে বলল, ‘ঠিক আছে, পাঠিয়ে দিচ্ছি, আপনি দেখে নিয়েন।’ দেখলাম স্ক্রিপ্ট, মনে হলো ভাষা খুব একটা মুশকিল না। কারণ, তত দিনে আমি উর্দু ভাষাটা শিখে গেছি। প্রথম ছবির নাম ছিল ‘সামান্দার’—ওয়াহিদ মুরাদের প্রোডাকশন হাউস—তিনিই নায়ক। ছবিটির পরিচালক ছিলেন রফিক রিজভী। পুরো ছবির শুটিং করাচিতে হয়েছিল। এরপর ১৯৭০ সালের দিকে আমি লাহোরে শিফট হলাম।

প্রথম সিনেমা ‘সামান্দার’ মুক্তির আগেই কি আপনি আরও ছবির কাজ হাতে নিয়েছিলেন?

শবনম: নিয়েছিলাম। কারণ, তত দিনে সেখানে কমবেশি সবাই জেনে গেছে, আমি পাকিস্তানের করাচিতে আছি। লাহোর থেকেও বলছিল, ‘আপনি লাহোর চলে আসেন। আমি তখন করাচিতে। ওদিকে লাহোরের সবাই বলছিল, করাচি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি তো কিছুই না, লাহোর অনেক বড় বিষয়। এখানে আসুন।’ পরে ইলিয়াস রশিদী সাহেবই বললেন, ‘ওদের কথাই সত্য। তুমি যেহেতু এখানে চলেই এসেছ, এখন লাহোর যেতে পারো।’ এক বছরের জায়গায় আমি দুই বছর করাচি ছিলাম। ওখানে কয়েকটা উর্দু ছবি করলাম, সুপারহিট। তারপর লাহোর গেলাম।

করাচিতে মোট কতটি ছবিতে অভিনয় করেছেন, নায়ক হিসেবে কারা ছিলেন?

শবনম : করাচিতে পাঁচ–ছয়টি ছবিতে কাজ করেছি। প্রথমটা তো ‘সমান্দার’, এরপর ‘জাহা তুম ওহা হাম’, ‘লাড়লা’, ‘ধামাকা’সহ কী কী যেন ছিল। করাচিতে বেশির ভাগ ছবিতে নায়ক ছিলেন ওয়াহিদ মুরাদ, এর বাইরে ছিলেন পারভেজ মল্লিকও। আস্তে আস্তে করাচির প্রোডাকশনগুলো ভালো হচ্ছিল না। তখনই লাহোর থেকে ডাক আসা শুরু হলো।

পাকিস্তানে প্রথম সিনেমার সম্মানী কত ছিল?

শবনম: সম্মানী কত ছিল তার সঠিক হিসাবটা মনে নেই। তবে এটুকু মনে আছে, ওই সম্মানী দিয়ে আমি ছোটখাটো একটা বাড়ি কিনেছিলাম। দুই বেডরুমের বাড়ি, করাচিতে। কারণ, এক বছর হোটেলে থাকার পর সেখানে থাকতে আর ভালো লাগছিল না। তত দিনে করাচিতে তিন-চারটা ছবি সাইনও করে ফেলেছি। একজন খবর দিল, করাচি সোসাইটি এলাকায় একটা দুই বেডরুমের ড্রয়িং-ডাইনিংসহ বাড়ি বিক্রি হবে। সুন্দর বাড়ি। দেখলাম, ভালো লাগল। একটা সময় শুটিং শেষে হোটেলে যাওয়া–আসা, থাকা নিয়ে খুব অস্বস্তি লাগত। তাই বাড়িটি কিনে ফেললাম। আমাদের দুজনের জন্য ঠিকঠাক। মা–বাবা তো তখন ঢাকায়, ছেলে রনিও সেখানে। বাড়ি কেনার পর ছেলে এবং মা–বাবাকেও নিয়ে গেলাম।

আচ্ছা, ঢাকার ছবিতে আপনার সম্মানী কত ছিল?

শবনম : বলতে লজ্জা নেই। কাজ করেছি, কারও কাছ থেকে তো চেয়ে নিইনি। ‘হারানো দিন’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য তখন ১ হাজার ২০০ টাকা পেয়েছিলাম। ওই টাকা মাকে দিয়েছিলাম। মা তখন বলেছিলেন, ‘যাহ, লাগবে না তোর টাকাপয়সা।’ আমি বলেছিলাম, তুমি এটা দিয়ে শাড়ি কিনে নিয়ো মা। ‘এ দেশ তোমার আমার’ আর ‘রাজধানীর বুকে’ ছবির জন্য কিছুই পাইনি।

লাহোর গেলেন কবে?

