দুই যুগ ধরে খোঁজার পর দেখা পাওয়া গেল বিরল ভুজঙ্গ পাখির
৩ নভেম্বর, ২০২৬ এ ১১:৫৮ AM

অতি বিরল পাখিটিকে খুঁজছি দুই যুগ ধরে; কিন্তু দেখা পাইনি কখনো। কারণ, এ দেশে ওটিকে দেখার রেকর্ড ১০ বারেরও কম। এ পর্যন্ত কক্সবাজারের ডুলাহাজারা, ইনানী, কাপ্তাই, হাজারিখিল, লাউয়াছড়া, করমজল ও কুয়াকাটায় দেখা গেছে। গত কয়েক বছরের রেকর্ড পর্যালোচনা করে পাখিটিকে এ সময় কুয়াকাটায় দেখার সম্ভাবনা বেশি মনে হওয়ায় ‘বার্ডিংবিডি ট্যুরস’ ‘কুয়াকাটা পন্থ-পরিযায়ী পাখি খোঁজা অভিযান’ ঘোষণা করল।
আটজনের টিমে ১৫ অক্টোবর রাতে রওনা হলাম; কিন্তু বাস ছাড়তে দেরি হওয়ায় সকালে পাখি খোঁজার মোক্ষম সময়টা নষ্ট হয়ে গেল। বাস থেকে নেমে হোটেলে উঠে ফ্রেশ হয়ে নাশতা সেরে লেম্বুর বনে পৌঁছাতেই সকাল সাড়ে ১০টা। দুপুরের খাবারের আগে ও পরে দুইবারে পাঁচ ঘণ্টা বিরল পাখিগুলোকে খুঁজলাম মোক্ষম জায়গাগুলোতে; কিন্তু বিধি বাম! কোথাও পেলাম না। বিফল মনোরথ হয়ে হোটেলে ফিরলাম।
পরদিন সকালে অটোভ্যানে সাত কিলোমিটার দূরের লেম্বুর বনের দোলনা পয়েন্টে নামলাম। জিরিয়া, বালুচরাসহ কয়েকটি সৈকত পাখির ছবি তুলে সরাসরি ঢুকে গেলাম বাদাবনের গহিনে। ঘণ্টাখানেক বনের বিভিন্ন স্থানে পাখিগুলোকে খুঁজলাম; কিন্তু ফলাফল শূন্য। শেষে বাদাবনসংলগ্ন ঝাউবনে ঢুকলাম। এ বনের গাছগুলো সরু ও উঁচু। অনেকটা বিদেশি বনের মতো! বনে ঢুকেই প্রচুর পাখির শব্দ শুনলাম। হাঁড়িচাঁচা, বনমালি, হলদে বউ, দুই–তিন প্রজাতির মাছরাঙা, কাঠঠোকরাসহ বহু প্রজাতির পাখির যেন মেলা বসেছে!
গাছের ডালের পাশ দিয়ে হাঁটারত বনমালির ছবি তোলার সময় আচমকা একটি ফিঙে ওকে তাড়া করতেই চমৎকার শটটি মিস করলাম। এরপর বনে যেন ফিঙেদের আনাগোনা বেড়ে গেল! বেশির ভাগই অল্প বয়স্ক পাখি। ফিঙের সঙ্গে রয়েছে ছোট ভুজঙ্গ। চেষ্টা করলাম, প্রতিটি পাখির আলাদা ছবি তুলতে। কারণ, অতি বিরল পাখিটি ফিঙের দলেই থাকে। ঝাউবনে ফিঙেদের ছবি তুলতে তুলতে একটি বড় লতায় বুক–পেটে সাদা ফোঁটাসহ একটি ফিঙেকে বসতে দেখলাম। ওর ঠোঁটজোড়া খাটো ও শক্তপোক্ত মনে হলো। মাথা ও লেজের গঠনও ভিন্ন। আমি ও ইকবাল বাবু ছাড়া অন্য কেউ ছিল না। একই সঙ্গে দুজনেই শাটারে ক্লিক করলাম। মাত্র তিনটি ছবি তুলতেই পাখিটি পালাল। এরপর আরও দুটি ফিঙের ছবি তুলে ঝাউবন ত্যাগ করলাম।
কুয়াকাটার ঝাউবনে দেখা খাটো ঠোঁটের ফিঙেটি লম্বায় ২৭ থেকে ৩২ সেন্টিমিটার। ওজন ৪৪ থেকে ৬৮ গ্রাম। পালক চকচকে কালো, তবে কাঁধ-ঢাকনির চাকচিক্য কম। ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ না করলে এটিকে ফিঙে থেকে পার্থক্য করা কঠিন। স্ত্রী ও পুরুষ একই রকম। লেজ অপেক্ষাকৃত চওড়া, যার অগ্রভাগ বাইরের দিকে ছড়ানো, ফিঙের মতো গভীরভাবে চেরা নয়। চোখ গাঢ় বাদামি। ঠোঁট, পা, পায়ের পাতা, আঙুল ও নখ কালো। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের ওপরটা ফ্যাকাশে–কালচে বাদামি; গলা ও বুকে সাদা তিল এবং বগল ছাই ধূসর। অন্যদিকে প্রথম শীতবর্ষীয় পাখির বুক-পেটে ধূসরাভ সাদা ছিটছোপে ভরা।
