শাহজাদপুর সংবাদ

ইরান দখলে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন এই রাষ্ট্রনায়ক, শেষ পর্যন্ত ঝুলতে হয়েছে ফাঁসির দড়িতে

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৮:০০ AM

ইরান দখলে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন এই রাষ্ট্রনায়ক, শেষ পর্যন্ত ঝুলতে হয়েছে ফাঁসির দড়িতে

বিপ্লবোত্তর একটি দেশ সবে নিজেদের গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করছে। চারদিকে বিশৃঙ্খলা ও অবিশ্বাস। মানুষে মানুষে বিভেদ ও অর্থনীতির বেহাল দশা। ঠিক এমন সময়ে প্রতিবেশী দেশের রাষ্ট্রপ্রধান দেশটির এ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নিজের প্রভাব বিস্তার করতে হামলা করে বসেন। সূচনা হলো ইরান–ইরাক যুদ্ধের। প্রায় আট বছর ধরে এই যুদ্ধ চলে। পাঁচ লাখের বেশি মানুষ নিহত হন। রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধের আদ্যোপান্ত নিয়ে আজকের ফিরে দেখা।

১৯৮০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর, সকাল গড়িয়ে দুপুর—ইরাকের প্রায় ১৯২টি যুদ্ধবিমান ইরানের আকাশ ‘ছেয়ে ফেলেছে’। শুরু হলো তীব্র বিমান হামলা।

ইরানের কাছে এই হামলা ছিল অপ্রত্যাশিত। ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ঠিক এটাই করতে চেয়েছিলেন। তিনি অতর্কিত হামলা চালিয়ে প্রতিপক্ষের কোমর ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন, যেন তাঁর পদাতিক বাহিনী যখন সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশীর ভূখণ্ডে প্রবেশ করবে, তখন কোনো প্রতিরোধের সামনে পড়তে না হয়।

কিন্তু সাদ্দাম হোসেন যেমনটা হিসাব কষেছিলেন, বাস্তবে যুদ্ধ সে পথে এগোয়নি। ওই সময় ইরানের তুলনায় সামরিক শক্তিতে অনেক এগিয়ে থাকা সাদ্দাম ভেবেছিলেন, দ্রুতই তিনি ইরানকে কাবু করে ফেলতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে এই যুদ্ধ প্রায় আট বছর ধরে চলেছে। বলা হয়, আধুনিক কালে দুই দেশের মধ্যে এটাই সবচেয়ে ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী যুদ্ধ ছিল।

চলমান ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হিসাবেও প্রায় একই ধরনের ভুল হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর ব্যাপক হামলা চালায়। সেদিনের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক–বেসামরিক নেতা ও কর্মকর্তা নিহত হন।

ট্রাম্প দম্ভভরে বলেছিলেন, ইরান তাদের সামনে দুই থেকে চার সপ্তাহ টিকতে পারবে। কিন্তু যুদ্ধ এখন সাত মাসে গড়িয়েছে। শান্তির কোনো লক্ষণ নেই; বরং ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোও ইরানের হামলার শিকার হচ্ছে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২১ সালে ইরাক রাষ্ট্রের জন্ম। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে দেশটির উত্তেজনা শুরু। ১৯৭০–এর দশকে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধের অন্যতম বিষয় ছিল শাত আল–আরব জলপথের নিয়ন্ত্রণ।

টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর মিলনে তৈরি এই জলপথের দক্ষিণ প্রান্ত দুই দেশের মধ্যে ভাগ হয়েছে। ১৯৭৫ সালে সই হওয়া আলজিয়ার্স চুক্তির মাধ্যমে ইরাক এই জলপথের ওপর তার নিয়ন্ত্রণের অংশ ছেড়ে দেয়। বিনিময়ে ইরান উত্তর ইরাকে কুর্দি বিদ্রোহীদের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে।

ইরানে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব এ পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আনে। বিপ্লবের মাধ্যমে দেশটিতে পশ্চিমাপন্থী শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির সরকার উৎখাত হয় এবং আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে এক নতুন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।

এদিকে ১৯৭৯ সালের জুলাইয়ে ইরাকের প্রেসিডেন্ট হন দেশটির বাথ পার্টির নেতা সাদ্দাম হোসেন। ইরাকের সংখ্যালঘু সুন্নি মুসলিম জনগোষ্ঠীর সমর্থনের ওপর নির্ভর করে তিনি দেশ শাসন শুরু করেন। তাঁর ভয় ছিল, ইরানের ইসলামি বিপ্লব ইরাকেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

