শাহজাদপুর সংবাদ

একটি সম্পর্ক, একটি মিথ্যা, যে কেলেঙ্কারিতে কেঁপে উঠেছিল ব্রিটিশ সরকার

৩১ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১০:০০ AM

একটি সম্পর্ক, একটি মিথ্যা, যে কেলেঙ্কারিতে কেঁপে উঠেছিল ব্রিটিশ সরকার

১৯৬৩ সালের যুক্তরাজ্য। একদিকে স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনা, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন সরকারের ভেতরে অস্বস্তি। দেশটির যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী জন প্রোফুমো পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে এক তরুণীর সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা অস্বীকার করলেন। তাঁর বক্তব্য, ওই নারীর সঙ্গে পরিচয়ে কোনো অনৈতিকতা ছিল না। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেই বক্তব্যই হয়ে উঠল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পতনের কারণ। বেরিয়ে এল এমন এক সম্পর্কের কথা, যাঁর সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল এক সোভিয়েত কূটনীতিক, লন্ডনের অভিজাত সমাজ, সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধান এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।

ওই নারীর নাম ক্রিস্টিন কিলার। বয়স তখন মাত্র ১৯। আর প্রোফুমো ছিলেন ৪৮ বছর বয়সী, বিবাহিত, প্রভাবশালী এক রাজনীতিক। তাঁদের সম্পর্কের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল একটি প্রশ্ন, একজন মন্ত্রী পার্লামেন্টে মিথ্যা বললে তাঁর পরিণতি কী হতে পারে?

যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে ঘটনাটি পরিচিত ‘প্রোফুমো অ্যাফেয়ার’ নামে। যৌনসম্পর্কের গুঞ্জন দিয়ে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত এটি আর ব্যক্তিগত সম্পর্কের কাহিনি থাকেনি। হয়ে উঠেছিল ক্ষমতা, সত্য গোপন, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিয়ে এক জাতীয় বিতর্ক। প্রিয় পাঠক, এবার কাহিনির ভাঁজ খোলা যাক।

জন ডেনিস প্রোফুমো যুক্তরাজ্যের কনজারভেটিভ পার্টির রাজনীতিক ছিলেন। ১৯৬০ সালে প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড ম্যাকমিলানের সরকারে তিনি যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তাঁর স্ত্রী ভ্যালেরি হবসন ছিলেন পরিচিত অভিনেত্রী। রাজনীতি ও অভিজাত সমাজে প্রোফুমো দম্পতির পরিচিতিও ছিল যথেষ্ট।

১৯৬১ সালের জুলাই মাসে বাকিংহামশায়ারের ক্লাইভডেন এস্টেটে এক সপ্তাহান্তের আয়োজন তাঁদের জীবনকে অন্যদিকে নিয়ে যায়। এস্টেটটির মালিক ছিলেন ধনী ও প্রভাবশালী লর্ড অ্যাস্টর। সেখানে অতিথি হিসেবে ছিলেন প্রোফুমো। আরেক অতিথি, তরুণী ক্রিস্টিন কিলার এসেছিলেন চিকিৎসক স্টিফেন ওয়ার্ডের সঙ্গে। ওয়ার্ড ছিলেন সমাজের অভিজাত মহলে পরিচিত একজন অস্টিওপ্যাথ, পাশাপাশি ছবি আঁকতেন।

ক্লাইভডেনের সুইমিংপুলের কাছেই প্রোফুমোর সঙ্গে কিলারের পরিচয়। তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠল। কিলার তখন লন্ডনের একটি নাইটক্লাবে শো–গার্ল হিসেবে কাজ করতেন।

তবে এই সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসার সময়ই তাৎক্ষণিক কোনো বিস্ফোরণ ঘটেনি। প্রোফুমো পরে জানান, সম্পর্কটি অল্প সময়ের ছিল এবং ১৯৬১ সালের শেষ দিকে তিনি তা শেষ করেন। কিন্তু ক্রিস্টিন কিলারের জীবনে তখন আরেকজন পুরুষও ছিলেন, যাঁর পরিচয় ঘটনাটিকে সাধারণ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের গণ্ডি থেকে বের করে আনে।

কিলারের সঙ্গে পরিচয় ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের নৌবাহিনীর কর্মকর্তা ইয়েভগেনি ইভানভেরও। তিনি লন্ডনে সোভিয়েত দূতাবাসে নৌ-অ্যাটাশে হিসেবে কর্মরত ছিলেন। যুক্তরাজ্য ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্ক তখন স্নায়ুযুদ্ধের টানাপোড়েনে আবদ্ধ। দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও কৌশলগত তথ্য নিয়ে সন্দেহ, নজরদারি এবং গোয়েন্দা তৎপরতা চলছিল।

