গাজার ১৩ বছরের কিশোরীর গল্প টরন্টোয় পুরস্কৃত, দর্শকের সেরা ‘লা বোলা নেগ্রা’
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১০:৩০ AM

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা। সেখানকার একটি শরণার্থীশিবিরে বেড়ে ওঠা ১৩ বছরের এক কিশোরীর জীবন উঠে এসেছে ফিলিস্তিনি নির্মাতা হোসাম আবু দানের ‘থার্টিন ইন গাজা’য়। ৫১তম টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের (টিআইএফএফ) শেষ দিনে সেই ছবিই জিতল নেটপ্যাক পুরস্কার। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রথম বা দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি নির্মাণ করা পরিচালকদের কাজের মধ্য থেকে দেওয়া হয় এ পুরস্কার।
রোববার ছিল ১১ দিনের উৎসবের শেষ দিন। টিআইএফএফ লাইটবক্সে পুরস্কার ঘোষণাকে ঘিরে সকাল থেকেই ছিল উৎসবের শেষ দিনের ব্যস্ততা। সরাসরি সংবাদ সম্মেলনে একে একে ঘোষণা করা হয় বিজয়ীদের নাম। পুরস্কার ঘোষণার পরও অবশ্য সিনেমা দেখা থামেনি। দুপুর ১২টায় লাইটবক্সে দর্শকদের জন্য বিনা মূল্যে শুরু হয় পিপলস চয়েজ পুরস্কারজয়ী ছবিগুলোর বিশেষ প্রদর্শনী।
শেষ দিনে দাঁড়িয়ে এবারের দর্শক উপস্থিতি নিয়েও উচ্ছ্বসিত টিআইএফএফ কর্তৃপক্ষ। পুরস্কার ঘোষণার পর লালগালিচায় উৎসবের প্রধান নির্বাহী ক্যামেরন বেইলি বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে, টিআইএফএফের দর্শকভিত্তি আগের মতোই শক্তিশালী; বরং আরও শক্তিশালী।’ তাঁর ভাষায়, বিপুলসংখ্যক দর্শক এবার উৎসবে এসেছেন।১১ দিনের প্রদর্শনী, লালগালিচা আর দর্শকের সেই উপস্থিতির মধ্য দিয়েই রোববার শেষ হয় এবারের আসর।
শেষ দিনের পুরস্কারতালিকায় গাজার ছবিটির পাশাপাশি বড় অর্জন এসেছে ভারতেরও। থেজা রিওর ‘আং’ জিতেছে প্ল্যাটফর্ম পুরস্কার। আর দর্শকের ভোটে উৎসবের মূল পিপলস চয়েজ অ্যাওয়ার্ড গেছে হাভিয়ের কালভো ও হাভিয়ের আমব্রোসির স্প্যানিশ ছবি ‘লা বোলা নেগ্রা’র ঝুলিতে। সব মিলিয়ে এবার দেওয়া হয়েছে ১২টি পুরস্কার।
গাজার গল্পে জুরিদের প্রশংসা‘থার্টিন ইন গাজা’ ফিলিস্তিনি নির্মাতা হোসাম আবু দানের প্রথম কাহিনিচিত্র। যুদ্ধের মধ্যে গাজার একটি বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়শিবিরে বাবার সঙ্গে থাকা ১৩ বছরের রাঘাদকে ঘিরে গল্প। কৈশোরে পা দেওয়া মেয়েটির সামনে তখন একদিকে নিজের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন, অন্যদিকে যুদ্ধের বাস্তবতায় ব্যক্তিগত পরিসর ও নিরাপত্তাহীনতা। ৭৭ মিনিটের ছবিটি পুরোপুরি গাজায় স্থানীয় ফিলিস্তিনি কলাকুশলীদের নিয়ে ধারণ করা হয়েছে। টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সেন্টারপিস বিভাগে ছবিটির বিশ্ব উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়।
‘থার্টিন ইন গাজা’–কে পুরস্কৃত করার ব্যাখ্যায় নেটপ্যাক জুরি বলেছে, গাজার চলমান পরিস্থিতির মধ্যে ছবিটি মানুষের দুর্ভোগকে নিছক প্রদর্শনী বা ভুক্তভোগিতায় পরিণত করেনি; বরং জীবনের সব জটিলতাকে শক্তিশালী সব দৃশ্যের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছে। জুরি একে ‘সাহসী ও জীবনঘনিষ্ঠ চলচ্চিত্র’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছে, ছবিটির মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ এক নতুন কণ্ঠের আগমন ঘটেছে।