শবনম : করাচি থেকে লাহোরে গেলাম সিনেমায় অভিনয়ের জন্য। লাহোরে আমার অভিনীত প্রথম ছবি ‘নাজ’, নায়ক ছিলেন মোহাম্মদ আলী। এরপর অভিনয় করি ‘দোস্তি’ ছবির। দুটি ছবিরই পরিচালক শরিফ নাইয়ার। ‘দোস্তি’ ছবির প্রযোজক ছিলেন সংগীতশিল্পী নুরজাহান, তাঁর স্বামী এজাজ ছিলেন নায়ক। এমনও হয়েছে, চারটা ছবির শুটিং সমানতালে করেছি।

এত এত ছবির কাজ, সমন্বয় কীভাবে করতেন?

শবনম : আমার হাতে যখন অনেক ছবি, তখন আমি আসলে বুঝে উঠতে পারছিলাম না কীভাবে কী করব। তখন মোহাম্মদ আলী (পাকিস্তানের জনপ্রিয় নায়ক) আমাকে বললেন, ‘শবনম, তুমি তো সময় সুন্দরভাবে মেনটেইন করতে পারো। এক কাজ করো, সময়কে তুমি ভাগ করে নাও। সকাল ৬টা থেকে ১০টা পর্যন্ত এক শিফট, ১০টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত আরেক শিফট, বেলা ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অন্য স্টুডিওতে এক শিফট, সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত আরেকটা—এভাবেই দিনে চারটি ছবিরও শুটিং করেছি। শুটিং স্পটে আমি চরিত্রের উপযোগী হয়ে ঢুকতাম। বলামাত্রই মুহূর্তের মধ্যে ওই চরিত্রের জন্য রেডি হয়ে যেতে পারতাম। একবার আমি যখন দৃশ্যের মধ্যে ঢুকতাম, অটোমেটিক্যালি সব ব্রেনে প্রসেস হয়ে যেত। দৃশ্যের পর গানের শুটিং থাকলে সেটার বিষয়েও আমার মাথা একদম পরিষ্কার ছিল। আমার একটা ভ্যান ছিল, যেখানে স্যুটকেসভর্তি বিভিন্ন ছবির কস্টিউম থাকত, থাকত চরিত্রের জন্য নানা ধরনের জুয়েলারিও। আমার যে ভ্যান ছিল, ওটাতে ফ্রিজ, আলমারি, বেড ছিল—ভ্যানটা আমার নিজেরই। লাহোরে যাওয়ার পর আমার কাজের সুবিধার কথা ভেবে রবিন ওই ভ্যান কিনে দিয়েছিল। তারপর ছবির ডাবিং, মুক্তি এসব নিয়ে ব্যস্ততা তো আছেই। সব সমন্বয় করে কাজ করতাম।

আপনাকে নাকি পাকিস্তানে সবাই ভাবি বলে ডাকত?

শবনম: আমাকে ম্যাডাম ডাকত, কিন্তু সেটা আমার ভালো লাগত না। রবিন ঘোষের কারণে ওখানকার সবাই পরে ভাবি বলে ডাকত। শুটিং স্টুডিওতে সবার কাছে আমি তাদের ভাবি ছিলাম।

নায়িকাদের সঙ্গে শুধুই প্রতিযোগিতা চলত, নাকি বন্ধুত্বও হতো?

শবনম : সবার সঙ্গে কি আর বন্ধুত্ব হয়? আমার সঙ্গে শুরু থেকেই বন্ধুত্ব ছিল জেবার। আমাদের সেই বন্ধুত্ব এখনো আছে। কয়েক দিন পরপর আমাদের কথা হয়। ও আমাকে লাহোর যেতে বলে, আমিও বলি আসতে।

নায়কদের মধ্যে পাকিস্তানে আপনার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি কাজ হয়েছে নাদিমের...