ফলে যুক্তরাজ্যের একজন যুদ্ধমন্ত্রী এবং সোভিয়েত নৌ-কর্মকর্তার সঙ্গে একই তরুণীর সম্পর্কের খবর শুধু ব্যক্তিগত কৌতূহলের বিষয় ছিল না। প্রশ্ন উঠল, প্রোফুমোর কাছ থেকে কোনো গোপন তথ্য অন্য পক্ষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছিল কি না।

১৯৬১ সালেই যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা চিকিৎসক স্টিফেন ওয়ার্ডের সঙ্গে ইভানভের যোগাযোগ সম্পর্কে সতর্ক ছিলেন। সরকারি নথি অনুযায়ী, ওই বছরের আগস্টে মন্ত্রিসভার সচিব স্যার বার্ক ট্রেন্ড প্রোফুমোকে ওয়ার্ড ও ইভানভের যোগাযোগ নিয়ে সতর্ক করেছিলেন।

প্রোফুমো কিলারের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করেছিলেন, কিন্তু ঘটনাটি সেখানেই থামেনি। ব্যক্তিগত জীবনের গোপন অধ্যায়টি সামনে আসার জন্য যেন অপেক্ষা করছিল একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনার।

পরের বছর ১৯৬২ সালের শেষ দিকে লন্ডনে ঘটে একটি ঘটনা। কিলারের সাবেক প্রেমিক জনি অ্যাজকম্ব একটা কাণ্ড ঘটিয়ে বসেন। তিনি স্টিফেন ওয়ার্ডের ফ্ল্যাটের বাইরে গিয়ে গুলি চালান। কিলার তাঁর সঙ্গে দেখা করতে রাজি হননি। অ্যাজকম্বের এই কাণ্ড সংবাদমাধ্যমের নজর কাড়ে। শুরু হয় মামলা, আদালতে হাজিরা আর তার সূত্র ধরে সাংবাদিকদের আগ্রহ বাড়তে থাকে কিলারের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে।

সেখানেই সামনে আসে প্রোফুমোর নাম। কিলারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। আরও আলোচনায় আসে সোভিয়েত কর্মকর্তা ইভানভের সঙ্গে কিলারের সম্পর্ক। যুক্তরাজ্যের একজন মন্ত্রী, একজন তরুণী এবং সোভিয়েত দূতাবাসের এক কর্মকর্তা—এই তিন নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হতে থাকলে ঘটনাটি আর নিছক কেলেঙ্কারির খবর থাকে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।

১৯৬৩ সালের মার্চে বিষয়টি ব্রিটিশ পার্লামেন্টেও ওঠে। লেবার পার্টির এমপি জর্জ উইগ জানতে চান, প্রোফুমোর সঙ্গে কিলারের সম্পর্কের অভিযোগ সত্য কি না। সরকার বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারছিল না। ২২ মার্চ হাউস অব কমন্সে ব্যক্তিগত বিবৃতি দেন প্রোফুমো। তিনি বলেন, কিলারের সঙ্গে তাঁর পরিচয়ে কোনো অনৈতিকতা ছিল না। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়ানো হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।

বিবৃতিটি সাময়িকভাবে পরিস্থিতি শান্ত করে। কিন্তু রাজনীতিতে কখনো কখনো একটি অস্বীকারই সত্য প্রকাশের পথ খুলে দেয়।

১৯৬৩ সালের মে মাসে স্টিফেন ওয়ার্ডের বিরুদ্ধে মামলা হয়। অভিযোগ ছিল, তিনি কিলার ও অন্য তরুণীদের যৌনকর্ম থেকে অর্থ উপার্জন করতেন। বিচার চলাকালে কিলারের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে আদালতে নানা তথ্য সামনে আসতে থাকে। সংবাদমাধ্যমও ঘটনাটি ব্যাপকভাবে প্রচার করতে থাকে।

প্রোফুমোর পক্ষে তখন আগের বক্তব্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। জুনের ৪ তারিখ তিনি প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড ম্যাকমিলানকে জানান, মার্চে পার্লামেন্টে দেওয়া তাঁর বক্তব্য সত্য ছিল না। তিনি কিলারের সঙ্গে অনুচিত সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। পরদিন ৫ জুন, যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন প্রোফুমো। তিনি পার্লামেন্ট সদস্যপদও ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

