শাহজাদপুর সংবাদ

তিন ফাঁদে আটকে গেছে দেশের অর্থনীতি

১৮ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১১:২০ AM

তিন ফাঁদে আটকে গেছে 
দেশের অর্থনীতি

দেশের অর্থনীতি তিনটি কাঠামোগত ফাঁদে পড়েছে। প্রথম ফাঁদ হচ্ছে পরিবারের আর্থিক দুর্দশা বাড়ছে। এ কারণে ঋণ করে ও সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে একটি শ্রেণি। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে গেছে; আর তৃতীয়টি হচ্ছে, রাজনৈতিক-প্রশাসনিক শাসনব্যবস্থার ফাঁদ। পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এই তিন ফাঁদ অর্থনীতিকে গভীর সংকটে ফেলেছে। এমন পর্যবেক্ষণ দিয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)।

সংস্থাটি বলেছে, অর্থনীতি আটকে রয়েছে ‘উচ্চ দারিদ্র্য-নিম্ন বিনিয়োগ-নিম্ন প্রবৃদ্ধি’র ফাঁদে। এসব ফাঁদে পড়ে দারিদ্রে৵র হার বাড়ছে, কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের চাপ ও প্রাতিষ্ঠানিক হয়রানি চলছে। আর তার ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। তাই টেকসই অর্থনৈতিক উত্তরণের জন্য এই কাঠামোগত ফাঁদ ভাঙা অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে মনে করে পিপিআরসি।

পিপিআরসি প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের প্রকৃত অর্থনীতির অবস্থা: দারিদ্র্যের পুনরাবির্ভাব ও টিকে থাকার সক্ষমতার গতিশীলতা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এ কথাগুলো বলা হয়। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস (১৭ অক্টোবর) উপলক্ষে গতকাল শনিবার এ প্রতিবেদন বই আকারে প্রকাশ করা হয়। ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে গতকাল সকালে আয়োজন করা হয় বইটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের। গত বছরের মে মাসে দেশের ৮ বিভাগের গ্রাম ও শহরের ৮ হাজার ৬৭টি পরিবারের ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছিল। প্রতিবেদনটি বই আকারে প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন পিপিআরসি নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান ও সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী নামিরা শামীম।

অনুষ্ঠানে নির্ধারিত আলোচক ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক, একশনএইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির এবং বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেম। স্বাগত বক্তব্য দেন পিপিপিআরসির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সৈয়দ এম হাশেমী।

অনুষ্ঠানে হোসেন জিল্লুর রহমান বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং সংস্কারহীন প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত ফাঁদের কথা স্বীকার করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, একদিকে মানুষের ঋণের বোঝা বাড়ছে। অন্যদিকে বিনিয়োগ হচ্ছে না। এর জন্য অর্থের সংকট নয়; বরং আস্থার সংকটই প্রধানত দায়ী।

অর্থের অপচয়কে অর্থনীতির জন্য আরেক বড় সমস্যা উল্লেখ করে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, গরিব দেশ, অথচ ভবন তৈরি হচ্ছে; কিন্তু ব্যবহার করা হচ্ছে না। দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি হচ্ছে; কিন্তু পড়াশোনা নেই। এ কারণে বাইরে থেকে লোক এনে কারখানা চালাতে হচ্ছে। তাই দেশের জন্য দরকার এখন গুণগত মানের শিক্ষায় জোর দেওয়া।

অর্থনীতির প্রথম ফাঁদের ব্যাখ্যা দিয়ে পিপিআরসি বলেছে, কাজ করেও অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় আয় করতে পারছে না। সংসারের আয় ও ব্যয়ের পার্থক্য এত কম যে সামান্য ধাক্কা সামলানোর মতো সঞ্চয়ও থাকছে না অনেক পরিবারের। পিপিআরসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ১৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ পরিবার এখন ‘ভঙ্গুর মধ্যবিত্ত’। দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকলেও এই শ্রেণির মানুষদের ব্যয় করার সক্ষমতা কম। এমন মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ১০ লাখ। তাঁদের অর্ধেকের বেশি পরিবারের ঋণ সঞ্চয়ের চেয়ে বেশি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালে দেশের ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ মানুষ উচ্চ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল। অথচ ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপে এ হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সময়ে চরম দারিদ্র্য ৫ দশমিক ৬ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

পিপিআরসির জরিপে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মধ্যবিত্ত একটি পরিবারের গড় মাসিক আয় ৩২ হাজার ৬৮৫ টাকা; আর ব্যয় ৩২ হাজার ৬১৫ টাকা। তাতে মাস শেষে হাতে থাকে মাত্র ৭০ টাকা। সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ পরিবারের গড় মাসিক আয় ৮ হাজার ৪৭৭ টাকা হলেও ব্যয় ১২ হাজার ২৯৪ টাকা। ঘাটতি মেটাতে এসব পরিবারকে হয় ঋণ করতে হচ্ছে, না হয় সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে। এ ছাড়া সর্বনিম্ন আয়ের ৪০ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় ১৫ হাজার টাকার কম। তার বিপরীতে এসব পরিবারের ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশ অর্থ খাবারের পেছনে চলে যায়। ফলে শিক্ষা, যাতায়াত ও চিকিৎসায় ব্যয় করার টাকা থাকে না তাদের। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৭ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, চিকিৎসার ব্যয় তাদের আর্থিক সংকটের অন্যতম কারণ।