শবনম : নাদিমের সঙ্গে ৫০টির বেশি ছবিতে অভিনয় করেছি। কাজ নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকতাম যে গল্প করার সেই সময়টা পেতাম না। সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত স্টুডিওতে আছি। তবে ক্যাপ্টেন চাচার কারণে নাদিমের সঙ্গে একটা পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। দেখা গেল, শুটিংয়ে আমি ভালো একটা অ্যাকশন দৃশ্য করলাম, নাচে ভালো এক্সপ্রেশন দিলাম, এরপর নাদিম বলত, খুব ভালো হয়েছে। আমরা শুটিংয়ের আগে সব সময় মহড়া করতাম। মাঝেমধ্যে দেখা যেত, মহড়ায় যা করেছি, তা শুটিংয়ে ঠিকঠাক দিতে পারতাম না। না পারলে আবার শট দিতাম। নাদিমের সঙ্গে শুটিংয়ে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম।

বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে গিয়ে প্রভাবশালী নায়িকা হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে আপনার নিজস্ব কৌশল কী ছিল? নিজের অবস্থান ধরে রাখার ক্ষেত্রে কৌশল কী ছিল?

শবনম: একটা দেশ থেকে আরেক দেশে গিয়েছি। শুরুতে তাই ওই দেশের নিয়মকানুন, পোশাক–আশাক, সংস্কৃতি আয়ত্ত করা আমার প্রধান লক্ষ্য ছিল! আমি তো একটা বাঙালি মেয়ে ছিলাম। স্কুলে পড়েছি, ফ্রক পরেছি—অল্প বয়সে ছবিতে অভিনয় শুরু করি। ওখানে গিয়ে শাড়ি পরা শুরু করলাম। পাকিস্তানে গিয়ে সিনেমার জন্য আমাকে নানা রকম পোশাক পরতে হয়েছে, সবই চরিত্রের উপযোগী। তবে আমার লক্ষ্যই ছিল, কাজ করতে হবে। যখন কোনো চরিত্র পেতাম, সেটা নিয়েই চিন্তা করতাম। ভাবতাম, চরিত্রটা তো অনেক ইন্টারেস্টিং। আমাকে যে করেই হোক ভালোভাবে কাজটা করতে হবে। ওই চরিত্রটা হয়ে ওঠার চেষ্টা করতাম।

আমার মনে সব সময় একটা বিষয় কাজ করত, একটা সিনেমার শুটিংয়ে ৫০-১০০ জন মানুষ থাকেন। এর বাইরেও লোকজন যুক্ত থাকেন। শুটিংয়ে আমার দেরির কারণে সবার দেরি হবে। আমি ঠিক সময়ে যদি শুটিংয়ে যাই, কাজটা ঠিকভাবে শেষ হবে। ছবিটা ভালো হলে প্রযোজক ব্যবসা করবেন। প্রযোজক ব্যবসা করলে আমি আবার তাঁদের ছবিতে কাজ করতে পারব। ওখানে থাকতে হলে আমাকে এভাবেই থাকতে হবে। আমার দ্বারা যাতে কারও কোনো ক্ষতি না হয়, সেদিকটায় খেয়াল রাখতে হবে। তবে ভালো প্রযোজকের পাশাপাশি খারাপ প্রযোজকও ছিলেন, যাঁরা টাকাপয়সা নিয়ে গন্ডগোল করতেন। ওই সময় অনেকের মধ্যে দেখতাম, অমুকের এত বড় বাড়ি, তমুকের মার্সিডিজ গাড়ি আছে, আমারও হতে হবে—এমন মানসিকতা ছিল। কিন্তু আমার চিন্তা ছিল, করাচিতে যেহেতু একটা বাড়ি কিনেছি, নিশ্চয় আমি লাহোরেও বাড়ি–গাড়ি কিনব—সময়মতো সব হবে। কিন্তু আমাকে সবকিছুর ওপরে ভালো অভিনয় করতে হবে। মানুষের মন জয় করতে হবে। প্রযোজকেরা ব্যবসা করলে বেশি বেশি ছবি হবে। মোট কথা, আমি ঠিকঠাক অভিনয় করলে বাকি সবই আমার অটোমেটিক হবে। তাই অভিনয়টাই মনে দিয়ে করেছি, বাকি সব ঠিকঠাক সময়ে হয়ে গেছে।

লাহোরে আপনার বাড়ি–গাড়ি হতে কত সময় লাগল?