পরে প্রোফুমো স্বীকার করেন, স্ত্রী ও পরিবারকে রক্ষা করার কথা ভেবেই তিনি সত্য গোপন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর এই ব্যাখ্যা রাজনৈতিক দায় থেকে তাঁকে মুক্ত করতে পারেনি। কারণ, তিনি শুধু নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্ক অস্বীকার করেননি, পার্লামেন্টের কাছেও অসত্য বক্তব্য দিয়েছিলেন।

প্রোফুমো-কাণ্ডের সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল, কিলারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কারণে ব্রিটিশ রাষ্ট্রের গোপন তথ্য বিপন্ন হয়েছিল কি না। যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে প্রোফুমোর দায়িত্ব ছিল সামরিক বিষয়াবলি তদারক করা। অন্যদিকে ইভানভ ছিলেন সোভিয়েত দূতাবাসের কর্মকর্তা। ফলে তাঁদের ব্যক্তিগত পরিচয়ের খবর নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী ম্যাকমিলান তদন্তের জন্য বিচারক লর্ড ডেনিংকে দায়িত্ব দেন। ১৯৬৩ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ডেনিং সিদ্ধান্তে পৌঁছান, এই ঘটনায় জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রমাণ নেই। অর্থাৎ কেলেঙ্কারির সঙ্গে গোয়েন্দা তৎপরতার সম্ভাবনা জড়িয়ে থাকলেও রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁসের অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

তবে সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন শেষ হয়নি। এত গুরুত্বপূর্ণ একজন মন্ত্রীর ব্যক্তিগত যোগাযোগ নিয়ে উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে দেরি করেছিল কি না, সেটি ছিল বিতর্কের বড় অংশ। ডেনিংয়ের তদন্তে নিরাপত্তা-তথ্য ফাঁসের প্রমাণ না মিললেও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংকট মোকাবিলার ধরন নিয়ে সমালোচনা ছিল।

এই কেলেঙ্কারিতে শুধু প্রোফুমোর জীবনই বদলে যায়নি। চিকিৎসক স্টিফেন ওয়ার্ডের পরিণতি ছিল আরও করুণ। ১৯৬৩ সালের জুলাইয়ে তাঁর বিচার চলার শেষ দিকে তিনি ওষুধের অতিরিক্ত মাত্রা গ্রহণ করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। ৩ আগস্ট তিনি মারা যান। মৃত্যুর আগে আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হয়েছিল।

রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার পর প্রোফুমো আর ক্ষমতায় ফেরার চেষ্টা করেননি। ১৯৬৩ সালেই তিনি লন্ডনের পূর্বাঞ্চলে দরিদ্র মানুষের জন্য কাজ করা দাতব্য প্রতিষ্ঠান টয়েনবি হলে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যুক্ত হন। প্রথম দিকে সাধারণ কাজও করেছেন, পরে তহবিল সংগ্রহ ও প্রতিষ্ঠানটির নানা উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৫ সালে সমাজসেবার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে সিবিই (অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার) সম্মানে ভূষিত করা হয়।

প্রোফুমোর জীবনের এই পর্ব তাঁর অতীতকে মুছে দেয়নি। কিন্তু তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে আরেকটি অধ্যায় যুক্ত করেছে। একসময় যিনি রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন, পরে তিনি দীর্ঘ চার দশক ধরে জনকল্যাণমূলক কাজে যুক্ত থেকেছেন। ২০০৬ সালের ৯ মার্চ, ৯১ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।

১৯৬৩ সালে কিলারের বিরুদ্ধে একটি মামলায় মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। মামলাটি ছিল জ্যাজ সংগীতশিল্পী লাকি গর্ডনের সঙ্গে তাঁর বিরোধ ও হামলার অভিযোগকে ঘিরে। ওই মামলায় মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার দায়ে বছরের শেষ দিকে তাঁকে ৯ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রায় ৬ মাস কারাগারে ছিলেন। ১৯৬৪ সালে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি অনেকটাই লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান।

কিলার দুবার বিয়ে করেছিলেন। প্রথম স্বামী ছিলেন জেমস লিভারমোর, দ্বিতীয় স্বামী অ্যান্টনি প্ল্যাট। কোনো বিয়েই স্থায়ী হয়নি। তাঁর দুই ছেলে ছিল, প্রথম সংসারে জেমস এবং দ্বিতীয় সংসারে সেমুর।

