আমরা কুমিল্লায় এআই নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা করছি
৩১ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১১:০০ AM

কুমিল্লায় অল্প পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করে একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন হালিমা গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল কালাম হাসান। ২০১০ সালে হালিমা টেলিকম প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু। তিনি কুমিল্লার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, প্রযুক্তিশিল্প ও কর্মসংস্থান নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কুমিল্লা প্রতিনিধি আবদুর রহমান
কুমিল্লার অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি কী? ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের মাঝে অবস্থিত এই জেলাকে বড় শিল্প ও বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা কতটা?
আবুল কালাম হাসান: কুমিল্লা শিক্ষা-সংস্কৃতির জন্য পরিচিত। এখানে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বেশি। গত ৫ থেকে ১০ বছরে কুমিল্লা ও আশপাশের অনেক মানুষ প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বিদেশে কাজ করা দক্ষ তরুণদের অনেকে দেশে ফিরছেন। তাঁদের কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে। কুমিল্লায় ইপিজেড আছে, কৃষি ও মৎস্য খাত ভালো করছে। কিন্তু ঢাকা ও চট্টগ্রামের মাঝখানে অবস্থিত হলেও কুমিল্লা বড় বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারেনি। তাই কুমিল্লাকে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। এতে শিল্প-বাণিজ্যের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
ইপিজেডের বাইরে আগামী ৫ থেকে ১০ বছরে কোন খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বেশি?
আবুল কালাম হাসান: প্রযুক্তিশিল্পের সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। আমি নিজেই কুমিল্লায় মুঠোফোনের সরঞ্জাম ও মুঠোফোন তৈরি করছি। এতে প্রমাণ হয়, ঢাকার বাইরেও প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন সম্ভব। লালমাইয়ে প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭ দশমিক ৮৮ একর জমিতে নলেজ পার্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমার জানামতে, কাজ অনেক আগে শেষ হলেও এটি এখনো চালু হয়নি। এটি চালু করে তরুণদের প্রযুক্তিবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। কুমিল্লার শিক্ষিত তরুণদের দক্ষ করে তুলতে পারলে এই জেলা বড় প্রযুক্তিকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে।
কুমিল্লায় নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ও ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা কী?
আবুল কালাম হাসান: প্রশাসনিক জটিলতা বড় বাধা। জমি কেনা কিংবা ব্যাংকঋণের জন্য সম্পত্তি বন্ধক রেখে কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিতে গিয়ে নিবন্ধনের কাজে আমাকে ১৫ থেকে ২০ দিন রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুরতে হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ীই এ রকম সমস্যায় পড়েছেন। ওয়ান–স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে এক জায়গা থেকেই প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা দরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ (এনবিআর) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়মকানুন নিয়েও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ আছে। বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তারা নিবন্ধন, কর ও ভ্যাটের প্রক্রিয়া দেখে ভয় পেয়ে যান। শুরুতেই কাগজপত্র সংগ্রহে দীর্ঘ সময় লেগে গেলে তাঁদের উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ কমে যায়। সে জন্য বিনিয়োগ বাড়াতে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে কী করা দরকার?
আবুল কালাম হাসান: আমিও একসময় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ছিলাম। ধাপে ধাপে ব্যবসা বড় হয়েছে। কিন্তু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নিয়মকানুন অনেক জটিল। ব্যাংকঋণ নিতে তাঁদেরও বড় ব্যবসায়ীদের মতো কাগজপত্র দিতে হয়। এসব প্রস্তুত করতেই তাঁদের পুঁজি শেষ হয়ে যেতে পারে। ব্যবসার আকার অনুযায়ী আইন ও নিয়মকানুন হওয়া উচিত। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য একই প্রক্রিয়া থাকবে—এটা হতে পারে না। ব্যাংকঋণের শর্ত সহজ করার পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শুরুতেই তাঁদের নিরুৎসাহিত করা হলে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে না।
কুমিল্লায় নারী উদ্যোক্তা ও তরুণেরা কোন ধরনের উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত। তাঁদের জন্য কী করা উচিত?
