‘বিক্রয়ের জন্য নহে’ লেখা পণ্য কেনাবেচার কি বৈধ
২০ আগস্ট, ২০২৬ এ ৯:০০ AM

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মালামাল কখনো কখনো ব্যক্তিগতভাবে বিক্রি হতে দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত খাবার বা পাবলিক হাসপাতালের ওষুধও বিক্রি হয়ে যায়। অথচ এগুলোর গায়ে লেখা থাকে ‘নট ফর সেল অর এক্সচেঞ্জ’ বা ‘বিক্রয়ের জন্য নহে’।
বাজারদরের তুলনায় কম দামে পাওয়া গেলে অনেকে সেটিকে ভালো সুযোগ মনে করে কিনে ফেলেন। প্রশ্ন হলো, বিক্রেতা কি শরিয়তসম্মতভাবে সেটি বিক্রি করার অধিকার রাখেন? আর ক্রেতার জন্যও কি তা কেনা বৈধ?
সরকারি সম্পদ রাষ্ট্রের অধীন ও জনস্বার্থমূলক কাজে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী সেগুলোর দেখভাল কিংবা বিতরণের দায়িত্ব পেলেই মালিক হয়ে যান না। তিনি মূলত দায়িত্বশীল ও আমানতদার।
ইসলাম আমানতের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা আমানতগুলো তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৫৮)
ইসলামি আইন শাস্ত্রে প্রতিনিধিত্বের একটি মূলনীতি হলো, যে পরিমাণ ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে, প্রতিনিধি তার সীমার মধ্যেই তা প্রয়োগ করতে পারেন। কর্তৃত্ব যতটুকু, বৈধ অধিকার ততটুকুই। (আলাউদ্দিন কাসানি, বাদায়েউস সানায়ে ফি তারতিব আশ–শারায়ে, ৭/৪২৪, দারুল হাদিস, কায়রো, ২০০৫)
শরিয়তসম্মত কেনাবেচার মৌলিক শর্ত হলো, বিক্রেতার বস্তুটির ওপর বৈধ মালিকানা বা মালিকের অনুমতি থাকা। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যা তোমার কাছে (মালিকানায়) নেই, তা বিক্রি করো না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫০৩)
উপরোক্ত হাদিস ও শর্তের আলোকেই রাষ্ট্রীয় সামগ্রী কেনাবেচার বিধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো সরকারের বরাদ্দকৃত মালামাল ব্যক্তিগতভাবে বিক্রির অধিকার সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নেই। বস্তুটি পুরোনো, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত বা নতুন মাল আসায় অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেলেও একই বিধান প্রযোজ্য।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো অফিসে পড়ে থাকা পুরোনো কম্পিউটার একজন কর্মচারী পরিচিতজনের কাছে কম দামে বিক্রি করলেন। ক্রেতা যদি জানেন যে, এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর তা বিক্রি করার অনুমতি নেই, তাহলে শুধু সস্তা দামের কারণে তা কেনা তাঁর জন্য বৈধ হবে না।
শুধু কেনাবেচা নয়, অনুমতি ছাড়া অফিসের সম্পদ বাড়িতে নেওয়া, ব্যক্তিগত কাজে লাগানো বা কাউকে দিয়ে দেওয়াও একই ধরনের আমানতের লঙ্ঘন। (ইবনে নুজাইম মিসরি, আল–বাহরুর রায়েক শারহু কানজ আদ–দাকায়েক, ৬/১১৯, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৭)
তবে সব রাষ্ট্রীয় সামগ্রী চিরকাল অবিক্রেয়, বিষয়টি এমন নয়। কোনো সম্পদ পুরোনো, অকেজো বা উদ্বৃত্ত হয়ে গেলে কর্তৃপক্ষ বিধিসম্মত পদ্ধতিতে নিলাম, টেন্ডার বা অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় তা বিক্রি করতে পারে। তখন যথাযথ অনুমোদন ও কর্তৃত্ব প্রয়োগ থাকায় বিষয়টি ভিন্ন।
অতএব, নিষেধের কারণ শুধু সম্পদটি সরকারি হওয়া নয়; বরং যার হাতে সম্পদটি রয়েছে, তার বিক্রির বৈধ কর্তৃত্ব আছে কি না, মূল প্রশ্নটি সেখানে। (আলাউদ্দিন কাসানি, বাদায়েউস সানায়ে ফি তারতিব আশ–শারায়ে, ৭/৪২৪, দারুল হাদিস, কায়রো, ২০০৫)
ক্রেতা যদি জানেন যে, সম্পদটি অননুমোদিতভাবে বিক্রি হচ্ছে, তবু সস্তার লোভে কিনে নেন, তাহলে তিনি নিছক ক্রেতা হিসেবে দায়মুক্ত থাকতে পারবেন না। তাঁর অর্থ প্রদান বিক্রেতাকে অবৈধভাবে সম্পদ হাতছাড়া করতে সহায়তা করেছে।
সুতরাং জেনেশুনে এমন কেনাবেচায় অংশ নেওয়া পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতার অন্তর্ভুক্ত হবে। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা একে অপরকে সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ২)
কেউ যদি কোনো পণ্য কেনার সময় বিষয়টি না জানেন এবং পরে জানতে পারেন যে, সেটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ছিল এবং বিক্রেতার তা বিক্রি করার বৈধ অনুমতি ছিল না, তাহলে তা নিজের কাছে রাখা বৈধ হবে না।
তাঁকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের কাছে তা ফেরত দিতে হবে এবং বিক্রেতার কাছ থেকে নিজের প্রদত্ত মূল্য ফেরত নিতে হবে।
কারণ, জনসাধারণের সম্পদের অধিকার জনসাধারণের জন্যই প্রতিষ্ঠিত, কোনো কর্মকর্তা বা কর্তৃপক্ষ নিজের ইচ্ছায় সে অধিকার বাতিল করে অন্য কাউকে তার মালিক বানিয়ে দিতে পারেন না। (শামসুদ্দিন সারাখসি, আল–মাবসুত, ২৩/২০৩, দারুল মারিফাহ, বৈরুত, ১৯৮৯)
যদি ফেরত দেওয়া সম্ভব না হয়, যেমন তা নষ্ট হয়ে গেছে, ব্যবহার হয়ে গেছে বা অন্য কোনো কারণে ফেরত দেওয়ার সুযোগ নেই, তাহলে তার সমজাতীয় বস্তু ফেরত দিতে হবে। সেটিও সম্ভব না হলে তার মূল্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা বৈধ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
অন্যায়ভাবে দখল করা সম্পদের ক্ষেত্রে মূল বস্তু ফেরত দেওয়াই বিধান; তা সম্ভব না হলে সমজাতীয় বস্তু, আর তা–ও সম্ভব না হলে তার মূল্য দেওয়ার বিধান রয়েছে। (আলাউদ্দিন কাসানি, বাদায়েউস সানায়ে ফি তারতিব আশ–শারায়ে, ১০/২২, দারুল হাদিস, কায়রো, ২০০৫)
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা
সূত্র: প্রথম আলো
