শাহজাদপুর সংবাদ

আপাত স্বস্তি, আছে সংস্কারের চাপ

৩১ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৮:৫২ AM

আপাত স্বস্তি, আছে সংস্কারের চাপ

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের প্লেনারি মিটিংয়ে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমান। ইউএনওয়েব টিভি বৈঠকটি সরাসরি সম্প্রচার করে। বৈঠকের শুরুতে জি-৭৭-এর পক্ষে উরুগুয়ের প্রতিনিধি বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

প্রস্তাবে বলা হয়, করোনা মহামারি, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক সংঘাত, বৈশ্বিক অভিঘাত—এসব কারণে বাংলাদেশের প্রস্তুতি ঘাটতি আছে। এমন প্রেক্ষাপটে প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়। বৈঠকে অংশ নেওয়া কোনো দেশের প্রতিনিধি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেননি।

ফ্রান্স, কানাডা ও আয়ারল্যান্ডের (ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে) প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণের সময় পেছানোর বিষয়ে সমর্থন দিয়ে বক্তব্য দেন। তবে সবাই তাঁদের বক্তব্যে বাংলাদেশে সংস্কারের তাগিদ দেন। জাতিসংঘ আরও বলেছে, বাংলাদেশ ও নেপালের এই সময় বাড়ানোর বিষয়টি ব্যতিক্রমী উদ্যোগী হিসেবে বিবেচিত হবে। এর মানে, ভবিষ্যতে অন্য কোনো দেশের জন্য এটি উদাহরণ হবে না। জাতিসংঘ আরও বলেছে, ২০২৭ সালের শেষে বাংলাদেশ কী প্রস্তুতি নিচ্ছে, এর অগ্রগতি নিয়ে একটি মধ্যবর্তী মূল্যায়ন করবে।

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতির জন্য আরও তিন বছর সময় পেল বাংলাদেশ। অর্থনীতিতে এখন নানামুখী চাপ আছে। এই চাপের সময়ে প্রস্তুতির জন্য বাড়তি সময় নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দেবে। এলডিসি উত্তরণ হলে যেসব বাণিজ্যসুবিধা উঠে যেত, সেসব সুবিধা অন্তত ২০২৯ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত বহাল থাকবে। সুবিধা পাওয়ার তালিকায় আছে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা, ভর্তুকি, নগদ সহায়তার সুযোগ, নমনীয় শর্তে ঋণ পাওয়া ইত্যাদি।

এদিকে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকালে বাড়তি তিন বছরের মধ্যে রাজস্ব ও আর্থিক খাত, ব্যবসাসহায়ক পরিবেশ, বৈচিত্র্যময় রপ্তানি খাতসহ বিভিন্ন বিষয়ে চলমান সংস্কারের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পেছানোর জন্য জাতিসংঘের কাছে অনুরোধ করেছিল বাংলাদেশ সরকার। ছয়-সাত মাস ধরে নানা প্রক্রিয়া শেষে গত বৃহস্পতিবার রাতে বাংলাদেশ ও নেপালের জন্য বাড়তি সময়ের প্রস্তাব অনুমোদন দেয় জাতিসংঘ। আগামী ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের কথা ছিল। সময় বাড়ানোর ফলে এখন ২০২৯ সালের নভেম্বর মাসে উত্তরণ হবে বাংলাদেশের।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ও নিট পোশাক মালিকের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটি সরকার ও ব্যবসায়ীদের জন্য স্বস্তির খবর। এ বছর এলডিসি উত্তরণ হয়ে গেলে শুধু শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা ছাড়া অন্য সব সুবিধা উঠে যেত। এই তিন বছরকে কাজে লাগাতে হবে। ভালো ছাত্ররা যেমন সারা বছর পড়াশোনা করে, তেমনি প্রস্তুতি হিসেবে আগামী তিন বছরজুড়েই প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো করতে হবে। তিন বছর সময় দিয়েছে বলে এক বছর বসে থাকলে চলবে না।

ফজলুল হক আরও বলেন, এলডিসি উত্তরণের সব প্রস্তুতি যেন পোশাক খাত নিয়ে। ইদানীং ওষুধশিল্প নিয়ে কিছু কথা হচ্ছে। কিন্তু চামড়া ও চামড়াজাতীয় পণ্য, প্লাস্টিক, কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো নিয়েও ভাবতে হবে। এসব নিয়ে নভেম্বর মাস থেকেই কাজ শুরু করবে এফবিসিসিআই।

এখন এলডিসি উত্তরণ হলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ত। কারণ, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা পাওয়া যাবে না। তৈরি পোশাক হলো সবচেয়ে বড় রপ্তানি পণ্য।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, এলডিসি হিসেবে পাওয়া শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা উঠে গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ বা বছরে প্রায় ৬৩৮ কোটি ডলার কমতে পারে। এটি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) হিসাব।

এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ ২০২৯ সাল পর্যন্ত এমনিতেই শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা পাবে। এলডিসি উত্তরণের পরও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, চীনের মতো বড় বাজারে আরও তিন বছর পর্যন্ত এই সুবিধা পাওয়া যাবে।