একই সঙ্গে সাদ্দাম ১৯৭৫ সালের সীমান্ত চুক্তি বাতিল করে শাত আল–আরবের দুই তীরের ওপরই নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চান। এটি ছিল পারস্য উপসাগরে ইরাকের একমাত্র প্রবেশপথ।

বিপ্লবের পরপরই ইরানের দুর্বল হয়ে পড়া সামরিক সক্ষমতার কথা বিবেচনায় নিয়ে সাদ্দাম ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নেন। পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন সাদ্দামের পক্ষেই ছিল।

আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে পাহলভি রাজবংশের দীর্ঘ শাসনের অবসান হয়। দেশজুড়ে গণ–অভ্যুত্থানের মুখে রেজা পাহলভি ১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারি ইরান ছেড়ে পালিয়ে যান। ওই বছরই ইরানের নাম বদলে রাখা হয় ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান (ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান)।

শাহকে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিপ্লবী জনতা তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে ঢুকে পড়ে। ৫২ জন মার্কিন নাগরিককে প্রায় ৪৪৪ দিন জিম্মি করে রাখা হয়। এর জেরে ইরানের ওপর প্রথম দফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ক্ষমতাধর পশ্চিমা দেশগুলোও সাদ্দামের পক্ষে জোরেশোরে অবস্থান নেয়।

ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে ইরান বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সে সময়ে শুধু লিবিয়া ও সিরিয়া দেশটির পক্ষ নিয়েছিল।

ইসলামি বিপ্লব ওই সময় ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব কমিয়ে দিয়েছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ক্ষমতার দ্বন্দ্বে খোমেনি নিজের নেতৃত্ব সুসংহত করতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। নতুন শাসকদের প্রতি সামরিক বাহিনীর আনুগত্য নিশ্চিত করতে বহু সামরিক কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড, কারাগারে পাঠানো কিংবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয় বলে জানা যায়। ইরানের এ আপাত দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সাদ্দাম ইরাকের প্রভাব বাড়াতে ও বিদ্রোহ ঠেকাতে চেয়েছিলেন।

সাদ্দাম ও খোমেনির মধ্যে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বও ছিল। দুই নেতা একে অপরের তীব্র বিরোধী ছিলেন। ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার আগে শাহবিরোধী কর্মকাণ্ডের কারণে ইরান থেকে নির্বাসিত হয়ে খোমেনি ১৯৬৫ সালে ইরাকে যান এবং নাজাফে বসবাস শুরু করেন।

১৯৭৮ সালে ইরাক সরকারের চাপে খোমেনি এ দেশ ছাড়তেও বাধ্য হন এবং ফ্রান্সে চলে যান। সেখানে তিনি শিয়াদের ওপর সাদ্দামের দমন–পীড়নের প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেন। ইরানে ইসলামি বিপ্লবের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর খোমেনি সাদ্দামকে ইরাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আহ্বান জানান।

ইরানের সঙ্গে ইরাকের দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধও সাদ্দামের জন্য হামলার একটি অজুহাত তৈরি করে দেয়।

১৯৮০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ইরাকের বিভিন্ন বিমানঘাঁটি থেকে একের পর এক যুদ্ধবিমান ইরানের আকাশে ঢুকে পড়ে। যুদ্ধবিমানগুলো থেকে ইরানের বিভিন্ন বিমানঘাঁটি, সামরিক স্থাপনা, বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার ও নৌবন্দরে হামলা চালানো হয়।

ইরাকের বিমানবাহিনীর হামলায় ইরানের বিমানবাহিনীর অবকাঠামোর বড় একটি অংশ এবং দেশটির অধিকাংশ জ্বালানি সংরক্ষণাগার ধ্বংস হয়ে যায়। তবে আকস্মিক এ হামলার পরও ইরানের যুদ্ধবিমান অধিকাংশ অক্ষত থেকে যায়। ইরান এ হামলার নিন্দা জানায় এবং দেশটিতে বিমান হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছিল বলে অভিযোগ করে।

এরপর ইরানে শুরু হয় ইরাকের পদাতিক বাহিনীর আগ্রাসন। মধ্যপ্রাচ্যে এক ভয়াবহ প্রাণঘাতী যুদ্ধের সূচনা হয়।

