শাহজাদপুর সংবাদ

পুলিশের জন্য কেনা হবে ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকার গাড়ি

২৪ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১২:৩০ PM

পুলিশের জন্য কেনা হবে ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকার গাড়ি

পুলিশ বাহিনীর জন্য ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ হাজার ৮৩০টি যানবাহন কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে আছে পিকআপ ভ্যান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য জিপ, সদস্যদের যাতায়াতের জন্য শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস ও মিনিবাস এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ধরনের বিশেষায়িত যানবাহন।

পুলিশের যানবাহনসংকট দূর করতে দুটি প্রকল্প নিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এর মধ্যে পুলিশের অভিযান পরিচালনা–সংক্রান্ত সাধারণ যানবাহন কেনার জন্য ৪ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা এবং বিশেষায়িত যানবাহনের জন্য ২ হাজার ২৮১ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ দুটি প্রকল্পের আওতায় ৫ হাজার ৮৩০টি যানবাহন কেনা হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৪ সালের ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে পুলিশের বিপুলসংখ্যক যানবাহন পুড়ে নষ্ট ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুরোনো অনেক গাড়িও অভিযানের সময় বিকল হয়ে পড়ে। এ ছাড়া পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামো ও সাজসরঞ্জাম তালিকায় (টিওঅ্যান্ডই) প্রয়োজনীয় যানবাহনের ঘাটতি রয়েছে। এসব কারণে নতুন যানবাহন কেনা জরুরি।

তবে এত বিপুল অর্থের জোগান দেওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে পরিকল্পনা কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের। তাঁদের মতে, যানবাহন কেনার পাশাপাশি জ্বালানি, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বহনের পরিকল্পনাও থাকতে হবে। কেনাকাটার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং নতুন যানবাহনের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্প দুটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে। অনুমোদন পেলে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

‘বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অপারেশনাল যানবাহন ক্রয়’ প্রকল্পে ৪ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ হাজার ৮২৯টি যানবাহন কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২ হাজার ৯০৯টি ডাবল কেবিন পিকআপ। প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ৮৬ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে এ খাতে ব্যয় হবে ২ হাজার ৫০১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য ২ হাজার ৭০০ সিসির ৪০০টি জিপ কেনার প্রস্তাব রয়েছে। প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এ খাতে ব্যয় হবে ৬৭৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া ২ হাজার সিসির ৩৪৫টি জিপ কেনা হবে। প্রতিটির দাম ৭৫ লাখ টাকা হিসাবে ব্যয় হবে প্রায় ২৫৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। দুই ধরনের জিপ মিলিয়ে কেনা হবে মোট ৭৪৫টি।

এ প্রকল্পে ৫২ লাখ টাকা দরে ২১৪টি মাইক্রোবাস কেনারও পরিকল্পনা রয়েছে। এতে ব্যয় হবে প্রায় ১১১ কোটি ২৮ লাখ টাকা।

পুলিশ সদস্যদের যাতায়াতের জন্য নন–এসি বড় বাস ও শীতাতপনিয়ন্ত্রিত মিনিবাস কেনা হবে। খসড়া প্রস্তাবে ৫২ লাখ টাকা দরে ১৪৮টি নন–এসি বড় বাস এবং ১ কোটি ২০ লাখ টাকা দরে ১৪৮টি এসি মিনিবাস কেনার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া ৯৫ লাখ টাকা দরে ১১৫টি প্রিজন ভ্যান, ৬৫ লাখ টাকা দরে ১০০টি প্যাট্রোল কার এবং ৫৫ লাখ টাকা দরে ৫০টি অ্যাম্বুলেন্স কেনার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০০টি স্পিডবোট কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এ ছাড়া এই প্রকল্পের আওতায় আরও প্রায় ৩০০টি যানবাহন কেনার প্রস্তাব রয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পুলিশ সদর দপ্তরের প্রাক্কলন কমিটি এসব যানবাহনের দাম নির্ধারণ করেছে। পাঁচ সদস্যের এ কমিটিতে পুলিশের চার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যন্ত্রকৌশল বিভাগের এক সহকারী অধ্যাপক আছেন।

‘বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষায়িত যানবাহন ক্রয়’ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ২৮১ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের মাধ্যমে এক হাজার একটি বিশেষায়িত যানবাহন কেনা হবে। পুলিশের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করাই প্রকল্পটির উদ্দেশ্য।

শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষসহ বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১টি আর্মড পারসোনেল ক্যারিয়ার (এপিসি) কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। জনশৃঙ্খলা রক্ষা ও উত্তেজিত জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণে ১০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ২০টি ওয়াটার ক্যানন কেনা হবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২৮ কোটি টাকা।