এদের বড় পাতার মিশ্র চিরসবুজ, পাতাঝরা ও বাদাবনে দেখা যায়। গাছের নিচের অংশে, ঝোপঝাড় ও লতাগুল্মে বিচরণ করে। সচরাচর একাকী বা জোড়ায় থাকে। এ দেশে এটি ‘তথ্য অপ্রতুল’ পাখি। তবে অনেকের মতে পন্থ-পরিযায়ী হিসেবে অক্টোবরে অল্প কয়েক দিনের জন্য এ দেশে আসে। কীটপতঙ্গ, ব্যাঙ, সরীসৃপ, ছোট পাখি ইত্যাদি খায়। মিষ্টি কণ্ঠে ‘ফুউইইইট্...ফুউইইইট্...’ শব্দে ডাকে। এ ছাড়া ‘কোয়্যারশকোয়্যারশ...সুইফট...’ কর্কশ কণ্ঠেও ডাকতে পারে।
এপ্রিল থেকে জুন প্রজননকাল। এ সময় হিমালয় ও উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি বনের গভীরে মাটি থেকে ৪ থেকে ১২ মিটার উঁচুতে গাছের দোডালায় মাকড়সার জালে গাছের বাকল ও ঘাস জড়িয়ে বাটির মতো চ্যাপ্টা বাসা বানায়। লালচে বাদামি ও ধূসর ছিটছোপসহ তিন-চারটি ফিকে গোলাপি ডিম পাড়ে। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে বাসা বানায়; কিন্তু স্ত্রী একাই ডিমে তা দেয়। ডিম থেকে ছানা ফোটার সঠিক সময় জানা না গেলেও অনেকের মতে তা ১৪-১৫ দিন। ছানাগুলো উড়তে শেখে ১৫ থেকে ২২ দিনে।
কুয়াকাটা সৈকতের ঝাউবনে দেখা বুক–পেটে সাদা ফোঁটাসহ খাটো ঠোঁটের ফিঙেটি আর কোনোটি নয়, এ দেশের অতি বিরল পন্থ-পরিযায়ী ও ভবঘুরে পাখি ভুজঙ্গ বা কাকঠুঁটো ফিঙে। পশ্চিমবঙ্গে বলে কাকচঞ্চু ফিঙে। ইংরেজি নাম ক্রো-বিল্ড ড্রোঙ্গো। গোত্র ডাইক্রুরিডি, বৈজ্ঞানিক নাম Dicrurus annectens. বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই দেখা মেলে। কয়েক দিন ধরে পাখি দুটিকে মিরপুর জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে দেখা যাচ্ছে।
আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি, বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পর্কিত সংবাদ
গণসংযোগের ভিড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে খুন, সেই বাঁহাতি শুটার কেন ধরা পড়ছে না
৩ নভেম্বর, ২০২৬ এ ১২:২৮ PM · প্রথম আলো
মিরপুরে পোশাকশ্রমিক–পুলিশ সংঘর্ষ, মেট্রোরেলের দুটি স্টেশন বন্ধ
৩ নভেম্বর, ২০২৬ এ ১২:২৭ PM · প্রথম আলো
বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলার মামলায় কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন আখতারুজ্জামান
৩ নভেম্বর, ২০২৬ এ ১২:০৬ PM · প্রথম আলো
‘আমার মা ও তিন বোনকে কেন হত্যা করা হলো, কারণই জানতে পারলাম না’
২ নভেম্বর, ২০২৬ এ ১২:৩৭ PM · প্রথম আলো
ঐতিহ্য আর আস্থার মিলন: ভাগ্যকুল মিষ্টান্ন ভান্ডার টিকে আছে ৩০ বছর ধরে
২ নভেম্বর, ২০২৬ এ ১২:৩৪ PM · প্রথম আলো
