শাহজাদপুর সংবাদ

নদীর দেশ, ভ্রমণের নতুন দিগন্ত: বাংলাদেশে রিভার ট্যুরিজমের সম্ভাবনা

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৭:৫২ PM

নদীর দেশ, ভ্রমণের নতুন দিগন্ত: বাংলাদেশে রিভার ট্যুরিজমের সম্ভাবনা

এবারের বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য ‘পর্যটন পুনর্নির্মাণে ডিজিটাল এজেন্ডা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’। অর্থাৎ প্রযুক্তি ব্যবহার করে পর্যটনকে আরও আধুনিক, সহজলভ্য ও টেকসই করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাতগুলোর একটি হতে পারে নদী ও নৌ পর্যটন।

সাম্প্রতিক সময়ে হাওর ও নদীকেন্দ্রিক হাউসবোট ভ্রমণের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। উঁচু পাহাড়ে ট্রেকিং কিংবা সমুদ্রসৈকতে ঘুরে বেড়ানোর চেয়ে নদীর বুকে ভেসে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই বেশি স্বস্তিদায়ক। নৌকায় বসে শান্ত জলের ওপর আকাশের প্রতিচ্ছবি দেখতে দেখতে দুই তীরের বদলে যাওয়া প্রকৃতি উপভোগ করার প্রশান্তি একেবারেই আলাদা।

ভোরের আলো যখন পদ্মার বুকে নরম সোনালি রেখা আঁকে, মেঘনার ঢেউ তখনো রাতের গল্প বয়ে নিয়ে চলে। সিরাজগঞ্জের নদীর পাড় থেকে কিশোরগঞ্জ হয়ে সুনামগঞ্জের হাওর কোথাও জেলের জাল, কোথাও পালতোলা নৌকা, কোথাও নদীর ধারে কাশফুলের সারি। বাংলাদেশে নদী শুধু ভূগোলের অংশ নয়; জীবন, সংস্কৃতি আর স্মৃতিরও অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী।

বিশ্ব পর্যটন দিবসে তাই ভাবনায় আসতেই পারে নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের কথা। যে দেশকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নদীবিধৌত ভূখণ্ড বলা হয়, কাঠামোগত পরিকল্পনা ও সঠিক উদ্যোগের মাধ্যমে সেই দেশের নদীগুলো আরও বড় পর্যটন সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। সেই সম্ভাবনার কথাই থাকল হাল ফ্যাশনের এই আয়োজনে।

ইউএন ট্যুরিজমের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে ৭০০টির বেশি নদী আছে। বর্ষায় নদীর বিস্তৃতি যেমন বদলে যায়, তেমনি শীতের নদীও ভিন্ন এক সৌন্দর্য নিয়ে ধরা দেয়। ঋতুভেদে এই পরিবর্তিত রূপই নদী পর্যটনের অন্যতম বড় শক্তি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নদীকেন্দ্রিক পর্যটন বহুদিন ধরেই জনপ্রিয়।

ইউরোপের দানিউব, মিসরের নীল নদ কিংবা থাইল্যান্ডের চাও ফ্রায়া নদীতে ক্রুজ কিংবা ইস্তাম্বুলের বসফরাস ক্রুজ এখন শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া নয়; সেটিই একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশেও সেই অভিজ্ঞতার সব উপাদান আছে; এখন প্রয়োজন শুধু পরিকল্পিত অবকাঠামো, নিরাপদ নৌপথ, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা; তাহলেই এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া যাবে।

বাংলাদেশের প্রতিটি নদীর আলাদা চরিত্র আছে। কোথাও বিস্তীর্ণ জলরাশি, কোথাও চরাঞ্চলের জীবন, কোথাও পাহাড় আর নদীর মিলন, আবার কোথাও জলাভূমির জীববৈচিত্র্য। এই বৈচিত্র্যই রিভার ট্যুরিজমকে শুধু নৌভ্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না, বরং প্রতিটি নদীপথকে আলাদা অভিজ্ঞতায় পরিণত করতে পারে। পদ্মা নদীতে পদ্মা সেতুকে ঘিরে সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত ক্রুজ কিংবা চরভিত্তিক অভিজ্ঞতা পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে। মেঘনার বুকে চাঁদপুরের তিন নদীর মোহনা, ইলিশ সংস্কৃতি আর নদীপারের জীবন একসঙ্গে দেখার সুযোগ রয়েছে।

যমুনার বিশাল জলরাশি, চরাঞ্চলের জীবনযাপন ও পরিযায়ী পাখির বিচরণ অন্য রকম আকর্ষণ তৈরি করে। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে বন্দর, পাহাড় ও নদীর মিলিত দৃশ্য শহুরে রিভার ক্রুজের সম্ভাবনা বাড়ায়। অন্যদিকে সুন্দরবনের পশুর, শিবসা ও অন্যান্য নদীপথ ইতিমধ্যে জনপ্রিয় হলেও পরিবেশ সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিয়ে আরও মানসম্মত অভিজ্ঞতা তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু নদী পর্যটনের ভবিষ্যৎ কেবল সুন্দর দৃশ্যের ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থানীয় মানুষের জীবন, পরিবেশ রক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নের প্রশ্নও।