শবনম : যত দূর মনে পড়ে, প্রথম ছবির শুটিং শুরুর তিন বছরের মধ্যে বাড়ি–গাড়ি হয়। লাহোরের গুলবার্গের সেই বাড়িটা ছিল বাংলো টাইপ। তিন বিঘার মতো জায়গা নিয়ে বাড়িটি। আমাকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য ওর (রবিনের) অনেক সহযোগিতা ছিল। রবিন কখনোই আমার সামনে প্রশংসা করেনি। হয় না, এই ছবিটা সুপারহিট হয়েছে, একসঙ্গে দেখতে গেলাম, তখন বলা আরকি। রবিন শুধু বলত, ভালো হয়েছে। তবে সব সময় আমার ইতিবাচক সমালোচনা করত, যার কারণে আমি পরে ইমপ্রুভ করতাম। দেখা গেল, কোনো হেয়ারস্টাইল ভালো লাগল না, শাড়ি পরা ঠিকঠাক না মনে হলে, সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দিত। বলত, ‘এই স্টাইলটা আর কোরো না তুমি।’ আমিও তা মেনে চলতাম।

পাকিস্তানের প্রযোজক-পরিচালকেরা যেভাবে আপনাকে স্বাগত জানিয়েছেন, নিশ্চয় নায়িকারা সেভাবে আপনাকে স্বাগত জানাননি! নাকি তাঁরাও আপনার ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিক ছিলেন?

শবনম: আমি যখন নতুন নতুন লাহোরে গেলাম, তখন ওখানকার একজন প্রভাবশালী নায়িকা বলেছিলেন, ‘ওই যে শবনম আসছে, দু-তিনটা ছবি করবে, এরপর চলে যাবে। লাহোরের কম্পিটিশনে কোনোভাবেই টিকতে পারবে না।’ কথাটা আমার কানে এসে পৌঁছাল। আমি শুনলাম, শুনে কিছু বলিনি। মনে মনে বললাম, ঠিক আছে, দেখি না কী করতে পারি। ওই কথাটাই আমার মনের মধ্যে জিদ এনে দিল, মনে মনে ঠিক করলাম, করে দেখাব—আমরা বাঙালিরা পারি কি না। তারপর আল্লাহর রহমত, আমার একার হাতে তো কিছু নেই। আল্লাহর সাপোর্ট ছাড়া অত বড় ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। নইলে একই রকম গল্পে কাজ করেও দুইটা ছবি সুপারহিট, তা–ও আবার একই সপ্তাহে মুক্তি পেয়েছে।

লাহোরে আপনার অভিনীত প্রথম বিগ হিট ছবি কোনটা ছিল?

শবনম : দ্বিতীয় সিনেমায় এসে বিগ হিটের দেখা পাই। ছবির নাম ‘দোস্তি’। এত সুপারহিট হয়েছিল যে বলার অপেক্ষা রাখে না। ওই ছবিতে আমি গ্রামের একটা মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করি। এরপর ‘আন্ধেলি’ও সুপারহিট ছিল।

পাকিস্তানে মুক্তি পাওয়া আপনার সেরা ১০টি ছবির যদি নাম বলেন।

শবনম: ‘আন্ধেলি’, ‘দোস্তি’, ‘বন্দেগি’, ‘আয়না’, ‘বন্দিশ’, ‘আনমোল’, ‘কোরবানি’, ‘জিনাত’ (এই ছবিতে মা-মেয়ে চরিত্রে অভিনয় করেছেন), ‘পেহচান’, ‘দেহলিজ’। আমার অভিনীত তিনটি ছবি তো ভারতে রিমেক করল, রেখা নায়িকা ছিল, ‘সাচ মেরে চেহলি’, ‘মে তো মেরি দুলহান’, ‘রানি বেটি রাজ করেগি’। ১৯৯৯ সালে যখন স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে চলে আসি, তার আগে ‘রানি বেটি রাজ করেগি’ ছবিটির কাজ শেষ করেছি। বাংলাদেশি অভিনীত ছবির মধ্যে ‘নাচের পুতুল’, ‘সন্ধি’, ‘কাজল’, ‘শর্ত’, ‘আখেরি স্টেশন’ ও ‘আম্মাজান’। ‘আখেরি স্টেশন’ ছবিতে পাগলের চরিত্রে অভিনয় করেছি।

বিনোদন অঙ্গনে কাজ করা হলেও আপনি–রবিন ঘোষ—দুজনের মাধ্যম ছিল আলাদা। দুজনই তো তুমুল ব্যস্ত সময় পার করতেন। আপনাদের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি কী ছিল?