জনসমাবেশ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০টি ক্রাউড কন্ট্রোল ভেহিকেল কেনারও পরিকল্পনা রয়েছে। পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের জন্য ১৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫টি সোয়াট ভ্যান কেনা হবে।

জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত অভিযান পরিচালনার জন্য ৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০০টি বিশেষায়িত প্যাট্রোল কার কেনার প্রস্তাব রয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের নিরাপত্তাবেষ্টিত অবস্থায় পরিবহনের জন্য ৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩টি বিশেষায়িত ভ্যান কেনা হবে। এ ছাড়া গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের থানা থেকে আদালতে এবং আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার জন্য ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৫টি প্রিজন ভ্যান কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।

উচ্চগতিতে চলাচলের উপযোগী ২০০টি মোটরসাইকেল কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬০ কোটি টাকা। পুলিশের প্রশিক্ষিত কুকুর পরিবহনের জন্য ৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫০টি ইউটিলিটি টেরেইন ভেহিকেল কেনা হবে। আর দুর্গম এলাকায় অভিযান ও টহলের জন্য ৫০টি অল টেরেইন ভেহিকেল এবং পাহাড়ি এলাকায় চলাচলের জন্য ১০০টি হিল মোটরসাইকেল কেনার প্রস্তাব রয়েছে।

পুলিশের গোয়েন্দা কার্যক্রম ও মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য ছয়টি মোবাইল সার্ভিল্যান্স গাড়ি কেনা হবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৪ কোটি টাকা।

উপকূলীয়, নদী ও পাহাড়ি এলাকায় দ্রুত চলাচলের জন্য ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫টি কুইক রেসপন্স বোট বা স্পিডবোট কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। পানিতে আটকে পড়া মানুষ ও দুর্ঘটনায় পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধারে আরও ১৫টি রেসকিউ বোট কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিভিন্ন ইউনিটের কমান্ডারদের মাঠপর্যায়ে যাতায়াতের জন্য ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০৫টি কমান্ডারস সাব–আরবান ভেহিকেল কেনা হবে। মৃতদেহ পরিবহনের জন্য ৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮০টি ফ্রিজার ভ্যান কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচন, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সমাবেশে পুলিশ সদস্যদের ব্যবহারের জন্য ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮০টি স্মল ডিপ্লয়মেন্ট ইউটিলিটি ভেহিকেল কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

পুলিশের আনুষ্ঠানিকতা ও প্রশিক্ষণের কাজে ঘোড়া পরিবহনের জন্য বিশেষ ধরনের ১০টি যানবাহন কেনা হবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ কোটি টাকা।

এ ছাড়া এই প্রকল্পের আওতায় আরও প্রায় ৫৬টি যানবাহন কেনার প্রস্তাব রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রসচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ বাহিনীর যেসব সদস্য জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যাবেন, তাঁদের জন্যও কিছু বিশেষায়িত যানবাহন কেনা হচ্ছে। এ বাবদ যে অর্থ ব্যয় হবে, তা জাতিসংঘ পরবর্তী সময়ে পরিশোধ করবে।

প্রকল্প দুটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ৯ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির সভাপতি ছিলেন পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) মুশফেকুর রহমান।

ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের সময় সারা দেশে পুলিশের ৪৫৫টি যানবাহন পুড়ে যায় এবং মোট ১ হাজার ৭৪টি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এসব ক্ষয়ক্ষতির পর পুলিশের যানবাহনসংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, যানবাহনের ঘাটতির কারণে নিয়মিত অভিযান ও টহল পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। পুরোনো গাড়ি প্রায়ই অভিযানের মাঝপথে বিকল হয়ে যায়। নতুন যানবাহন পেলে এ সমস্যা কমবে এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।

স্বরাষ্ট্রসচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের প্রচুর গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সারা দেশে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে পুলিশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাদের চাহিদা অনেক বেশি। এ কারণে বেশি করে পিকআপ কেনা হচ্ছে।

বিপুলসংখ্যক গাড়ি কেনার পর সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ কীভাবে হবে, জানতে চাইলে সচিব বলেন, গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পুলিশের নিজস্ব ব্যবস্থা রয়েছে। তবে গাড়িগুলোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমেরও ভূমিকা রয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রাজস্ব আদায়ের বর্তমান পরিস্থিতিতে আগামী তিন বছরে এত বিপুল অর্থের জোগান দেওয়া সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এ ছাড়া জিপ কেনার ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

বিপুলসংখ্যক যানবাহন কেনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। যানবাহনের জ্বালানি, মেরামত, যন্ত্রাংশ, টায়ার, বিমা ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় কীভাবে মেটানো হবে, তার স্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। বিশেষায়িত যানবাহনের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি। এসব বিষয় নিয়েও পরিকল্পনা কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আলোচনা চলছে।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