শাহজাদপুর সংবাদ

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি: কে বহন করবে এই বোঝা

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১১:১৭ AM

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি: কে বহন করবে এই বোঝা

জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু পেট্রলপাম্পে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর অভিঘাত অর্থনীতির প্রায় সব খাতে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়বে। মূল্যস্ফীতি কয়েক বছর ধরেই বেশি। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা চাপের মুখে; সেই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো। ফলে উদ্বেগ যে কেবল জ্বালানির বাড়তি দাম, তা নয়; বরং বড় প্রশ্ন হলো, এর পরোক্ষ প্রভাবে পরিবহন, খাদ্য, কৃষি, শিল্প ও সেবা খাত হয়ে সামগ্রিক মূল্যস্তরে কতটা চাপ সৃষ্টি হবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, মূল্যস্ফীতির এই নতুন চাপ সামাল দেওয়ার বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট কৌশল আছে, তা দেখা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ডিজেলের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে ডিজেলের ব্যবহার হয়। তাই ডিজেলের দাম বাড়লে প্রথমেই পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ে। বাস ও ট্রাক পরিচালনার ব্যয় বাড়ে, সেচের খরচ বাড়ে, জেনারেটর ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি চালানোর ব্যয়ও বেড়ে যায়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সাধারণত এই বাড়তি খরচের পুরোটা নিজেরা বহন করে না। সময়ের সঙ্গে এর একটি বড় অংশ পণ্যের দামের মাধ্যমে ভোক্তার ওপর চলে আসে।

খাদ্য মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। কৃষিপণ্য উৎপাদন থেকে বাজারজাত করা পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ধাপে পরিবহন, সেচ ও সরবরাহ খরচ জড়িত। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে একই সঙ্গে কয়েকটি ব্যয়ের উৎসে চাপ তৈরি হয়। এর সঙ্গে ব্যবসায়ী, পরিবহনমালিক ও শ্রমিকেরা যদি মনে করেন ভবিষ্যতে দাম আরও বাড়তে পারে, তাহলে সমস্যা আরও জটিল হতে পারে। তখন তাঁরা আগে থেকেই পণ্যের দাম ও মজুরি সমন্বয় শুরু করেন। এতে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে; পরবর্তীকালে তা নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

এর সামাজিক প্রভাবও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তুলনামূলক ধনী পরিবার হয়তো সরাসরি বেশি জ্বালানি ব্যবহার করে, কিন্তু নিম্ন আয়ের পরিবার অনেক সময় পরোক্ষভাবে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে। কেননা তাদের আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয় খাদ্য, যাতায়াত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে। বাসভাড়া কিছুটা বৃদ্ধি, চাল বা সবজির মূল্যবৃদ্ধি কিংবা রান্নার খরচ বেড়ে যাওয়াই তাদের মাসিক বাজেটে বড় চাপ তৈরি করতে পারে। শহরের নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ, ডিজেলনির্ভর সেচব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল কৃষক পরিবার ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক—তাঁদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। দেখা যায়, এদের সিংহভাগের আয় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমান হারে বাড়ে না। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে শেষ পর্যন্ত এই শ্রেণির মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়।

এ কথাও ঠিক, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অনেক বেড়ে গেলে সরকার অনির্দিষ্টকাল ধরে ভর্তুকি দিয়ে যেতে বা ভোক্তাকে এই চাপ থেকে পুরোপুরি মুক্ত রাখতে পারে না। বড় অঙ্কের ভর্তুকির কারণে সরকারের আর্থিক পরিস্থিতির ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের দায় বেড়ে যায়; স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা বা অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয়ের সুযোগ কমে যেতে পারে। তাই মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে।