আধুনিক পর্যটকেরা এখন শুধু একটি জায়গা দেখে ফিরে আসতে চান না। তাঁরা সেই জায়গার গল্প, মানুষের জীবন, খাবার, গান আর সংস্কৃতির অংশ হতে চান। নদী পর্যটন সেই সুযোগ তৈরি করতে পারে। একটি নদীকেন্দ্রিক ভ্রমণের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে সূর্যোদয় কিংবা সূর্যাস্তের ক্রুজ, স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ের জীবন দেখার সুযোগ, নদীপারের লোকসংগীত, চরাঞ্চলের কৃষিজীবনের অভিজ্ঞতা, ঐতিহ্যবাহী নদীকেন্দ্রিক খাবারের স্বাদ কিংবা কায়াকিং ও ফটোগ্রাফি ট্যুর। এ ধরনের অভিজ্ঞতা দেশি-বিদেশি দুই ধরনের পর্যটকের কাছেই সমান আকর্ষণীয় হতে পারে।

রিভার ট্যুরিজম শুধু পর্যটকদের আনন্দ দেওয়ার জন্য নয়; এটি নদীপারের মানুষের জীবিকাও বদলে দিতে পারে। মাঝি, স্থানীয় গাইড, হস্তশিল্প বিক্রেতা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, গ্রামীণ হোমস্টে পরিচালনাকারী কিংবা নদীর পাড়ের খাবারের দোকানদার—সবাই এই অর্থনৈতিক চক্রের অংশ হতে পারেন। দীর্ঘদিন ধরেই পর্যটনকে স্থানীয় অর্থনীতি ও সম্প্রদায়ভিত্তিক উন্নয়নের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে নদীকেন্দ্রিক পর্যটন বাংলাদেশের জন্যও বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র।

সুনামগঞ্জের হাওরে টেকসই পর্যটনের একটি কার্যকর মডেল গড়ে তুলছে পরিবেশ সচেতন প্রতিষ্ঠান ডাহুক। ২০১৭ সাল থেকে তারা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিকল্প জীবিকা তৈরির পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণে কাজ করছে। তাহিরপুর নৌ পর্যটনশিল্প সমবায় সমিতির মাধ্যমে স্থানীয় মাঝি ও নৌকার মালিকদের প্রশিক্ষণ, নিরাপদ নৌপরিবহন এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করা হয়েছে।

অনেক নৌকায় বর্জ্য সংগ্রহের বিন রাখা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বিভিন্ন এলাকা থেকে প্লাস্টিক সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দিয়ে আর্থিক প্রণোদনা পাচ্ছেন। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সহযোগিতায় এই মডেল ভৈরব ও রাজশাহীতেও পাইলট পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে হাউসবোট পরিচালনাতেও। সুনামগঞ্জের তরী ময়ূরাক্ষীর কর্ণধার আকরাম হোসেন জানান, স্থানীয় বোটগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে পরিবেশবান্ধবভাবে পর্যটন পরিচালনার চেষ্টা করছেন তারা। দেশীয় পর্যটকের পাশাপাশি বিদেশিরাও এখন এই অভিজ্ঞতায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

বাংলাদেশের নদীগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সভ্যতা, বাণিজ্য, গান আর মানুষের জীবন বহন করে চলেছে। সেই গল্পকে এখন বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেওয়ার সময় এসেছে। সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং স্থানীয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে পারলে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, কর্ণফুলী কিংবা টাঙ্গুয়ার হাওরের জলরাশি শুধু নৌকা নয়, বাংলাদেশের পর্যটনের নতুন সম্ভাবনাও বহন করে নিয়ে যেতে পারে।

সম্ভাবনার পাশাপাশি দায়িত্বও রয়েছে। নদীকে পর্যটনের সম্পদ বানাতে গিয়ে নদীর ক্ষতি করা যাবে না। প্লাস্টিকমুক্ত নৌভ্রমণ, নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, জলজ প্রাণী ও পাখির আবাস সংরক্ষণ, নিরাপদ জেটি ও লাইফ জ্যাকেট নিশ্চিত করা এবং কম নির্গমনকারী নৌযান ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া—এসব বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল এলাকায় পর্যটন ও সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অপরিহার্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিত নদীভিত্তিক পর্যটন রুট, ডিজিটাল বুকিং ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত নদী গাইড, উন্নত পর্যটক সেবা, স্থানীয় সংস্কৃতিকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের নদী পর্যটনকে তুলে ধরার উদ্যোগ একসঙ্গে এগোলে এই খাত আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