এলডিসি উত্তরণ হলে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ত ওষুধশিল্প। এলডিসি থেকে বের হলে ওষুধশিল্পের ওপর মেধাস্বত্ব বিধিবিধান আরও কড়াকড়ি হবে। আপাতত আগামী তিন বছরের জন্য স্বস্তি পাওয়া গেল। এলডিসি থাকার কারণে বাংলাদেশের কিছু ওষুধ উৎপাদনে এই তিন বছর মেধাস্বত্বের বিধিবিধান আরোপ হবে না। মূল প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পেটেন্ট লাইসেন্স লাগবে না। এতে উৎপাদকের খরচ কমায়। এতে ওষুধের উৎপাদন খরচ কমিয়ে রাখা সম্ভব হবে। বাংলাদেশে উৎপাদিত প্রায় ২০ শতাংশ ওষুধ এমন সুবিধা পায় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

এলডিসি হিসেবে যেকোনো দেশ তার দেশে উৎপাদিত পণ্য বা সেবার ওপর নগদ সহায়তা ও ভর্তুকি দিতে পারে। বাংলাদেশ এখন কৃষি ও শিল্প খাতের নানা পণ্য বা সেবায় ভর্তুকি দেয়। এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পেছানোয় ভর্তুকি ও নগদ সহায়তা অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে।

এ ছাড়া এলডিসি হিসেবে নমনীয় শর্তে বিদেশি ঋণের সুযোগ অব্যাহত থাকবে। আবার এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে বৈশ্বিক সংস্থাগুলোতে বাংলাদেশের চাঁদার পরিমাণ বেড়ে যাবে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নত দেশগুলো স্বল্পোন্নত দেশের শিক্ষার্থীদের নানা ধরনের বৃত্তি দেয়। এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে এ ধরনের বৃত্তির সংখ্যা কমে যাবে।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সরকার যখন এলডিসি উত্তরণ পেছানোর আবেদন করে, তখন জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) বাংলাদেশ নিয়ে মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করে; যা সংকট মূল্যায়ন প্রতিবেদন হিসেবে পরিচিত। উল্লেখ্য, এলডিসি তালিকাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে কোন দেশ বের হবে, তা মূল্যায়ন করার দায়িত্ব সিডিপির।

সিডিপির বাংলাদেশ নিয়ে সংকট মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থায় এর প্রভাব, বৈশ্বিক বাণিজ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা বাংলাদেশের জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল করা, কর রাজস্ব বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ দ্রুত বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে টেকসই করা ও রূপান্তরে ভূমিকা রাখে এমন ব্যয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া।

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এ বছরই এলডিসি উত্তরণের বিষয়ে অনড় থাকার নীতি নিয়েছিল। গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিন বছর সময় চেয়ে অনুরোধ করে। সেই অনুরোধের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের কাছে গত ২১ জুলাই সুপারিশ করেছে ইকোসক।

জাতিসংঘের কাছে পাঠানো চিঠিতে সরকারের যুক্তি ছিল, সময়সীমা বাড়ানো হলে সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, চলমান সংস্কার সংহত করা ও স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজির (এসটিএস) অধীন অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সুযোগ পাওয়া যাবে। চিঠিতে আরও বলা হয়, এলডিসি উত্তরণে পাওয়া আগের পাঁচ বছরের প্রস্তুতির সময়ে একের পর এক দেশি ও আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে প্রস্তুতি গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়।

বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে রয়েছে কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ধীরগতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও তার প্রভাবে জ্বালানি ও খাদ্যবাজারে অস্থিরতা, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কড়াকড়ি, বাণিজ্য পুনরুদ্ধারে বিলম্ব, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থায় বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তা। দেশি সংকটের মধ্যে আছে আর্থিক খাতে অনিয়ম, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন এখনো নিষ্পত্তি না হওয়া।

১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকাভুক্ত হয়। এলডিসিভুক্ত থাকার সুবাদে পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ নানা সুযোগ পেয়ে এসেছে। জাতিসংঘ নিজেদের সদস্যদেশগুলোকে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ—এই দুই ভাগে ভাগ করে। এলডিসি তালিকার দেশগুলোও উন্নয়নশীল দেশ। উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে যারা একটু পিছিয়ে থাকে, অন্য দেশের সহায়তা লাগে—এমন দেশকে এলডিসিভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে পুরোদমে উন্নয়নশীল দেশ হবে।

তিন বছর অন্তর এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর ত্রিবার্ষিক মূল্যায়ন হয়। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এই তিন সূচকের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়, কোনো দেশ উত্তরণের যোগ্য কি না। যেকোনো দুটি সূচকে উত্তীর্ণ হতে হয় অথবা মাথাপিছু আয় নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ হতে হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব মানদণ্ড অবশ্য পরিবর্তিত হয়।

বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়। সেগুলো হলো মোট জাতীয় আয় (জিএনআই), মানবসম্পদ সূচক (এইচএআই) ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি সূচক (ইভিআই)। ২০২১ সালেই চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করা হয়েছিল যে বাংলাদেশ ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে বের হবে।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ

আপাত স্বস্তি, আছে সংস্কারের চাপ | শাহজাদপুর সংবাদ