আবুল কালাম হাসান: আমার বিভিন্ন কারখানায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ শ্রমিক কাজ করেন। তাঁদের প্রায় ৯০ শতাংশই গ্রামীণ নারী। তাঁরা মুঠোফোনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য তৈরি করেন। প্রশিক্ষণ ও সুযোগ পেলে নারীরা প্রযুক্তিশিল্পেও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারেন। এ ছাড়া কুমিল্লার নারীরা এখন এসএমই খাতে বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত। তাঁরা মূলত পোশাক, হস্তশিল্প ও খাবারের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তবে বড় কোনো উদ্যোগের সঙ্গে তাঁরা এখন পর্যন্ত নেই। নারী উদ্যোক্তাদের পুঁজি, প্রশিক্ষণ ও ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ বাড়াতে হবে। পোশাক, সেলাই ও প্রসাধনসামগ্রী নিয়ে যাঁরা উদ্যোগ নিতে চান, তাঁদের জন্য বিশেষ সুবিধা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
এদিকে ই-কমার্সের মাধ্যমে এখন ঘরে বসেই ব্যবসা করা যায়। এভাবে অনেক তরুণ মধু, ঘি, জামাকাপড় ও এমনকি মাছ বিক্রি করছেন। জুতা কিংবা হস্তশিল্প পণ্যও অনলাইনে বিক্রি করা সম্ভব। রান্না জানেন—এমন তরুণেরা ছোট পরিসরে খাবারের ব্যবসা করছেন। তরুণদের উচিত, নিজের পড়াশোনা ও দক্ষতার সঙ্গে মিল রেখে ব্যবসা শুরু করা। শুধু অন্যের পরামর্শে বা ইউটিউবের অনুপ্রেরণায় উদ্যোগ নেওয়া ঠিক নয়। পণ্য তৈরি থেকে বাজারজাত করা পর্যন্ত ব্যবসার প্রতিটি ধাপ বুঝতে হবে। এখন ই-কমার্সের মাধ্যমে কম পুঁজিতে মধু, ঘি, পোশাক, মাছ, জুতা ও হস্তশিল্পের পণ্য বিক্রি করা সম্ভব।
হালিমা গ্রুপের ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
আবুল কালাম হাসান: আমি হালিমা গ্রুপকে কুমিল্লার প্রতিষ্ঠান হিসেবেই বড় করতে চাই। আমাদের প্রধান কার্যালয় ও কারখানা এখানে। নতুন প্রযুক্তি নিয়ে এখান থেকেই কাজ করতে চাই। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ। তাই আমরাও কুমিল্লায় এআই নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা করছি। বর্তমানে আমাদের কারখানায় দেশের ১১টি ব্র্যান্ডের মুঠোফোন তৈরি করি। এসব মুঠোফোন তৈরি করেন গ্রামের নারীরা। অনেক শ্রমিক মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করেন। স্থানীয়ভাবে শিল্পকারখানা গড়ে উঠলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এতে পরিবারের আয় বাড়ে; শক্তিশালী হয় স্থানীয় অর্থনীতি।
আগামী এক দশকে কুমিল্লাকে বিনিয়োগবান্ধব ও কর্মসংস্থানমুখী অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করতে কী করা উচিত?
আবুল কালাম হাসান: প্রথমত, ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের যোগাযোগব্যবস্থা আরও উন্নত করে যাতায়াতের সময় কমাতে হবে। দ্বিতীয়ত, কুমিল্লা শহরের যানজট নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পিত ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, জেলা প্রশাসন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, হাইটেক পার্ক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। আগামী ৫ থেকে ১০ বছরে আমরা কুমিল্লাকে কোথায় নিয়ে যেতে চাই, তার একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করা প্রয়োজন। সরকার ও স্থানীয় উদ্যোক্তারা একত্রে কাজ করলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের পর কুমিল্লা দেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক শহর হয়ে উঠতে পারে। মানুষের জন্য নিজ এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা গেলে স্থানীয় অর্থনীতির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিও উপকৃত হবে।
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পর্কিত সংবাদ
চীনা বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে নজর ব্যাংকগুলোর, খুলছে চায়না ডেস্ক
৩১ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৯:০০ AM · প্রথম আলো
