ইসলামি দর্শন কি গ্রিক দর্শনের অনুবাদ?
১৩ আগস্ট, ২০২৬ এ ৯:০০ AM

মুসলিমদের কি নিজস্ব কোনো দর্শন ছিল, নাকি তারা শুধু প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকদের অনুকরণ ও অনুবাদে সীমাবদ্ধ ছিল? গত শতকের পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে এই প্রশ্নটি ছিল বহুল আলোচিত।
বহু প্রাচ্যবিদ গবেষক দাবি করেছেন যে ইসলাম মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীন চর্চা ও দর্শনের বিরুদ্ধে। তাঁদের মতে, কোরআনের কঠোর বিধান মুসলিমদের চিন্তা করার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে।
তবে ইউরোপীয় গবেষকদের এই একপেশে দৃষ্টিভঙ্গিকে বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও ঐতিহাসিক তথ্য দিয়ে খণ্ডন করেছেন আধুনিক মুসলিম মনীষীদের অনেকে। তাঁরা দেখিয়েছেন যে ইসলাম শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাকে উৎসাহিতই করেনি, বরং যারা বুদ্ধির ব্যবহার করে না, কোরআনে তাদের কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছে। (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৭৯)
ইসলামি দর্শনের এই আত্মপরিচয় ও মৌলিকতা পুনরুদ্ধারে প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছিলেন মোস্তফা আবদুর রাজ্জাক (মৃ. ১৯৪৭ খ্রি.)। তিনি ছিলেন কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মিসরীয় দর্শন অধ্যাপক, পরে মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যান্ড শাইখ এবং দেশটির ওয়াকফ মন্ত্রী হন।
১৯৪০-এর দশকে প্রকাশিত এবং পরে পুনর্মুদ্রিত তাঁর আকরগ্রন্থ তামহিদ লি-তারিখিল ফালসাফাতিল ইসলামিয়্যাহ (ইসলামি দর্শনের ইতিহাসের ভূমিকা) ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সংযোজন।
তিনি ১৯ ও ২০ শতকে ইউরোপীয় গবেষকদের ব্যবহৃত গবেষণা পদ্ধতি বিশ্লেষণ করেন। তখন ইউরোপে এক ধরনের বর্ণবাদী তত্ত্ব চালু ছিল, যেখানে দাবি করা হতো যে ‘আর্য’ জাতিই হলো সমস্ত সভ্যতা, বুদ্ধি ও দর্শনের জন্মদাতা এবং ‘সেমেটিক’ আরবদের তাত্ত্বিক চিন্তা, বৈজ্ঞানিক সূত্র আবিষ্কার বা দর্শনের মতো জটিল বিষয় অনুধাবনের সক্ষমতা নেই।
প্রাচ্যবিদরা দাবি করতেন, আরবদের দর্শন মূলত অ্যারিস্টটল বা প্লেটোর গ্রিক ভাবনারই আরবি অনুবাদ মাত্র। এমনকি কেউ কেউ ইসলামি আইনশাস্ত্র বা ফিকহকে রোমান আইনের অনুকরণ বলেও চালানোর চেষ্টা করেন।
শেখ আবদুর রাজ্জাক দেখান যে পশ্চিমা গবেষকরা ইসলামি দর্শনের মৌলিক উপাদানগুলো অস্বীকার করে সেগুলো অ-ইসলামি ও অ-আরব উৎস থেকে সংগৃহীত বলে প্রমাণ করতে ব্যতিব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গ্রিক দর্শন অনুবাদ হওয়ার শতবর্ষ আগে মুসলিম সমাজে স্বাধীন চিন্তার বিকাশ ঘটেছিল। (পৃষ্ঠা: ৫৪)
গ্রিক দর্শনের ছাঁচে ফেলে ইসলামি দর্শনকে পরিমাপ করা যে ভুল, তা তিনি প্রথম সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইউরোপীয়রা দর্শন বলতে শুধু ‘মেটাফিজিক্স’ বা পরম সত্তা সংক্রান্ত আলোচনাকে বুঝত। কিন্তু মুসলিমদের দর্শনের পরিসর অনেক বেশি ব্যাপক ও মৌলিক।
তিনি যুক্তি দেন যে মুসলিমদের প্রকৃত মৌলিক দর্শন লুকিয়ে আছে দুটি শাস্ত্রের মধ্যে—‘উসুলুল ফিকহ’ (ইসলামি আইনের মূলনীতি) এবং ‘ইলমুল কালাম’ (ইসলামি ধর্মতত্ত্ব)।
গ্রিকদের কাছে অ্যারিস্টটলের যুক্তিবিদ্যা (লজিক) যা ছিল, মুসলিমদের কাছে উসুলুল ফিকহ ছিল ঠিক তা-ই। অর্থাৎ, উসুলুল ফিকহ হলো জ্ঞানার্জনের এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের এক স্বয়ংসম্পূর্ণ ইসলামি যুক্তিবিজ্ঞান।