ইরাকি বাহিনী ইরানের তেলসমৃদ্ধ সীমান্তবর্তী খুজেস্তান অঞ্চলে স্থল অভিযান শুরু করে। প্রথম দিকে ইরাকের অগ্রযাত্রা সফল হয়। নভেম্বরের মধ্যে তারা ইরানের খোররামশাহ শহর দখলসহ আরও কিছু ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে নেয়।

শিগগিরই ইরানের কঠোর প্রতিরোধের মুখে ইরাকি বাহিনীর অগ্রযাত্রা থেমে যায়। নিয়মিত সামরিক বাহিনীর সঙ্গে বিপ্লবী মিলিশিয়ারা যোগ দেওয়ায় ইরানের প্রতিরোধ আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

সাদ্দাম ভেবেছিলেন, ইসলামি বিপ্লবোত্তর ইরানের সমাজব্যবস্থায় যে গভীর বিভেদ তৈরি হয়েছিল, তাতে দেশটির সাধারণ জনগণ হয়তো বিপ্লবী সরকারকে সমর্থন দেবে না। কিন্তু বাস্তবে উল্টোটি ঘটেছিল। সাধারণ মানুষ ভিনদেশের আক্রমণ থেকে নিজেদের দেশ রক্ষায় বিপ্লবী সরকারকে সমর্থন দেয় এবং বহু মানুষ স্বেচ্ছাসেবী যোদ্ধা হিসেবে ইরানের বাসিজ ফোর্সে যোগ দেয়। বাসিজ যোদ্ধাদের খুব বেশি প্রশিক্ষণ না দিয়েই যুদ্ধের ময়দানে পাঠানো হতো।

ইরাকের প্রশিক্ষিত ও দক্ষ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বাসিজ যোদ্ধারা ইরানের কার্যকর অস্ত্র হয়ে ওঠেন। বাসিজ যোদ্ধাদের ব্যবহার করে ইরান প্রতিপক্ষের সেনাবাহিনীর ওপর ‘মানব ঢেউ’ চালাত। অর্থাৎ বহু যোদ্ধা একযোগে প্রতিপক্ষের ওপর আক্রমণ করতেন। এখানে যোদ্ধাদের দক্ষতার চেয়ে সংখ্যাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে প্রাণহানির ঘটনা বেশি ঘটে। ইরানের বহু শিশুও বাসিজ যোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধে অংশ নেয়।

এভাবে ১৯৮১ সালে ইরান পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। ১৯৮২ সালের শুরুতেই তারা ইরাকি বাহিনীর হাতে হারানো প্রায় সব ভূখণ্ড পুনর্দখল করে নেয়।

ওই বছরের শেষ নাগাদ ইরাকের বাহিনী যুদ্ধ শুরুর আগের সীমান্তরেখায় ফিরে গেলে দেশটির সরকার শান্তি উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু খোমেনির নেতৃত্বাধীন ইরান তা প্রত্যাখ্যান করে।

খোমেনির লক্ষ্য ছিল, সাদ্দাম সরকারকে উৎখাত করা। এ লক্ষ্যে ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৮২ সালের জুলাইয়ে ইরান ইরাকের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে এবং প্রথমবার ইরাকের বন্দরনগরী বসরা দখলের চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যর্থ হয়। পরে ইরান আরও কয়েকবার বসরা দখলের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সফল হয়নি।

ইরাক ১৯৮৪ সালে যুদ্ধে নিষিদ্ধ রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার শুরু করে। এ বিষয়ে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়ার কয়েক বছর পর জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে ইরাকের এ কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানায়।

১৯৮৮ সালের মার্চে উত্তর–পূর্ব ইরাকে বেসামরিক কুর্দিদের ওপর অন্তত ৩৯টি রাসায়নিক হামলা চালায় ইরাকি বাহিনী। কারণ, কুর্দি বিদ্রোহীরা ইরানকে সমর্থন দিয়েছিল। হামলায় ইরাকের কুর্দি–অধ্যুষিত হালাবজা শহরে প্রায় পাঁচ হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হন।

ইরাক সারিন ও অন্যান্য নার্ভ এজেন্ট এবং মাস্টার্ড গ্যাস ব্যবহার করেছিল বলে পরে বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে। রাসায়নিক হামলায় নিহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই ছিল নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষ। আরও হাজার হাজার মানুষ পরবর্তী সময়ে বিষক্রিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যায় ভুগেছেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা বেসামরিক লোকজনের ওপর এসব হামলার তীব্র নিন্দা জানান। ১৯২৫ সালে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী জেনেভা প্রটোকল অনুমোদনের পর নিজ দেশেই কুর্দিদের ওপর ইরাকের হামলাকে রাসায়নিক অস্ত্রের সবচেয়ে স্পষ্ট ও প্রাণঘাতী ব্যবহারের উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।