শবনম: আমাদের বোঝাপড়া চমৎকার ছিল। নিজেদের চেনা, ভরসা রাখা—এ ব্যাপারটা বরাবরই ছিল। খামোখা এসে কেউ কিছু বলল আর অবিশ্বাস তৈরি হয়ে যাবে, তা নয়। রবিনের একটা গাড়ি ছিল টিয়া পাখির রঙের। ওই গাড়িটা লাহোরে আমাদের পরিচিত সবাই চিনত। কেউ হয়তো দেখল, রবিন গাড়িতে করে কোথাও যাচ্ছে, সঙ্গে কেউ আছেন এমনটা ঘটত। আমার এক ভাবি ছিলেন ক্যামেরাম্যান, আফজাল চৌধুরীর স্ত্রী সুরাইয়া চৌধুরী, তিনিও বেশ প্রভাব নিয়ে লাহোরে চলতেন। একদিন আমাকে এসে বললেন, ‘রবিন ভাইকে দেখলাম মালরোডে কাকে নিয়ে যেন গাড়িতে করে যাচ্ছে।’ শুটিং শেষে আমি বাসায় এসে জিজ্ঞেস করতাম, তুমি গাড়িতে করে কাকে নিয়ে গেছ? এতে অবাক হতো! আমিও মজা করতাম। তবে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া যে হতো না, তা কিন্তু নয়। এরপর আবার সব ঠিকঠাক হয়ে যেত। দুজন দুজনের মতো কাজে মনোযোগী হতাম।

আপনিও তো অনেকের কাছে স্বপ্নের মানুষ ছিলেন। প্রেমের প্রস্তাব পেতেন না?

শবনম : ইন্ডাস্ট্রির কেউ আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিতে সাহস পায়নি। আমি আবার কাউকে সে রকম সুযোগও দিতাম না। শুটিংয়ে সব সময় আমার সহকারী থাকত, শুটিং শেষ, জিনিসপত্র গাড়িতে ওঠানোর পর বাসায় চলে যেতাম। শুটিং শেষে হিরোদের সঙ্গে বা প্রযোজকদের সঙ্গে বসে গল্প করার সুযোগও ছিল না। তবে বাইরের মানুষের কাছ থেকে প্রচুর প্রেমের প্রস্তাব পেয়েছি, যা গুনে শেষ করা যাবে না। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মানুষেরাও প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আমি তখন বলতাম, ঘরেই তো আমার হিরো আছে, প্রেম করতে বাইরে যাব কেন? কারণ, রবিন নিজেই তো খুবই হ্যান্ডসাম ছিল।

সংসারজীবনের সমন্বয় করতেন কীভাবে?

শবনম : এ ক্ষেত্রে রবিন বেশি সহযোগিতা করেছে। বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে একটা ছেলে নিয়ে গিয়েছিলাম, সে পুরো সংসার দেখাশোনা করত। বাজার সদাই সব করত। সংসারের মধ্যে আর কী, রনিকে স্কুলে দিয়ে আসা, নিয়ে আসা। আমরা মাত্র দুজন, আর কী করা। দুজন মিলেমিশে সব করতে হতো। তবে আমার বাসায় খুব পার্টি হতো। তখন তো মোবাইল ছিল না, চারটা ছবির শুটিং এক দিনে যখন হতো তখন আমি হয়তো রবিনকে বলিনি বা বলার সুযোগ পাইনি। তাই কাগজে লিখে রেখে যেতাম, সকাল ১০টা থেকে এতটা পর্যন্ত এই স্টুডিও, এরপর অন্য স্টুডিওতে। দরকার হলে ফোন দিতে। কাজের ব্যাপারে দুজন দুজনের পরিষ্কার ধারণা থাকত। রবিনের কোনো দরকার হলে ফোন করত স্টুডিওতে। রবিনও তার কাজের ব্যাপারে আমার কাছে পরিষ্কার থাকত।

১৯৬৮ সালে পাকিস্তানে গেলেন। ওয়াহিদ মুরাদের সঙ্গে অভিনয় করলেন। এরপর যত ছবিতে অভিনয় করেছেন, তার মধ্যে নাদিমের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি—৫০টির মতো ছবিতে অভিনয় করেছেন। এত ছবিতে কাজ করতে গিয়ে নিশ্চয় আপনাদের সম্পর্কটা শুধুই পেশাগত সম্পর্কে থাকেনি, বন্ধুত্বকেও ছাপিয়ে গেছে! আপনাদের সম্পর্কটা আসলে কেমন ছিল?