পিপিআরসির প্রতিবেদনে বিনিয়োগ পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসের তথ্য তুলে ধরে পিপিআরসি বলছে, প্রবৃদ্ধির ধীরগতির পাশাপাশি বিনিয়োগে দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। গত অর্থবছরে বেসরকারি ও সরকারি উভয় বিনিয়োগই কমেছে। নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ১৫ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কমেছে নতুন মূলধন বিনিয়োগ, ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ। বিনিয়োগের এই স্থবিরতা দীর্ঘায়িত হলে নতুন শিল্প গড়ে ওঠা, উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ সীমিত হতে পারে। ফলে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং উৎপাদনশীল খাতে পুঁজিপ্রবাহ বাড়ানোও অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মত দেয় সংস্থাটি।

সংস্থাটি বলছে, দেশে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের উদ্যোগ বেশি থাকলেও সেগুলোকে বড়, উৎপাদনশীল ও স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের সুযোগ সীমিত। নতুন ব্যবসা হলেও সেগুলো পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান ও আয় তৈরি করতে পারছে না। শিক্ষিত তরুণদের দক্ষতার সঙ্গে চাকরির চাহিদার অমিলও সমস্যা বাড়াচ্ছে। এ অবস্থা অর্থনীতির জন্য এমন এক ফাঁদ, যেখানে মানুষ কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও উন্নত জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় আয় ও নিরাপত্তা পাচ্ছেন না।

পিপিআরসি বলেছে, দারিদ্র্য থেকে টেকসই উত্তরণের পথে বড় বাধা রাজনৈতিক ও শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা, ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধি, রাজনৈতিক প্রভাবাধীন অর্থায়ন ও সরকারি ব্যয়ে অদক্ষতার একটি ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছিল।। গণ-অভ্যুত্থানের পরও এই ব্যবস্থার বড় অংশ এখনো টিকে আছে। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে আসায় সরকারের উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় করার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ঋণনির্ভর উন্নয়ন কৌশল ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়িয়ে বাজেটের ওপর বাড়তি বোঝা তৈরি করেছে।

পিপিআরসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, খামখেয়ালি ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা রাজস্ব ফাঁকি, ব্যবসায়িক হয়রানি এবং অন্যায্য সুবিধা আদায়ের সুযোগ বাড়াচ্ছে। এসব দুর্বলতা কাটাতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি হলেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে সে উদ্যোগের আগ্রহ কম। রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণ দেওয়া ও নিয়মকানুন প্রয়োগের দুর্বলতার কারণে বেড়েছে খেলাপি ঋণ। ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি হার বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে।

অর্থনীতির এসব ফাঁদ থেকে উত্তরণের জন্য পাঁচটি অগ্রাধিকার তুলে ধরেছে পিপিআরসি। তার প্রথমটি হচ্ছে, অর্থনৈতিক গণতন্ত্র এবং সবার জন্য ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। এ–সংক্রান্ত ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এটি নিশ্চিত করা গেলে ব্যবসা, ঋণ, লাইসেন্স, জমি ও সরকারি চুক্তির জন্য বিশেষ সুবিধা বা বিবেচনানির্ভর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে হবে না। দ্বিতীয়ত, প্রবৃদ্ধির জন্য নতুন চালক তৈরির পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। পিপিআরসি বলছে, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধশিল্প, হালকা প্রকৌশল, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরবরাহব্যবস্থা, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবহন-সরবরাহসেবা ও পরিচর্যাসেবাকে প্রবৃদ্ধির নতুন চালক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।

তৃতীয়ত, মানসম্মত শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছে সংস্থাটি। সংস্থাটির মতে, শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি নয়, মৌলিক শিক্ষা, কারিগরি দক্ষতা, ডিজিটাল জ্ঞান এবং নিয়োগদাতাদের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ বাড়াতে হবে।

চতুর্থত, ক্ষুদ্র উদ্যোগকে বড় ও রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার পথ করে দেওয়া আর পঞ্চমত, দ্রুত ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলা। অর্থাৎ সরকারি সেবা হতে হবে স্বচ্ছ, সময়সীমাবদ্ধ ও ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বিত।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশে আয় বৈষম্য দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে এবং প্রবৃদ্ধি আগের মতো মানুষকে দ্রুত দারিদ্র্যমুক্ত করতে পারছে না। এ ছাড়া নানা ক্ষেত্রে হয়রানির কারণে অনেক রপ্তানিকারক রপ্তানি করাই ছেড়ে দেন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, যে বৈষম্য দূর করার জন্য জুলাইয়ে আন্দোলন হয়েছিল, নীতিনির্ধারকদের কাছে তা অর্থবহ হচ্ছে না।

এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, ‘২০ বছর ধরে পোশাক খাত ছাড়া অন্য কোনো খাত দাঁড়াতে পারেনি। অন্যদিকে ডিগ্রি এখন চাকরির নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের পরিচালক জ্যঁ পেম বলেন, অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় বাণিজ্য, সরকারি অর্থায়ন ও জ্বালানি–দক্ষতা বাড়াতে কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন।

একশনএইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, দুর্নীতি ও হয়রানির স্বাভাবিকীকরণ বহাল রেখে দেশে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, সন্দেহ হয়।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