এই শাস্ত্রের জনক ইমাম শাফেয়ি যে যুক্তি পদ্ধতি ও বিচারবিশ্লেষণের কাঠামো দাঁড় করিয়েছিলেন, তা বাইরের প্রভাব ছাড়া বিশুদ্ধ ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক মেধার ফসল।
লেখক তথ্যপ্রমাণ দিয়ে দেখিয়েছেন যে নবীজির যুগ থেকেই ইসলামে যৌক্তিক বিচার (কিয়াস) এবং স্বাধীন গবেষণার (ইজতিহাদ) চর্চা বিদ্যমান ছিল। তিনি সাহাবি মুআজ ইবনে জাবালের সেই ঘটনা উল্লেখ করেন, যখন তাঁকে ইয়ামেনের বিচারক হিসেবে পাঠানো হচ্ছিল।
নবীজি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “কোরআন ও সুন্নাহতে সরাসরি কোনো সমাধান না পেলে তুমি কীভাবে বিচার করবে?” মুআজ (রা.) উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি নিজ বুদ্ধি ও জ্ঞান দিয়ে ‘ইজতিহাদ’ করব।” মহানবী (সা.) তাঁর এই উত্তরে সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছিলেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৯২)
একইভাবে বনু কোরাইজা অভিযানের ঘটনাটিও স্বাধীন গবেষণার চমৎকার উদাহরণ। নবীজি নির্দেশ দিয়েছিলেন, “বনু কোরাইজায় পৌঁছে আসরের নামাজ পড়বে।”
পথিমধ্যে নামাজের সময় পার হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে সাহাবিদের একদল নবীজির নির্দেশের বাহ্যিক অর্থ ধরে রেখে বনু কোরাইজায় পৌঁছে নামাজ আদায় করেন। অন্য দলটি নির্দেশের মূল উদ্দেশ্য অনুধাবন করে পথেই নামাজ আদায় করে নেন।
মহানবী (সা.) উভয় দলের বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গিকেই অনুমোদন দিয়েছিলেন এবং কারো সমালোচনা করেননি। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৪৬)
এগুলো প্রমাণ করে যে বুদ্ধি প্রয়োগ ও ব্যাখ্যার স্বাধীনতা ইসলামি ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি।
লেখক তাঁর গ্রন্থটিকে দুটি প্রধান অংশে ভাগ করেছেন:
প্রথম অংশ: এখানে তিনি ইসলামি দর্শন সম্পর্কে প্রাচ্যবিদ এবং মুসলিম বিশেষজ্ঞদের মতামত ও পদ্ধতির তুলনামূলক পর্যালোচনা করেছেন। তিনি দেখান কীভাবে ফকিহ ও শাস্ত্রবিদরা দর্শনকে ধর্মের কষ্টিপাথরে বিচার করেছেন, আবার অন্যদিকে কীভাবে কিছু পণ্ডিত যুক্তিশাস্ত্রকে অহেতুক বাকবিতণ্ডায় পরিণত করেছিলেন।
দ্বিতীয় অংশ: এই অংশে তিনি ইসলামি দর্শনের ইতিহাস অধ্যয়নের জন্য একটি নতুন ও মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন। তিনি প্রাচীন আরবের প্রজ্ঞা, প্রথম যুগের আইনি মতামত এবং উসুলুল ফিকহের বিকাশ তুলে ধরেন।
অতিরিক্ত সংযোজন: বইটির শেষে তিনি ‘ইলমুল কালাম’ বা ধর্মতত্ত্বের ইতিহাস নিয়ে একটি বিশেষ অধ্যায় যুক্ত করেছেন, যেখানে নবীজির সময় থেকে শুরু করে উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমল পর্যন্ত আকাইদের (ইসলামি বিশ্বাস) জটিল সামাজিক ও রাজনৈতিক বিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
শেখ আবদুর রাজ্জাকের প্রতিষ্ঠিত এই গবেষণা পদ্ধতি পরবর্তী প্রজন্মের মুসলিম দার্শনিকদের অনেককে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
তাঁর হাত ধরেই ড. আলি সামি আল-নাশশার ইসলামি আশআরি চিন্তাধারাকে নতুন করে পুনরুজ্জীবিত করেন এবং ড. মাহমুদ কাসিম মুতাজিলাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানকে বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গিতে পুনর্পাঠের সুযোগ পান। (আলি সামি আল-নাশশার, নাশআতুল ফিকরিল ফালসাফি ফিল ইসলাম, ১/৯, দারুল মাআরিফ, কায়রো, ১৯৬২)
সূত্র: প্রথম আলো