কিন্তু হয় ভর্তুকি দিতে হবে, নয়তো দাম বাড়াতে হবে—সমস্যাটি শুধু এই দুটি বিকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা ঠিক হবে না। জ্বালানি খাতের ভেতরের অদক্ষতা নিয়েও সমান গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। এই খাতে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, ক্রয় ও বিতরণব্যবস্থার অদক্ষতা, সীমিত স্বচ্ছতা ও জ্বালানির ওপর বিভিন্ন ধরনের কর ও শুল্কের চাপ আছে। অথচ যখন দাম বাড়ানো হয়, তখন এসব বিষয় নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা হয়। খাতটির নিজস্ব ব্যয় ও অদক্ষতা কমানোর চেষ্টা না করে যদি নিয়মিতভাবে খুচরা মূল্য বাড়ানো হয়, তাহলে ভোক্তার ওপর কার্যত সেই অদক্ষতার বোঝাই চাপানো হয়।

জ্বালানি তেলের ওপর করের বিষয়টিও নতুন করে দেখা দরকার। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে গেলে একই সঙ্গে যদি দেশে উচ্চ করভার বহাল থাকে, তাহলে ভোক্তার ওপর দ্বিগুণ চাপ পড়ে। সরকারের রাজস্বের প্রয়োজন অবশ্যই আছে। প্রশ্ন হলো, যখন টানা কয়েক বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, তখন জ্বালানির ওপর করের বর্তমান কাঠামো কতটা যৌক্তিক। বিশেষ করে ডিজেলের মতো পণ্যে, যার দামের সঙ্গে প্রায় সব ধরনের পণ্য ও সেবার ব্যয়ের সম্পর্ক আছে। এ পরিস্থিতিতে করনীতি শুধু রাজস্ব আহরণের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে চলবে না, তার সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাবও দেখতে হবে।

এই মূল্যবৃদ্ধির সময়ও অর্থনীতির জন্য সুবিধাজনক নয়। একদিকে ঋণের ব্যয় বেশি, ব্যবসায় অর্থায়ন কঠিন; অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ চাহিদাও দুর্বল। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বাড়লে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মুনাফার ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে। বড় প্রতিষ্ঠান কিছুটা সামলে নিতে পারলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের সেই সক্ষমতা কম। অনেক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ স্থগিত করতে পারে, উৎপাদন কমাতে পারে কিংবা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতে পারে। রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোও এর প্রভাবমুক্ত নয়। জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলে দেশের ভেতরে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে, ফলে তাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

তাই নীতিগত প্রতিক্রিয়া কেবল দাম বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। প্রথমত, জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য পদ্ধতি প্রয়োজন। লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক বাজারের সাময়িক মূল্যবৃদ্ধি ও দেশের অভ্যন্তরের স্থায়ী ব্যয়চাপ পৃথক করা। দ্বিতীয়ত, জ্বালানির ওপর কর ও শুল্কের কাঠামো পর্যালোচনা করা দরকার। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের পরিচালনব্যবস্থা, ক্রয়পদ্ধতি ও বিতরণব্যবস্থায় কোথায় অদক্ষতা আছে, তা খোলামেলাভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে সহায়তার ধরনও বদলাতে হবে। সবার জন্য নির্বিচার জ্বালানি সস্তা রাখার পরিবর্তে নিম্ন আয়ের পরিবার, কৃষি ও প্রয়োজনীয় গণপরিবহন খাতকে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়া তুলনামূলকভাবে কার্যকর হতে পারে। এতে রাজস্ব ব্যয়ের চাপ কমবে, আবার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীও কিছুটা সুরক্ষা পাবে।

শেষ পর্যন্ত জ্বালানির মূল্য সমন্বয় শুধু হিসাবের বিষয় নয়, বিষয়টি বণ্টনেরও প্রশ্ন। সরকারের আর্থিক চাপ কিছুটা কমানো প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সেই চাপ কমানোর খরচ কার ওপর পড়ছে, তা–ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, করকাঠামোর পর্যালোচনা ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার ব্যবস্থা ছাড়া শুধু মূল্যবৃদ্ধির পথে হাঁটলে সরকারের হিসাব হয়তো কিছুটা সহজ হবে। কিন্তু নানাভাবে এর মূল্য দিতে হতে পারে, যেমন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, বৈষম্য আরও বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি; সর্বোপরি দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।

সেলিম রায়হান: অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

নির্বাহী পরিচালক, সানেম

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