নেটওয়ার্ক ফর দ্য প্রমোশন অব এশিয়ান প্যাসিফিক সিনেমা (নেটপ্যাক)পুরস্কারটি এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের চলচ্চিত্রের জন্য। প্রথম বা দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি নির্মাণ করেছেন—এমন পরিচালকদের উৎসবে প্রদর্শিত কাজের মধ্য থেকে সেরা এশীয় চলচ্চিত্র নির্বাচন করেন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক জুরি। এবারের জুরির সভাপতি ছিলেন রোমের সাপিয়েঞ্জা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া অধ্যয়নের সহযোগী অধ্যাপক মারা মাত্তা। তাঁর সঙ্গে জুরিতে ছিলেন শিল্পী ও লেখক রিচার্ড ফাং এবং চলচ্চিত্র সমালোচক পানাইয়োতিস কোটজাথানাসিস।
পুরস্কারের পর এক বিবৃতিতে হোসাম আবু দান বলেন, গাজার কণ্ঠ দর্শকের কাছে পৌঁছেছে, এটি তাঁদের জন্য গভীর গর্বের। গাজার অসংখ্য বেদনাদায়ক গল্পের মধ্য থেকে একটি মানুষের গল্প তাঁরা বিশ্বের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পেরেছেন।
দর্শকের সেরা ‘লা বোলা নেগ্রা’টিআইএফএফের মূল পিপলস চয়েজ অ্যাওয়ার্ড জিতেছে ‘লা বোলা নেগ্রা’। ১৯৭৮ সাল থেকে উৎসবে আসা দর্শকের ভোটে এই পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। এবার প্রথম রানারআপ পিটার ফ্যারেলির ‘আই প্লে রকি’; দ্বিতীয় রানারআপ শান হেডারের ‘বিয়িং হিউম্যান’।‘লা বোলা নেগ্রা’র গল্প বিস্তৃত তিনটি সময়ে—১৯৩২, ১৯৩৭ ও ২০১৭ সালে। স্পেনের তিন পুরুষের জীবন, আকাঙ্ক্ষা, ভালোবাসা ও যন্ত্রণাকে একই সূত্রে এনেছে ছবিটি। টরন্টোর আগে কান চলচ্চিত্র উৎসবেও ছবিটি আলোচনায় ছিল। সেখানে হাভিয়ের কালভো ও হাভিয়ের আমব্রোসি যৌথভাবে সেরা পরিচালকের পুরস্কার পান। পরে ছবিটির স্বত্ব কিনে নেয় নেটফ্লিক্স।
পুরস্কার নিতে দুই নির্মাতা শেষ দিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। ছবির প্রচারের কাজে তাঁরা তখন স্পেনে ছিলেন। তাঁদের পাঠানো বার্তা মঞ্চে পড়ে শোনান টিআইএফএফের প্রধান নির্বাহী ক্যামেরন বেইলি। নির্মাতারা বলেন, ছবিটি তাঁদের অত্যন্ত ব্যক্তিগত একটি কাজ; নিজের পরিচয় প্রকাশের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার কথাও এতে আছে। টরন্টোর দর্শকেরা ছবিটির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেছেন এবং এটিকে আপন করে নিয়েছেন, এটাই তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় উপহার।অস্কারের পথে ভারতের ‘আং’
ভারতের থেজা রিও পরিচালিত ‘আং’ জিতেছে প্ল্যাটফর্ম পুরস্কার। ভারত-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী নাগাল্যান্ডের একটি গ্রামের শেষ জীবিত প্রধানকে ঘিরে ছবিটির গল্প। ছবির বেশির ভাগ সংলাপ কোনিয়াক ভাষায়।
পুরস্কার ঘোষণার পর লালগালিচায় নিজের অনুভূতি জানিয়েছেন থেজা রিও। দ্য কানাডিয়ান প্রেসকে তিনি বলেন, প্রথমত নিজের জন্মভূমি নিয়ে একটি চলচ্চিত্র বানাতে চেয়েছিলেন তিনি। নিজের জনগোষ্ঠীর গল্প ও কণ্ঠস্বর তুলে ধরাই ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ্য। সেই ছবি নিয়ে টরন্টোয় এসে পুরস্কার পাওয়া তাঁর কাছে স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো।