একসময় সংবাদমাধ্যমের কাছে নিজের জীবনের গল্প বিক্রি করে অর্থ পেয়েছিলেন কিলার। আত্মজীবনীও লিখেছিলেন একাধিক। পরবর্তী জীবনে তাঁকে বিভিন্ন সাধারণ কাজ করতে হয়েছে, যেমন স্কুলের খাবার পরিবেশন, টেলিফোনে পণ্য বিক্রির কাজ এবং ড্রাই ক্লিনারের দোকানে কাজ।

নিজের পরিচয় আড়াল করতে কিলার কখনো কখনো ‘স্লোন’ পদবি ব্যবহার করতেন বলেও সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ আছে। তাঁর অভিযোগ ছিল, নিয়োগদাতারা তাঁর অতীত পরিচয় জানতে পারলে তাঁকে কাজে রাখতে চাইতেন না।

কিলার পরবর্তী জীবনে একাধিকবার প্রোফুমো-কাণ্ড নিয়ে নিজের বক্তব্য প্রকাশ করেন। ২০০১ সালে প্রকাশিত ‘দ্য ট্রুথ অ্যাট লাস্ট: মাই স্টোরি’ বইয়ে তিনি এমন কিছু দাবি করেন, যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল প্রোফুমোর সন্তানের মা হওয়া এবং গর্ভপাতের অভিযোগ। প্রোফুমোর ঘনিষ্ঠজনেরা এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

কিলার আরও দাবি করেছিলেন, স্টিফেন ওয়ার্ড সোভিয়েত গোয়েন্দাদের হয়ে কাজ করতেন। কিন্তু তাঁর এসব বক্তব্যের সব কটির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

১৯৮৯ সালে ‘স্ক্যান্ডাল’ নামে প্রোফুমো-কাণ্ড নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ারে কিলার উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু পরে তিনি ছবিটি নিয়ে আপত্তি জানান এবং বলেন, এতে তাঁর জীবনের ঘটনাগুলো যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি।

২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর লন্ডনের কাছে প্রিন্সেস রয়্যাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর ছেলে সেমুর সংবাদমাধ্যমকে জানান, তাঁর মা বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন।

প্রোফুমো-কাণ্ডে প্রোফুমোর রাজনৈতিক জীবন শেষ হয়েছিল, কিন্তু পরে তিনি সমাজসেবার মাধ্যমে নতুন পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন। কিলারের ভাগ্যে তেমন পুনর্বাসন আসেনি।

প্রোফুমো-কাণ্ডের পরিণতি ব্রিটিশ রাজনীতিতেও দীর্ঘ ছায়া ফেলেছিল। প্রধানমন্ত্রী ম্যাকমিলান ১৯৬৩ সালের অক্টোবরে পদত্যাগ করেন, যদিও তাঁর পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক কারণ ছিল স্বাস্থ্যগত সমস্যা। তাই প্রোফুমো-কাণ্ডই এককভাবে তাঁর পদত্যাগের কারণ, এমন দাবি করা ঠিক হবে না। তবে কেলেঙ্কারিটি তাঁর সরকারের ভাবমূর্তি ও রাজনৈতিক অবস্থানকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। ১৯৬৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে কনজারভেটিভরা পরাজিত হয়, ক্ষমতায় আসে হ্যারল্ড উইলসনের নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টি।

প্রোফুমোর গল্প তাই শুধু একজন মন্ত্রীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কাহিনি নয়। এটি এমন এক সময়ের ইতিহাস, যখন ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধান, জাতীয় নিরাপত্তা এবং সংসদের প্রতি দায়বদ্ধতা একই বিন্দুতে এসে মিলেছিল। সম্পর্কটি হয়তো কয়েক মাসের বেশি স্থায়ী হয়নি, কিন্তু সেই সম্পর্ক আড়াল করতে বলা একটি মিথ্যা একজন মন্ত্রীর রাজনৈতিক জীবন শেষ করে দিয়েছিল।

ক্ষমতার শীর্ষে থাকা মানুষটির জন্য শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে উঠেছিল তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, বরং সেই সম্পর্ক নিয়ে সংসদে দেওয়া অসত্য বক্তব্য। ইতিহাসে প্রোফুমোর নাম টিকে আছে এই কারণেই।

সূত্র: হিস্টরি, গার্ডিয়ান, যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল আর্কাইভস

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ

একটি সম্পর্ক, একটি মিথ্যা, যে কেলেঙ্কারিতে কেঁপে উঠেছিল ব্রিটিশ সরকার | শাহজাদপুর সংবাদ