শবনম : নাদিমের সঙ্গে প্রথম সিনেমা ছিল ‘তুম মেরে হো’, এখানেই (বাংলাদেশ) করছিলাম। ষাটের দশকে। তারপর ‘হারানো দিন’, ‘চান্দা’, ‘তালাশ’। পাকিস্তানে যাওয়ার পর কোনটা করেছি, মনে নেই। তবে আমাদের সম্পর্কটা ওই যে বললাম, ফ্যামিলি মেম্বারের মতো। আমরা খুব হাসিঠাট্টা, হইচই করে কাজ করতাম। স্টুডিওতে সবাই জানত, আমরা পারিবারিকভাবে সম্পর্কিত। নাদিম কাজের ব্যাপারে সিনসিয়ার ছিলেন। এমনিতে আমার সঙ্গে শুটিংয়ের সময় খুব ভয় পেতেন—ভয় পেতেন এই সেন্সে যে আমি খুব টাইম মেইনটেইন করতাম। নাদিম শুটিংয়ে দেরিতে আসতেন। যখনই শুনতেন কালকের শুটিংয়ে হিরোইন শবনম, তাহলে বলতেন, ‘আয়–হায়, আমার তো আজ ঘুম গেছে।’ যেদিনের শুটিং সকালে হতো, সেদিন আরও বেশি কষ্ট হতো। আমাকে বলতেন, ‘আপনি শুটিংয়ে একটু দেরি করে আসতে পারেন না?’ আমি বলতাম, কেন দেরি করে আসব? বলতেন, ‘এত সকালে আসেন যে ঘুমাতেই পারি না। আপনার সঙ্গে সকাল ছয়টার শুটিং হলে তো রাত তিনটা থেকে জেগে থাকি।’

নাদিমের সঙ্গে আপনার সম্বোধন কি আপনি নাকি তুমিতে ছিল?

শবনম: আপনি। শ্রদ্ধাটা অর্জন করতে হয়। আমি ওখানকার প্রায় সবাইকে আপনি বলেই সম্বোধন করতাম।

পাকিস্তানে ১৫০টির মতো ছবিতে অভিনয় করলেও আপনার আর নাদিমের জুটি এত জনপ্রিয় হলো কেন বলে মনে করেন?

শবনম : কেন এত পছন্দ করল, সেটা আসলে ওভাবে কখনো ভাবিনি। তবে আমার মনে হয়, আমার আর নাদিমের বয়সটা কাছাকাছি। পর্দায় দুজনকে খুব ভালো লাগত। তখন সবাই এ–ও জানত, নাদিম আর আমি স্বামী-স্ত্রী। এখনো আমরা প্রায় মন্তব্য দেখি, আপনারা দুজন স্বামী-স্ত্রী কেন হলেন না? নাদিমকে এমন প্রশ্নও করেছিল, কেন আপনি শবনমকে বিয়ে করেননি? তখন নাদিম বলেছিলেন, ‘শবনম তো ফিল্মে আসার আগেই বিয়ে করে ফেলেছে।’ এটা ঠিক, পর্দায় দেখতে দেখতে মানুষের মাথায় এসব ঢুকে গেছে। এমনও গেছে, দুই সপ্তাহে একই প্রেক্ষাগৃহে দুটো ছবি মুক্তি পেয়েছে, দুটোরই হিরো-হিরোইন আমরা। আমার বিয়ের পর কিন্তু নাদিম বিয়ে করেছেন।

আপনি যদি আগে বিয়ে না করতেন তাহলে কি নাদিমের সঙ্গে বিয়ের সম্ভাবনা ছিল?

শবনম: সেটা হয়তো হতেও পারত, অসম্ভব কিছু ছিল না। আমাদের তো পর্দার রসায়ন এত চমৎকার ছিল, মানুষ ভেবেই নিয়েছিল, নাদিম আর আমি স্বামী-স্ত্রী। তখন আসলে আমরা কাজ নিয়ে বেশি ভাবতাম। নাদিম ভালো করলেন, আমার তো খারাপ করা যাবে না। তাই আমিও সেট থেকে নড়তাম না। কারণ, আমাকে রিঅ্যাকশন ঠিকঠাকভাবে দিতে হবে।

এই যে বললেন, বিয়ে না করলে হয়তো নাদিমের সঙ্গে বিয়ে হতেও পারত, তার মানে আপনাদের সঙ্গে সম্পর্কটা শুধু পারিবারিক আর পেশাগত থাকেনি, সেটা কিছুটা হলেও প্রেমের সম্পর্কে মোড় নিয়েছিল?