এবার প্ল্যাটফর্ম পুরস্কারের গুরুত্বও বেড়েছে। প্রথমবারের মতো এই পুরস্কারজয়ী অ-ইংরেজি ভাষার ছবি অস্কারের সেরা আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে সরাসরি যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। তবে অস্কারের অন্যান্য শর্তও পূরণ করতে হবে। ‘আং’-এর অধিকাংশ সংলাপ কোনিয়াক ভাষায় হওয়ায় ছবিটি ভাষাসংক্রান্ত শর্ত পূরণ করছে।
মায়ের কথা বলতে গিয়ে কাঁদলেন কোডিপুরস্কার ঘোষণার পর আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি করেন কানাডীয় নির্মাতা কোডি লাইটনিং। তাঁর ‘স্মাজ দ্য ব্লেডস’ পেয়েছে বেস্ট কানাডিয়ান ডিসকভারি অ্যাওয়ার্ড। মঞ্চে উঠে কোডি জানান, কয়েক সপ্তাহ আগেই আকস্মিকভাবে মারা গেছেন তাঁর মা জর্জিনা লাইটনিং। তিনিও ছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাতা।
মায়ের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন কোডি। বলেন, বাবার কাছ থেকে পেয়েছেন রসবোধ আর মায়ের কাছ থেকে গল্প বলার ক্ষমতা। এরপর তিনি বলেন, ‘এই পুরস্কার আমার মায়ের জন্য।’ পরে লালগালিচায় জানান, ছবিটির শুটিংয়ের সময় তাঁর মা প্রায়ই সেটে থাকতেন এবং এই কাজ নিয়ে মা নিশ্চয় খুব গর্বিত হতেন।
কানাডার সেরা ‘সানবার্ন’সেরা কানাডীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতেছে সারভিল পোবলেতের ‘সানবার্ন’। টরন্টোর ব্লিকার স্ট্রিট এলাকার একদল কিশোর-কিশোরীর বেড়ে ওঠার গল্প ছবিটির কেন্দ্রে। জুরির মতে, ছবিটি প্রাণবন্ত, মজার ও গভীরভাবে মানবিক।
আন্তর্জাতিক পিপলস চয়েজ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে সাইমন স্টোনের ‘এলসিনোর’। প্রামাণ্যচিত্রে দর্শকের সেরা ব্যারি অ্যাভরিচের ‘ডারলিন লাভ: আই নো হয়ার আ’ভ বিন’। মিডনাইট ম্যাডনেস বিভাগে দর্শকের পছন্দ ম্যাথিউ র্যানকিনের ‘লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন, ব্রায়ান মালরনি’।
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচকদের সংগঠন ফিপ্রেসির পুরস্কার পেয়েছে আইরিশ লেখক-নির্মাতা ডেভিড টারপিনের ‘অ্যানসেস্টরস’। আশির দশকের লন্ডনে বসবাসকারী এক আইরিশ ব্যক্তির জীবনকে ঘিরে ছবিটির গল্প।১১ দিনে ২৯৪ ছবি
দর্শকের বড় উপস্থিতির কথা বলার পেছনে সংখ্যাও আছে। ১১ দিনে ৭২টি দেশের ২৯৪টি ছবি প্রদর্শিত হয়েছে। ৯৮টি লালগালিচায় অংশ নিয়েছেন আট শতাধিক শিল্পী ও চলচ্চিত্রকর্মী। স্বীকৃত গণমাধ্যমকর্মী ছিলেন ২ হাজার; বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছেন ২৭৯ জন পরিচালক। প্রথমবার চালু হওয়া ‘টিআইএফএফ: দ্য মার্কেট’-এ ছিলেন প্রায় সাত হাজার প্রতিনিধি।
১০ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া উৎসবের ১১ দিনের ব্যস্ততা শেষে রোববার তাই লাইটবক্সে পুরস্কার ঘোষণার মধ্যেও ছিল সিনেমা ঘিরে শেষ দিনের আমেজ। দুপুর থেকে আবার দর্শকের জন্য খুলে যায় পিপলস চয়েজজয়ী ছবিগুলোর বিনা মূল্যের প্রদর্শনী। দর্শকের উপস্থিতি নিয়ে ক্যামেরন বেইলির উচ্ছ্বাসও তাই স্পষ্ট, এবারের টিআইএফএফে তাঁরা এসেছেন বিপুল সংখ্যায়।
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পর্কিত সংবাদ
ভারত–পাকিস্তান দুই দেশেই রাজত্ব, পারিশ্রমিক ছিল সবার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১১:৫৯ AM · প্রথম আলো
মা হওয়ার পর ক্যাটরিনার চেহারা নিয়ে কটাক্ষ, সালমানের কড়া জবাব
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৪:৩০ PM · প্রথম আলো
