শাহজাদপুর সংবাদ

অর্ধেকের পর অর্ধেক—শেষ কোথায়?

১৭ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৩:৩৫ PM

তুমি বাসা থেকে স্কুলের উদ্দেশে রওনা দিয়েছ। ভাবো তো, গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে তোমাকে প্রথমে পুরো পথের অর্ধেক পার হতে হবে। তারপর যা বাকি রইল, তার অর্ধেক। তারপর আবারও বাকি অংশের অর্ধেক…। এভাবে যদি বাকি পথের অর্ধেক পার হওয়ার খেলা চলতেই থাকে, তবে প্রশ্ন হলো: তুমি কি আদৌ কখনো স্কুলে পৌঁছাতে পারবে?

শুনতে হাস্যকর লাগতে পারে, কিন্তু আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিক দার্শনিক জেনো ঠিক এই প্রশ্নটাই তুলে গোটা দুনিয়াকে বিভ্রান্ত করে দিয়েছিলেন।

∎ জেনোর যুক্তি

জেনো বললেন, তুমি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় হাঁটছ। প্রথমে তোমাকে অর্ধেক পথ পার হতে হবে। তারপর বাকি পথের অর্ধেক। তারপর আবার বাকি অংশের অর্ধেক। এভাবে অসীমবার চলতেই থাকবে। প্রতিবার তুমি বাকি দূরত্বের অর্ধেক পার হবে, কিন্তু পুরোপুরি শূন্যে (অর্থাৎ গন্তব্যে) কখনোই পৌঁছাবে না। কারণ, সব সময়ই কিছু না কিছু দূরত্ব বাকি থেকে যাবে।

গাণিতিকভাবে লিখলে দাঁড়ায়,

১/২ + ১/৪ + ১/৮ + ১/১৬ + ... (অসীম পর্যন্ত)

জেনোর যুক্তি ছিল, যেহেতু এখানে অসীমসংখ্যক ধাপ আছে, আর অসীমসংখ্যক ধাপ পার হতে অসীম সময় লাগার কথা, তাই তুমি আসলে কখনোই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না। অথচ বাস্তবে আমরা প্রতিদিন হাঁটছি, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পৌঁছাচ্ছি! তাহলে গন্ডগোলটা কোথায়?

∎ আসল সমস্যাটা কোথায়?

সমস্যাটা হলো, আমরা ধরে নিচ্ছি ‘অসীমসংখ্যক ধাপ’ মানেই ‘অসীম সময়’। কিন্তু এটা সব সময় সত্যি নয়। আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল, এই অসীমসংখ্যক ভগ্নাংশ যোগ করলে যোগফলটা আসলে কত হয়?

১/২ + ১/৪ + ১/৮ + ১/১৬ + ... = ?

চলো, নিজেই হিসাব করে দেখি। প্রথম দুটি পদ যোগ করলে পাই ৩/৪। প্রথম তিনটি যোগ করলে পাই ৭/৮। প্রথম চারটি যোগ করলে পাই ১৫/১৬। খেয়াল করো, প্রতিবারই যোগফলটা ১ এর চেয়ে ছোট, কিন্তু ১ এর কাছাকাছি আসতে থাকছে।

তুমি যত বেশি পদ যোগ করবে, যোগফল তত বেশি ১ এর কাছাকাছি চলে যাবে, কিন্তু কখনো ১–কে ছাড়িয়ে যাবে না। গণিতে এই ধরনের অসীম যোগফলকে বলা হয় অসীম শ্রেণি (Infinite Series), আর যখন এমন একটা যোগফল একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার দিকে ক্রমাগত এগিয়ে যায়, তখন বলা হয় শ্রেণিটা সেই সংখ্যায় অভিসারী (Convergent)।

তাহলে উত্তরটা দাঁড়ায়,

১/২ + ১/৪ + ১/৮ + ১/১৬ + ... = ১

অর্থাৎ অসীমসংখ্যক ধাপ যোগ করলেও যোগফলটা একটা সসীম (finite) সংখ্যায় গিয়ে থামে! এটাই জেনোর প্যারাডক্সের আসল রহস্য ভাঙার চাবিকাঠি। অসীমসংখ্যক ধাপ থাকা মানেই অসীম সময় লাগবে, এ ধারণাটাই ভুল ছিল।

∎ সময়ের হিসাবেও একই ব্যাপার

ধরো, তুমি ১ মিনিটে পুরো পথ পার হও। প্রথম অর্ধেক পথ পার হতে সময় লাগবে ১/২ মিনিট। পরের অর্ধেক পার হতে ১/৪ মিনিট। এভাবে প্রতিটি ধাপে সময়ও কমতে থাকবে, ঠিক দূরত্বের মতোই। মোট সময় হবে—

১/২ + ১/৪ + ১/৮ + ... = ১ মিনিট

যদিও ধাপের সংখ্যা অসীম, প্রতিটি ধাপে লাগা সময়ও ক্রমাগত ছোট হতে থাকছে আর মোট সময় যোগ করলে সেটাও ঠিক ১ মিনিটেই গিয়ে থামে। এ কারণেই তুমি আসলে গন্তব্যে ঠিক ১ মিনিটেই পৌঁছে যাও। কোনো ‘অসীম সময়’ লাগে না। জেনোর ভুলটা ছিল এখানেই। তিনি ধরে নিয়েছিলেন অসীমসংখ্যক জিনিস যোগ করলে ফলাফলও অসীম হবে, অথচ প্রতিটি জিনিস যদি ক্রমে ছোট হতে থাকে, তাহলে তাদের যোগফল সহজেই একটা সসীম সংখ্যায় থেমে যেতে পারে।

আড়াই হাজার বছর আগের একটা সহজ প্রশ্ন: ‘বাকি পথের অর্ধেক অর্ধেক পার হতে থাকলে কী হয়?’, আজও গণিতের একটা মৌলিক ও সুন্দর ধারণা, অসীম শ্রেণির অভিসারিতা, শেখানোর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হয়ে টিকে আছে। তাই অসীমকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই; সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে জানলে অসীমও যে সসীম সীমানায় ধরা দেয়, এটি তারই এক দারুণ প্রমাণ।

গণিত ইশকুল

সহযোগিতায়:

বাংলাদেশ গণিত

অলিম্পিয়াড কমিটি

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