শাহজাদপুর সংবাদ

দাউদকান্দি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রসূতি অস্ত্রোপচার বন্ধ, ট্রমা সেন্টারও অচল

২৫ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১১:৫১ AM

দাউদকান্দি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রসূতি অস্ত্রোপচার বন্ধ, ট্রমা সেন্টারও অচল

উপজেলায় হাসপাতাল ও উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসকের ৬০টি পদ থাকলেও কর্মরত আছেন ৩০ জন।

চিকিৎসকের অভাবে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চার মাসের বেশি সময় ধরে প্রসূতি অস্ত্রোপচার বন্ধ আছে। এই উপজেলার একটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রেও প্রায় ছয় বছর ধরে চিকিৎসাসেবা বন্ধ আছে। এর কারণ উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র ভবন ব্যবহারের অনুপযোগী। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে এই উপজেলার আওতাধীন ২০ শয্যার ট্রমা সেন্টারে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের জরুরি চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে না।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, দোনারচর ২০ শয্যার হাসপাতাল, শহীদনগর ২০ শয্যার ট্রমা সেন্টার, ছয়টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং ১০টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র নিয়ে দাউদকান্দিতে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসকের পদ রয়েছে ৬০টি। এর মধ্যে ১৫টি পদ শূন্য। ১২ জন চিকিৎসক সংযুক্তিতে অন্যত্র কর্মরত আছেন। তিনজন চিকিৎসক দীর্ঘদিন ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত। অর্থাৎ উপজেলায় এসব হাসপাতাল ও উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে সব মিলিয়ে এখন চিকিৎসক আছেন ৩০ জন।

রোগীর চাপ বেশি, চিকিৎসক কম

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের পদ আছে ৩৫টি। এর মধ্যে চিকিৎসকের পদ ২০টি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ১২টি, ডেন্টাল সার্জনের ২টি এবং আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকের একটি পদ আছে। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ছয়টি পদ, জরুরি বিভাগের চিকিৎসকের একটি, সহকারী সার্জনের একটি এবং আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকের একটি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। এ ছাড়া পাঁচজন চিকিৎসক অন্যত্র সংযুক্তিতে আছেন।

ত্বকের সমস্যার জন্য গত তিন মাসে একাধিকবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এলেও কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখাতে পারেননি উপজেলার কালাসোনা গ্রামের বাসিন্দা রোকেয়া বেগম ও তালেরছেও গ্রামের কৃষক আশরাফ হোসেন। গত ২২ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে কথা হয় দুজনের সঙ্গে। তাঁরা বলেন, জেলা সদরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা তাঁদের নেই।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মো. রিয়াদ মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, এখানে বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ জন, জরুরি বিভাগে ১৫০ থেকে ২০০ এবং অন্তর্বিভাগে ৬০ থেকে ৮০ জন রোগী চিকিৎসা নেন। চিকিৎসক ও নার্স–সংকটের কারণে প্রতিদিনই বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে।

চার মাসের বেশি সময় ধরে বন্ধ প্রসূতি অস্ত্রোপচার

দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রসূতি চিকিৎসক না থাকায় চার মাসের বেশি সময় ধরে প্রসূতি অস্ত্রোপচার বন্ধ আছে। অস্ত্রোপচার প্রয়োজন, এমন অন্তঃসত্ত্বা নারীদের বেসরকারি হাসপাতালে অথবা ঢাকা ও কুমিল্লায় যেতে হচ্ছে।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, জুনিয়র কনসালট্যান্ট (প্রসূতি) সুস্মিতা সাহা গত ১৪ জুন বদলির আদেশ পেয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলে যান। এর পর থেকে প্রসূতি চিকিৎসকের পদটি শূন্য আছে। এ ছাড়া অবেদনবিদ চিকিৎসক মো. অলি উল্লাহ ২০২১ সালে যোগদানের পর ২০২২ সালে বদলি হয়ে চলে যান। এর পর থেকে ওই পদেও চিকিৎসক নেই।

উপজেলার চশই গ্রামের গৃহবধূ তাকিয়া আক্তার বলেন, গত মাসে অস্ত্রোপচারের জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান তিনি। তবে প্রসূতিবিশেষজ্ঞ না থাকায় অস্ত্রোপচার করাতে পারেননি। পরে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে।

নলচর গ্রামের গৃহবধূ মোমেনা আক্তার (৩০) বলেন, ১ অক্টোবর বিকেলে প্রসূতি অস্ত্রোপচারের জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়েছিলেন। সেখানে প্রসূতি চিকিৎসক না থাকায় পরে উপজেলার আঙ্গাউড়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করাতে হয়। এতে তাঁর ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।

ভবন পরিত্যক্ত, চিকিৎসাসেবা বন্ধ

দাউদকান্দির স্বপাড়া উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভবনটি ১৯৬১ সালে নির্মিত। ২০০৪ সালে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, ২০২০ সালের ২৯ মে ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে চিকিৎসা সহকারী দিদার হোসেন ও কয়েকজন রোগীর ওপর পড়ে। এর পর থেকে সেখানে চিকিৎসাসেবা বন্ধ হয়ে যায়।

