শাহজাদপুর সংবাদ

চাঁদের রহস্য যেভাবে উন্মোচন করেন মুসলিম বিজ্ঞানীরা

১২ আগস্ট, ২০২৬ এ ৫:০০ PM

চাঁদের রহস্য যেভাবে উন্মোচন করেন মুসলিম বিজ্ঞানীরা

মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন’ (আইএইউ) চাঁদের পৃষ্ঠের বিভিন্ন আগ্নেয়গিরির মুখ ও গিরিখাতের (ক্রেটার) নামকরণ করেছে মধ্যযুগের ১৮ জন আরব ও মুসলিম বিজ্ঞানীর নামে।

তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন আল-বিরুনি, আল-খাওয়ারিজমি, ইবনে ইউনুস, ইবনে হাইসাম, ইবনে ফিরনাস, আল-ফরগানি, আল–বাত্তানি, নাসির উদ্দিন, আবু আল–ওয়াফা ও ওমর খৈয়াম।

যদিও জানা যায় যে মধ্যযুগের মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের লেখা পাণ্ডুলিপির মাত্র পাঁচ শতাংশ এ পর্যন্ত অনূদিত হয়েছে; আর তা–ই আধুনিক বিজ্ঞানকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইবনে হাইসাম প্রথম প্রমাণ করেছিলেন যে সূর্য বা নক্ষত্রদের মতো চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো নেই; বরং আমরা যে চাঁদের আলো দেখি, তা মূলত সূর্যের প্রতিফলিত রশ্মি।

চাঁদের পৃষ্ঠে যে অস্পষ্ট দাগ বা ছোপ দেখা যায়, তা নিয়ে তৎকালীন পণ্ডিতদের বৈচিত্র্যময় ভ্রান্ত ধারণা খণ্ডন করে তিনি রচনা করেন তাঁর কালজয়ী গবেষণা মাহিয়্যাতুল আসার আল্লাজি ইয়াজহারু আলা ওয়াজহিল কামার।

এতে তিনি গাণিতিকভাবে দেখান যে, চাঁদের উপাদান নক্ষত্রের মতো আলো উৎপন্ন করে না এবং এর ভেতরের ঘনত্বের তারতম্যের কারণেই সূর্যরশ্মি প্রতিফলনের পর কিছু অংশ তুলনামূলক অন্ধকার দেখায়। এ ছাড়া ফি আদওয়ায়িল কাওয়াকিব গ্রন্থে তিনি লেখেন, মহাবিশ্বের অন্যান্য তারকারাজি নিজস্ব আলোতে উজ্জ্বল হলেও চাঁদ সম্পূর্ণরূপে সূর্যের ওপর নির্ভর করে।

ইবনে আল-হাইসামের বায়ুমণ্ডলীয় প্রতিসরণ ও লেন্সসংক্রান্ত এই মৌলিক গবেষণাই পরে গ্যালিলিওকে দূরবীক্ষণ যন্ত্র (টেলিস্কোপ) আবিষ্কারে অনুপ্রাণিত করেছিল। (আলী আবদুল্লাহ আল-দিফা, আলামুল ফিজিয়া ফিল ইসলাম, পৃষ্ঠা: ১৬৮, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৮৫)

মহাকাশে চাঁদের আবর্তন গতি সবসময় একই নিয়মে চলে না; এতে সূক্ষ্ম কিছু তারতম্য বা অসঙ্গতি ঘটে। উনবিংশ শতকে ফরাসি অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়, বাগদাদের জ্যোতির্বিজ্ঞানী আবু আল-ওয়াফা চাঁদের গতির এই অসঙ্গতিটি চিহ্নিত করে গাণিতিক সমীকরণে প্রকাশ করেছিলেন। (এল. এ. সেদিও, তারিখুল আরব আল-আম, পৃষ্ঠা: ৩৪৬, দারু ইহইয়ায়িল কুতুবিল আরাবিয়্যা, কায়রো, ১৯৪৮)

মিসরের ফাতেমীয় আমলের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইবনে ইউনুস মোকাত্তম পাহাড়ের চূড়ায় স্থাপিত পর্যবেক্ষণাগার থেকে চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণের ওপর দীর্ঘ গবেষণা পরিচালনা করেন।

তিনি চন্দ্রগতির ত্বরান্বিত হার এবং ক্রান্তিবৃত্তের হেলানো কোণ এত সূক্ষ্মভাবে হিসাব করেছিলেন যে তা আধুনিক যন্ত্রের পরিমাপের প্রায় কাছাকাছি। (কাদরি তুকান, তুরাসুল আরবিল ইলমি ফির রিয়াদিয়্যাতি ওয়াল ফালাক, পৃষ্ঠা: ২৪৩, জামিআত আদ–দুওয়াল আরাবিয়া, কায়রো, ১৯৫৪)

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্যতম মূল ভিত্তি হলো গ্রহ-উপগ্রহের উপবৃত্তাকার (ইলিপটিক্যাল) কক্ষপথ। সমরকন্দ পর্যবেক্ষণাগারের প্রধান জ্যোতির্বিজ্ঞানী গিয়াসুদ্দিন জামশিদ গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেছিলেন যে চাঁদ এবং বুধ গ্রহের কক্ষপথ বৃত্তাকার নয়, বরং উপবৃত্তাকার। (আলী আবদুল্লাহ আল-দিফা, নাওয়াবিগু উলামায়িল আরাব ওয়াল মুসলিমিন ফির রিয়াদিয়্যাত, পৃষ্ঠা: ২০৬, দারুল ইতসাম, কায়রো, ১৯৮০)

আন্দালুসীয় বিজ্ঞানী ইবনে আল-জারকালি (ইউরোপে যিনি ‘আরজাখেল’ নামে পরিচিত) অ্যাস্ট্রোল্যাব যন্ত্রে বিশেষ পাত বা ‘সফিহা’ যুক্ত করে চাঁদের গতিপথ অনুশীলনের এক নতুন পথ দেখান।

কপারনিকাসের সময় পর্যন্ত ইউরোপের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা না থাকায় আল-জারকালি ও আল-বাতানির প্রস্তুতকৃত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সারণি ব্যবহার করতেন। (জিগ্রিড হুনকে, শামসুল আরব তুশরিকু আলাল গারব, পৃষ্ঠা: ১৪৪, দারু সাদির, বৈরুত, ২০০০)

ইউরোপের জ্যোতির্বিজ্ঞানের রূপকার নিকোলাস কপারনিকাস তাঁর ডি রেভোলুশনিবাস গ্রন্থে স্বীকার করেছেন যে তাঁর সৌরকেন্দ্রিক তত্ত্বের গাণিতিক মডেল তৈরিতে তিনি মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানী আল-বাতানি, নাসিরুদ্দিন আল-তুসি এবং সিরিয়ার ইবনে আশ-শাতিরের গবেষণার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করেছেন। (জাফর আল-আরশাদি, আত-তাফাউকুল ইলমি ফিল ইসলাম, পৃষ্ঠা: ১০১, মুয়াসসাসাতুল বালাগ, বৈরুত, ১৯৯০)

এমনকি জানা যায়, ইউরোপীয় বিজ্ঞানী উইতেলোর আলো সংক্রান্ত বিখ্যাত গ্রন্থটি মূলত ইবনে হাইসামের কিতাবুল মানাজির গ্রন্থের দ্বারা ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত; যা পরে কেপলারকে গ্রহের গতির সূত্র আবিষ্কারে সাহায্য করেছিল।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ

চাঁদের রহস্য যেভাবে উন্মোচন করেন মুসলিম বিজ্ঞানীরা | শাহজাদপুর সংবাদ