শবনম : নাদিম আর আমার সম্পর্ক কখনোই প্রেমের সম্পর্কে মোড় নেয়নি। আমাদের বন্ধুত্ব ছিল। এমন কিছু কথা ছিল, যা অন্য কারও সঙ্গে বলতে পারতাম না, তা নাদিমের সঙ্গে অবলীলায় বলতে পারতাম। সম্পর্কটা ঠিক এ রকম।

আপনি ও নাদিম দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করার পরও নতুনত্ব ধরে রেখেছিলেন, এমনটাই মত অনেকের, এ নিয়ে কী বলবেন?

শবনম : আমি বরাবর ডায়েট করতাম। ফিটনেসের ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিলাম। দেখা গেছে, শুটিংয়ে নাদিম ভাত খাচ্ছেন, আমি খাচ্ছি না। নাদিম এ নিয়ে আমাকে প্রায়ই খোঁচাতেন। বলতেন, আপনি কোনো দিনই উন্নতি করতে পারবেন না। মজা করে বলতেন, আপনি হিরোইন, সব সময় হিরোইনই থাকবেন, অভিনেত্রী হতে পারবেন না।

সহ–অভিনেতা হিসেবে নাদিম আপনার কাছে কেমন স্বাচ্ছন্দ্যের ছিলেন?

শবনম : সেটে ঢুকলে নাদিম কাজ শেষ না করে বের হতেন না, এটা আমার খুব ভালো লাগত। থাকে না, শুটিং করার সময় ফোন এলে বেরিয়ে যাওয়া, এটা নাদিমের মধ্যে কখনো দেখিনি। নাদিম সেটে যদিও দেরিতে আসতেন; কিন্তু একবার ঢুকলে পুরো কাজ শেষ না করে কখনোই বের হতেন না। এটা আমার খুব ভালো লাগত। দেখা যেত, এমন কোনো মেকআপ বা গেটআপ নিচ্ছেন, তখন আমি বলতাম, এটা নিয়েন না এভাবে—আপনাকে ভালো দেখাবে না। তখন আমার কথা শুনতেন। আমার ক্ষেত্রেও তা–ই হতো—যেটা অন্যদের সঙ্গে করতে পারতাম না। খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ ছিলাম। তাই তো এখন পর্যন্ত মানুষ আমাদের পছন্দ করে। আমি পাকিস্তানে ১০-১২ জন হিরোর সঙ্গে কাজ করেছি; কিন্তু কারও সঙ্গে কমফোর্টেবল ছিলাম না, যা নাদিমের সঙ্গে ছিলাম। অন্যদের সঙ্গে এটা ভেবেই কাজ করতাম, তিনি আমার হিরো, আমি তাঁর হিরোইন।

নাদিমের পর স্বাচ্ছন্দ্যের দিক দিয়ে পাকিস্তানে আপনার সহনায়ক কারা?

শবনম : নাদিম ছাড়া যাঁরা ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে ছবি করলাম, কাজ শেষ—এটুকুই ছিল। শুটিং সেট পর্যন্ত তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক। তবে পর্দায় আমি সবার সঙ্গে পেশাদার ছিলাম। ওই সময়টায় পাকিস্তানে ছয়জন নতুন নায়কের অভিষেক আমার সঙ্গে হয়েছিল। তাঁরা আমার সঙ্গে ছবি করেছেন মানেই হিট, এরপর তাঁদের আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। নতুনদের মধ্যে জাবেদ শেখ, ফয়সাল, শফি মোহাম্মদসহ কে কে যেন ছিলেন। তাঁরা সবাই তখন টেলিভিশনে কাজ করতেন, আমার সঙ্গে তাঁদের সিনেমার পর্দায় অভিষেক হয়।

পাকিস্তানে মোট কতগুলো ছবিতে অভিনয় করেছেন?

শবনম : পাকিস্তানে আমি ১৫০টির মতো ছবিতে অভিনয় করেছি।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