ছুটির দুই দিনেই বাংলাদেশের টেস্ট হার
২৩ আগস্ট, ২০২৬ এ ১১:৫৮ AM

দুই দিনে হারিয়ে দেব, এক দিনে হারিয়ে দেব—অস্ট্রেলিয়ায় খেলতে এসে এ রকম হুমকি আগেও পেয়েছে বাংলাদেশ দল। পেয়েছিল এবারও। ডারউইনের প্রথম টেস্টে উল্টো বাংলাদেশই জিতে যায় চতুর্থ দিন শেষ হওয়ার আগে। কিন্তু নতুন টেস্ট ভেন্যু ম্যাকাইয়ে অস্ট্রেলিয়া আর ছাড়ল না বাংলাদেশকে।
গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায় টেস্ট শুরু হয়েছিল কাল, ম্যাচটা শেষ হয়ে গেল আজ চা বিরতির পর আর তিন বলের মধ্যেই। ডারউইনে না পারলেও ম্যাকাইতে এসে শেষ পর্যন্ত দুই দিনে বাংলাদেশকে টেস্ট হারানোর হুমকিটাই বাস্তবায়ন করে দেখাল অস্ট্রেলিয়া। এই প্রথম দুই দিনে টেস্ট হেরেছে বাংলাদেশ।
নিজেদের মাঠের অভিষেক টেস্ট দেখার জন্য তাই কোনো কর্মদিবস নষ্ট করতে হলো না ম্যাকাইবাসীকে। শনি ও রবি দুই দিন সাপ্তাহিক ছুটি। এই দুই দিনেই কেল্লাফতে করে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া দল। ম্যাকাইয়ের জয়ে সিরিজটাও তারা ড্র করল ১-১ এ।
মাত্র দুই দিনে টেস্ট ম্যাচে ফলাফল হয়ে যাওয়ার এটি ২৮তম ঘটনা। সর্বশেষ গত বছরের অ্যাশেজে পার্থ ও মেলবোর্নে দুটি টেস্ট দুই দিনে শেষ হয়েছিল। প্রথম ইনিংসে ৬৪ রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ অলআউট হয়েছে ৯৫ রানে।
অর্থাৎ দুই ইনিংসেই এক শ’র কম রান, টেস্ট ক্রিকেট যেটি দেখল ২১ বছর পর। দুই ইনিংসেই কোনো দলের এক শর নিচে অলআউট হওয়ার ১৮টি ঘটনার মধ্যে সর্বশেষটি ছিল ২০০৫ সালের আগস্টে। হারারেতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জিম্বাবুয়ে গুটিয়ে গিয়েছিল ৫৯ ও ৯৯ রানে।
অবাক করা ব্যাপার হলো, এই টেস্টটাই কিনা বাংলাদেশ খেলতে নেমেছিল অস্ট্রেলিয়াকে ১৩৯ বছর পর ঘরের মাঠে টেস্ট সিরিজে ধবলধোলাইয়ের স্বাদ দিতে! ম্যাকাইয়ের উইকেট ভয়ংকর রকমের পেস বান্ধব।
প্রথম ইনিংসে মিচেল স্টার্কের আগুনে পুড়ে মাত্র ৬৪ রানে অলআউট হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। এরপর বাংলাদেশের বাঁহাতি পেসার শরীফুল ইসলামের তাণ্ডবে অস্ট্রেলিয়াও প্রথম দিন শেষ করে ৮ উইকেটে ১৬৫ রান নিয়ে।
আজ সকালে ৫৪ মিনিট ব্যাটিং করে বাকি ২ উইকেট হারিয়ে অস্ট্রেলিয়া যোগ করতে পেরেছে আর ৪৫ রান। প্রথম ইনিংসে ২১০ রান করে লিড ১৪৬ রানের, যাতে বেশি অবদান প্রথম টেস্টের সেঞ্চুরিয়ান ক্যামরন গ্রিনের ১০৫ বলে ৬৭ রানের ইনিংসের। নাথান লায়ন ৩২ রানে অপরাজিত ছিলেন ৬২ বল খেলে।
কাল ৬ উইকেট পাওয়া শরীফুল আজ সকালে গ্রিনকে ফিরিয়েছেন ইনসুইং ইয়র্কারে এলবিডব্লুর ফাঁদে ফেলে। বাংলাদেশের প্রথম পেসার হিসেবে ৭ উইকেট পেলেন এই বাঁহাতি। এর আগে ২০০৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ২৭ রানে ৬ উইকেট পেয়েছিলেন শাহাদাত হোসেন, সেটিই এত দিন ছিল টেস্টে বাংলাদেশের কোনো পেসারের সেরা বোলিং ফিগার। শরীফুল রেকর্ডটা ভাঙলেন দেড় যুগ পর।
কাল প্রথম দিনে প্রথম ইনিংসে ৬৪ রানে অলআউট হওয়ার পর আজ দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ অলআউট হওয়ার আগে করেছে ৯৫ রান। দুই ইনিংসে মিলিয়েও তারা ছুঁতে পারেনি অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে ২১০ রান। দুই দিনেই হার ইনিংস ও ৫১ রানের ব্যবধানে।
অস্ট্রেলিয়াকে আরেকবার ব্যাট করাতে হলে দ্বিতীয় ইনিংসে অন্তত ১৪৬ রান করতে হতো বাংলাদেশকে। ইনিংসের প্রথম বলেই স্টার্ককে স্ট্রেট ড্রাইভে চার মেরে শুরুটা সুন্দরই করেছিলেন ওপেনার তানজিদ হাসান। কিন্তু ওই শুরুই সব নয়। ইনিংসের কোনো পর্যায়েই আসলে খুব জোরালোভাবে আশা জাগেনি যে, বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে আবার ব্যাট করাতে পারবে, এড়াতে পারবে ইনিংস হার।