স্বপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালাম মুন্সী ও জিন্নত আলী বলেন, স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার দান করা ৭৭ শতাংশ জমিতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি নির্মিত হয়েছিল। ভবনটি দুবার মেরামত করা হলেও এখন আর ব্যবহারের উপযোগী নেই।

সরেজমিনে দেখা যায়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাঁচটি কক্ষ ও বারান্দার ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়েছে। কোথাও কোথাও রড বেরিয়ে এসেছে। দরজা-জানালাও নেই। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, স্বপাড়া ছাড়াও আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষ এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় তাঁদের সেখানে যেতে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তাঁরা নতুন ভবন নির্মাণ করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি চালুর দাবি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে গৌরীপুর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে পাশের আকবর আলী খান কারিগরি কলেজের একটি কক্ষে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।

ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল কর্মকর্তা (সাকমো) আবু ইউসুফ বলেন, পুরোনো ভবনটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বৃষ্টি হলে সেখানে পানি জমে যায়। নিরুপায় হয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে পাশের কারিগরি কলেজের একটি কক্ষে চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নির্ধারিত ভবনটি তালাবদ্ধ দেখে অনেক রোগী সেটি বন্ধ মনে করে ফিরে যান।

চালু হয়নি শহীদনগর ট্রমা সেন্টার

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের জরুরি চিকিৎসা দেওয়ার জন্য দাউদকান্দির শহীদনগরে ২০ শয্যার ট্রমা সেন্টার নির্মাণ করা হয়। তিনতলা ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পাশাপাশি যন্ত্রপাতি ও আসবাব কেনা হয়েছিল। ২০০৬ সালের ৮ অক্টোবর তৎকালীন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন কেন্দ্রটি উদ্বোধন করেন। ২০১০ সালের ৩০ এপ্রিল তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক আবারও এটি উদ্বোধন করেন।

তবে দীর্ঘ সময়েও দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের জন্য পরিকল্পিত জরুরি চিকিৎসাসেবা চালু হয়নি। চিকিৎসক পদায়ন করা হলেও পরে তাঁদের অনেকে অন্যত্র বদলি হয়ে যান। বর্তমানে সেখানে পদায়ন করা একমাত্র আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা নাজমুল আলম মূলত জ্বর, সর্দি ও কাশির রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন। ট্রমা সেন্টারের জন্য পদায়ন করা নার্সদেরও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কাজ করতে হচ্ছে। দুর্ঘটনায় আহত রোগীরা সেখানে গেলে তাঁদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অথবা ঢাকায় যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

সংযুক্তিতে অন্যত্র, শূন্য পদে নিয়োগ নেই

দোনারচর ২০ শয্যার হাসপাতালের ছয়টি চিকিৎসক পদের মধ্যে দুটি দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। বাকি চারজন চিকিৎসকের সবাই সংযুক্তিতে অন্যত্র কর্মরত। তাঁদের মধ্যে জুনিয়র কনসালট্যান্ট (প্রসূতি) আফরোজা আক্তার শিল্পী ২০২১ সালের ২৬ এপ্রিল থেকে, জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেসথেসিয়া) তাসনুভা তানজিল ২০২৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে, আরএমও ফরিদা ইয়াসমিন ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে এবং মেডিক্যাল কর্মকর্তা ইলোরা ইয়াসমিন ২০২৬ সালের ২৪ জুন থেকে অন্য হাসপাতালে সংযুক্তিতে আছেন।

এ ছাড়া বারপাড়া কেন্দ্রের সহকারী সার্জন ফারজানা মালেক ববি ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর থেকে, দাউদকান্দি উত্তর কেন্দ্রের সহকারী সার্জন আয়েশা আফরোজ ২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর থেকে এবং সুন্দলপুর কেন্দ্রের সহকারী সার্জন সেঁজুতি দে ২০২৬ সালের ২১ জুন থেকে সংযুক্তিতে অন্য হাসপাতালে কর্মরত আছেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, উপজেলায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রসূতি ও অবেদনবিদসহ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের একাধিক পদ শূন্য আছে। এসব পদে চিকিৎসক নিয়োগের জন্য তিনি প্রতি মাসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি পাঠাচ্ছেন।

কুমিল্লার সিভিল সার্জন মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত চিকিৎসক ও নার্সদের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে যোগাযোগ করা হয়েছে। ২৮ অক্টোবর ঢাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে দেখা করে বিষয়গুলো তুলে ধরবেন তাঁরা। দীর্ঘদিনের এই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হবে।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ

দাউদকান্দি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রসূতি অস্ত্রোপচার বন্ধ, ট্রমা সেন্টারও অচল | শাহজাদপুর সংবাদ