ইরান আক্রমণাত্মক অবস্থানে চলে গেলে ইরাক নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করে তোলে। এতে যুদ্ধে একধরনের অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। সীমান্ত বরাবর বিস্তৃত একটি রণক্ষেত্রে দুই পক্ষের লড়াই চলতে থাকে। উভয় পক্ষ শহর, সামরিক স্থাপনা, তেল স্থাপনা ও তেল পরিবহনব্যবস্থার ওপর বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো পারস্য উপসাগরে যুদ্ধজাহাজ পাঠায়, যাতে বৈশ্বিক বাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যায়।

ইরানের সেনাসদস্য বেশি থাকলেও ইরাকের হাতে ছিল আধুনিক অস্ত্র ও উন্নত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত দক্ষ বাহিনী। সৌদি আরব, কুয়েত ও অন্যান্য আরব দেশ সরাসরি ইরাককে সহায়তা করছিল। উদ্দেশ্য ছিল, ইরানের ইসলামি বিপ্লব যেন প্রতিবেশী আরব দেশগুলোয় ছড়িয়ে পড়তে না পারে।

কয়েক বছর ধরে চলা যুদ্ধে বারবার ব্যর্থ অভিযানগুলোর কারণে ইরানের মনোবল তত দিনে অনেকটাই ভেঙে পড়ে। ইরাকও ধারাবাহিকভাবে স্থল হামলা চালিয়ে যায়। উভয় দেশই বোঝে, এ যুদ্ধে কারও চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আশা খুব ক্ষীণ।

১৯৮৮ সালের জুলাইয়ে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় নিরাপত্তা পরিষদের রেজোল্যুশন ৫৯৮ অনুযায়ী দুই দেশ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। ১৯৮৮ সালের ২০ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে ইরান–ইরাক যুদ্ধ শেষ হয়।

ইরান–ইরাক যুদ্ধে মোট হতাহতের সংখ্যা নিয়ে নিশ্চিত কোনো হিসাব নেই। বিভিন্ন হিসাবে এ সংখ্যা ১০ লাখ থেকে ২০ লাখ দেখানো হয়েছে। নিহত ব্যক্তির সংখ্যা আনুমানিক পাঁচ লাখ, যার মধ্যে ইরাকি বাহিনীর হামলায় সে দেশে নিহত কয়েক হাজার কুর্দিও রয়েছেন।

২০২০ সালে ইরান–ইরাক যুদ্ধ নিয়ে আল–জাজিরায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাগদাদের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিটিক্যাল ডিসিশন সেন্টারের চেয়ারম্যান হাদি জালো মারি বলেন, ‘ইরান–ইরাক যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করেছিল। যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে ঘটে যাওয়া অধিকাংশ ঘটনার শিকড় এ যুদ্ধ পর্যন্ত টেনে নেওয়া যায়।’

এ যুদ্ধের কারণে দুই দেশ যে ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে গেছে, তার প্রভাব তাদের সীমানার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। এই সংঘাত অঞ্চলটিকে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের দিকে ঠেলে দেয়। কারণ, যুদ্ধটিকে সুন্নি নেতৃত্বাধীন ইরাক ও শিয়া বিপ্লবী ইরানের মধ্যকার সংঘাত হিসেবে দেখা হয়েছিল।

১৯৯০ সালে ইরাকের কুয়েত আক্রমণের পটভূমিও তৈরি হয়েছিল ইরাক–ইরান যুদ্ধের সময়। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে সাদ্দাম হোসেন কয়েক বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছিলেন। তা নিয়ে বিরোধের জেরে সাদ্দাম কুয়েত আক্রমণ করে বসেন।

কুয়েত আক্রমণের পর ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে ইরাকের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট। এরপর জাতিসংঘের আরোপ করা কঠোর নিষেধাজ্ঞায় ইরাকের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনে সাদ্দাম হোসেনের সরকারের পতন ঘটে।

২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ইরাকের আদালতের রায়ের পর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে সাদ্দাম হোসেনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

{তথ্যসূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, আল–জাজিরা, হিস্ট্রি ডটকম, আন্তর্জাতিক তথ্য ও গবেষণা–সেবা প্রতিষ্ঠান ইবিএসসিও}

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