শাহজাদপুর সংবাদ

দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ হলে নবীজি (সা.) কী করতেন

২১ আগস্ট, ২০২৬ এ ৯:০০ AM

দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ হলে নবীজি (সা.) কী করতেন

দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ অস্বাভাবিক নয়। দুজন মানুষ একসঙ্গে থাকলে মতের পার্থক্য থাকবেই। পছন্দ আলাদা হতে পারে। অভ্যাস আলাদা হতে পারে। কোনো বিষয় নিয়ে দুজনের দৃষ্টিভঙ্গিও ভিন্ন হতে পারে।

সমস্যা মতবিরোধে নয়। সমস্যা হলো মতবিরোধের সময় আমরা কীভাবে আচরণ করি। রাসুলের ঘরেও মানবিক অনুভূতি ছিল। কখনো অভিমান হয়েছে। কখনো মন খারাপ হয়েছে। কখনো স্ত্রীদের মধ্যে ঈর্ষাও প্রকাশ পেয়েছে।

তবে এসব পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষেত্রে তাঁর আচরণ ছিল ভারসাম্যপূর্ণ, কোমল ও দূরদর্শী।

দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষত অনেক সময় কথার মাধ্যমে তৈরি হয়। রাগের মুহূর্তে মানুষ এমন কথা বলে ফেলে, যা পরে ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘মুমিন গালাগালকারী নয়, অভিশাপকারী নয়, অশ্লীলভাষীও নয়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৭৭)

স্বামী-স্ত্রীর মতবিরোধে এই শিক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ। মতবিরোধ হতে পারে। অপমান করা যাবে না। গালাগালি করা যাবে না।

একবার আয়েশা (রা.)-এর কাছে রাসুলুল্লাহ (সা.) বুঝতে চাইলেন, তিনি তাঁর ওপর সন্তুষ্ট কি না। তিনি বললেন, ‘আমি জানি, তুমি কখন আমার ওপর সন্তুষ্ট থাকো এবং কখন অসন্তুষ্ট থাকো।’

আয়েশা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে? তিনি বললেন, যখন তুমি সন্তুষ্ট থাকো, বলো, ‘মুহাম্মদের রবের কসম।’ আর যখন অসন্তুষ্ট থাকো, বলো, ‘ইবরাহিমের রবের কসম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২২৮)

এখানে দাম্পত্য সম্পর্কের একটি সূক্ষ্ম দিক দেখা যায়। তা হলো সঙ্গীর অনুভূতি বুঝতে হয়। সব কথা মুখে বলতে হয় না। আচরণেও অনেক কিছু প্রকাশ পায়।

আয়েশা (রা.)-এর মধ্যে স্বাভাবিক মানবিক ঈর্ষা ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) তা বুঝতেন। একবার তাঁর কোনো একজন স্ত্রী খাবারের পাত্র পাঠালে আয়েশা (রা.) ঈর্ষাবশত পাত্রটি ভেঙে ফেলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করেননি। তিনি বললেন, ‘তোমাদের মা ঈর্ষা করেছেন।’

এরপর ভাঙা পাত্রের ক্ষতিপূরণ করলেন এবং বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে সামলালেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২২৫)

এখানে একটি শিক্ষা হলো, প্রতিটি আবেগকে অপরাধ বানিয়ে ফেললে সম্পর্ক ভারী হয়ে যায়। কখনো অনুভূতিকে বুঝতে হয়। তারপর পরিস্থিতি শান্ত করতে হয়।

দাম্পত্যের অনেক সমস্যা ব্যক্তিগত। এসব সমস্যা বন্ধু, আত্মীয় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে সমস্যা আরও বড় হয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মর্যাদার মানুষ হলো সে ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর কাছে যায় এবং স্ত্রীও তার কাছে আসে, তারপর সে তার স্ত্রীর গোপন কথা প্রকাশ করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৩৭)

স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয় ব্যক্তিগত রাখার শিক্ষা এখানে স্পষ্ট।

সব মতবিরোধের তাৎক্ষণিক সমাধান প্রয়োজন হয় না; কখনো সময় দিতে হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রীদের একটি ঘটনায় এক মাস তাঁদের থেকে পৃথক ছিলেন। তিনি তাঁদের শাস্তি দেওয়ার জন্য কোনো অশোভন আচরণ করেননি। বিষয়টি নিয়ে তিনি সময় নিয়েছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২০১)

রাগের সময় কথা কমানো দরকার। সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা দরকার। প্রয়োজনে স্থান পরিবর্তন করা দরকার। একটি সম্পর্ক নষ্ট করার মতো কথা বলে ফেলার চেয়ে কিছু সময় চুপ থাকা অনেক ভালো।

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রীদের মতামতকে গুরুত্ব দিতেন। হোদাইবিয়ার সময় সাহাবিরা চুক্তির বিষয়টি নিয়ে মানসিকভাবে কষ্ট পেয়েছিলেন। তখন উম্মে সালামা (রা.)-এর পরামর্শ তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তিনি পরামর্শ দেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যেন নিজে কোরবানি করেন এবং মাথা মুণ্ডন করেন। সাহাবিরা তাঁকে অনুসরণ করবেন। তিনি তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৩১–২৭৩২)

এখানে দাম্পত্য জীবনের একটি সুন্দর শিক্ষা পাওয়া যায়। স্ত্রীকে স্রেফ আবেগের মানুষ হিসেবে দেখলে চলবে না। তাঁর বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ও পরামর্শের মূল্যও আছে।

মতবিরোধের মধ্যেও ভালোবাসা হারিয়ে যেতে দেওয়া উচিত নয়। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর পাত্রের সেই জায়গা থেকে পান করতেন, যেখান থেকে তিনি পান করেছেন। (সহিহ মুসলিম: ৩০০)

এমন ছোট ছোট আচরণ দাম্পত্যে গভীর আপনত্ব তৈরি করে। সম্পর্ক বড় উপহারে টিকে থাকে না। অনেক সময় ছোট ছোট যত্নই সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৯৫)

এটি দাম্পত্য জীবনের একটি মৌলিক নীতি। মানুষ বাইরে কেমন—তা দিয়ে তার চরিত্রের পূর্ণ মূল্যায়ন হয় না। ঘরের মানুষ তার প্রকৃত আচরণ সবচেয়ে ভালো জানে। বাইরে ভদ্রতা দেখিয়ে ঘরে রূঢ় আচরণ করা নবীর আদর্শ নয়।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