মাত্র ২৪ রানে ৩ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর থেকেই ক্ষণ গণনার শুরু—কখন শেষ হবে খেলা! বাংলাদেশ কি পারবে টেস্টটাকে টেনে টুনে তৃতীয় দিনে নিতে! অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য শহর থেকে অনেক বাংলাদেশি ম্যাকাইয়ে এসেছেন খেলা দেখতে।
তাদেরও নানান হিসাব-নিকাশ। অবশ্য এমন সান্ত্বনাও অনেকে নিজেদের দিয়েছেন যে, বাংলাদেশ তো ডারউইনে চার দিনে টেস্ট জিতেছে। ম্যাকাইয়ে অস্ট্রেলিয়া না হয় আরেকটু আগে জিতল। সিরিজ তো তারপরও বাংলাদেশ ড্র-ই করবে! অস্ট্রেলিয়া সিরিজ জিততে পারবে না।
তবে এটাও ঠিক, প্রথম ইনিংসের কিছু আউটের মতো দ্বিতীয় ইনিংসের আউটগুলোও সান্ত্বনার পরিবর্তে একপর্যায়ে নিয়ে আসে আফসোস। আরেকটু তো ভালো খেলতে পারত বাংলাদেশ! টেস্টটা তৃতীয়-চতুর্থ দিনে নেওয়ার মতো ব্যাটিং কি করা যেত না!স্টার্ক এই ইনিংসে আঘাত আনেন নিজের দ্বিতীয় ও ইনিংসের তৃতীয় ওভারে। ওভারের দ্বিতীয় বলে আউট ওপেনার সাদমান ইসলাম। শর্ট পিচ ধরনের বলটা বাউন্স করে বেরিয়ে যাওয়ার সময় যেন কিছু বুঝতেই পারলেন না সাদমান। ব্যাটের কানায় লেগে পয়েন্টে ক্যাচ তুলে দেন মারনাস লাবুশেনের হাতে।
পরের বলেই অদ্ভুত এক কাণ্ড করলেন মুমিনুল হক। অফ স্টাম্পের ওপর বল, দোটানায় ভুগে সেটাই কিনা ছেড়ে দিলেন! আগের দিন অফ স্টাম্পের বেশ বাইরে ছেড়ে দেওয়ার মতো বলে ব্যাট চালিয়ে দিয়েছেন ক্যাচ, আর আজ স্টাম্পের বল ছেড়ে হলেন বোল্ড।
প্রথম ইনিংসের মতো এই ইনিংসেও হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা জাগিয়ে তা পাননি ক্লার্ক। তবে ৪ উইকেট নিয়ে এই ইনিংসেও বাংলাদেশকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কাজটা করেছেন তিনিই। অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স ফিল্ডিংও সাজিয়েছিলেন বেশ আক্রমণাত্মক। উইকেটকিপার, স্লিপ, গালি মিলিয়ে কখনো কখনো ৭ জন ফিল্ডারও দেখা গেছে উইকেটের পেছনে।
অষ্টম ওভারে কামিন্সের বাউন্সারে ক্যাচ তোলেন তানজিদ। শর্ট বলে বাউন্স উঠতেই দায়সারা ভঙ্গিতে পুল শট, লং লেগে স্টার্কের হাতে সহজ ক্যাচ। পুল-হুকের জন্য অস্ট্রেলিয়ার পাতা ফাঁদেই যেন পা দিলেন তিনি। লাঞ্চটা ওই ৩ উইকেটে ৩৯ রান নিয়েই করতে গিয়েছিল বাংলাদেশ।
কিন্তু চা বিরতির আগেই পড়ে যায় আরও ৫ উইকেট। ৮ উইকেটে ৯৫ রান করে চা বিরতিতে যাওয়া বাংলাদেশ তখনো পিছিয়ে ৫১ রানে। কিন্তু চা বিরতির পর নাথান লায়নের করা প্রথম ওভারের প্রথম বলে তাসকিন ও তৃতীয় বলে শরীফুলের আউটে খেলা শেষ ওখানেই। দ্বিতীয় দিনের শেষ সেশন প্রায় পুরোটাই তখনো বাকি।
এর আগে লাঞ্চের পর ২১তম ওভারে নাজমুল লায়নের বলে সোজা ক্যাচ তুলে দিয়েছেন লং অফে স্টার্কের হাতে। ওই ওভারেরই দ্বিতীয় বলেও একবার সামনে এগিয়ে মারতে গিয়েছিলেন তিনি। শেষ বলে আউটও হয়েছেন বড় শটের আশায় মেরেই।
সিরিজের চার ইনিংসের তিনটিতেই ০ করা লিটন দাস স্টার্কের বলে খোঁচা মেরে ক্যাচ দেন স্লিপে। মেহেদী হাসান মিরাজ ক্যাচ তোলেন অফ স্টাম্পের বেশ বাইরের বলে মারতে গিয়ে। ম্যাকাইয়ের উইকেটে ব্যাটিংটা আসলেই কঠিন ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের আউটের ধরনগুলোর জন্য উইকেট আসলে কতটা দায়ী, অস্ট্রেলিয়ায় এসে প্রথমবারের মতো টেস্ট সিরিজ ড্র করার পরও সেই প্রশ্ন থাকছেই।
সূত্র: প্রথম আলো
