৮৩ দ্বীপ, শত ভাষার দেশ
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১১:৩০ AM

প্রিয় পাঠক, প্রথম আলোয় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে আপনাদের লেখা। আপনিও পাঠান। গল্প-কবিতা নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। আপনার নিজের জীবনের বা চোখে দেখা সত্যিকারের গল্প; আনন্দ বা সফলতায় ভরা কিংবা মানবিক, ইতিবাচক বা অভাবনীয় সব ঘটনা। শব্দসংখ্যা সর্বোচ্চ ৬০০। দেশে থাকুন কি বিদেশে; নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ পাঠিয়ে দিন এই ঠিকানায়: readers@prothomalo.com
এককালে মনে করা হতো সমুদ্র পাড়ি দিতে সমুদ্রদেবতা পোসেইডনের অনুমতি লাগবে। ভাগ্যিস অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থেকে জাহাজে না এসে বিমানে এসেছি ভানুয়াতু, তাই আমার সে ঝক্কি নিতে হলো না।
তিন ঘণ্টা উড়ানযাত্রায় চলে এলাম পোর্ট ভিলা, ভানুয়াতুর রাজধানী ও সবচেয়ে বড় শহর।
ট্যাক্সি ভাড়া শুনেই বুঝেছি এ দেশ খুব ব্যয়বহুল। ১ মার্কিন ডলার ভাঙালে ১১৬ ভাতু মেলে। ১ কেজি চাল কিনতে লাগে ২৫০ ভাতু। ইউরোপের চেয়ে দাম বেশি বলব। রাস্তা দিয়ে ১১ আসনের যে মাইক্রোগুলো চলছে, এগুলোকে এখানে বাস বলে।
কোথাও অপরিষ্কারের ছিটেফোঁটা নেই। রাস্তার দুধারে মানুষ কম। ৮৩ দ্বীপ নিয়ে ভানুয়াতু! ৮৩ গল্প নিয়ে এ দেশ! মানুষ মাত্র তিন লাখ। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় এইটুকু একটা দ্বীপরাষ্ট্রে প্রায় ১১২টি স্বতন্ত্র ভাষা প্রচলিত। এমন এক সময় গেছে, তাদের এক দ্বীপের মানুষ আরেক দ্বীপের ভাষা বুঝতে পারত না। ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে এক সাধারণ ভাষা, যাকে বলে বিসলামা। প্রায় এক সপ্তাহ দেশটা ঘুরে মনে হলো, দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি ভাষাবৈচিত্র্যের দেশ ভানুয়াতু।
রাস্তায় ছেলেমেয়েদের ইউনিফর্ম দেখে বুঝতে পারলাম, স্কুল ছুটি হয়েছে। মেয়েদের পরনে স্কার্ট, ছেলেদের হাফপ্যান্ট আর শার্ট। ওদের গায়ের রোদপোড়া রং দেখে মনে হলো সমুদ্র, বন, আগ্নেয়গিরি আর মাটি দিয়েই যেন গড়ে উঠেছে তাদের জীবন।
প্রায় একই সময়ে ইংরেজ আর ফরাসিরা এখানে এসে উপনিবেশ গড়েছিল। এমনিতে ইংরেজ আর ফরাসিতে খুব সংঘাত, কিন্তু দীর্ঘ সময় এ দেশ ভাগাভাগি করে রাজত্ব কায়েমে বেশ সখ্য ছিল তাদের। ভানুয়াতু স্বাধীন হয় ১৯৮০ সালে। স্কুলগুলোতে ইংরেজি ও ফরাসি দুই ভাষাই পড়ানো হয়। সরকারি নীতিতেই দুই ভাষা বাধ্যতামূলক।
নিরাপত্তার বিষয় তুলতেই ট্যাক্সিচালক ফিলিপ বলল, ‘আমার দেশে চুরি-ছিনতাই নেই।’ তবু আমার মন থেকে খচখচানি যাচ্ছে না। আসলে জানতে চাইছি নারীরা কেমন নিরাপদ, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর। ফিলিপ বলল, ‘সন্ধ্যায় সাগরের পাড় ধরে হাঁটবেন। কেউ কোনো উৎপাত করবে না। ভানুয়াতু হলো যেমন খুশি তেমন করার দেশ।’
ট্রি হাউস নামের একটি হোস্টেলে শেয়ার্ড রুম বুক করেছিলাম। শেয়ার্ড রুমে খরচ কম। মালিক ভদ্রমহিলা যেই না পাসওয়ার্ড দিয়ে শেয়ার্ড রুমের দরজা খুলতে গেলেন, দরজা আর খোলে না। খোলে না মানে আর খুললই না। শেষে তিনি আমায় একটি সিঙ্গেল রুম দিলেন। আমার মাথায় যেন সৃষ্টিকর্তা হাত রাখলেন!
ভানুয়াতুর জীবন যেন সাজানো থাকে স্থানীয় বাজারে। বাজারে টেবিলের ওপরে সাজানো কাসাভা, তারো, ইয়াম আরও কত অচেনা ফল-সবজির জড়াজড়িই এই দ্বীপদেশের প্রতিদিনের জীবন। বাজার আশ্চর্য রকম পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল। এখানে নারীরা উৎপাদক ও বিক্রেতা। নারী নিজের পরিশ্রমে উৎপাদিত পণ্য নিজে বিক্রি করেন। নিজের আয়ের ওপর রয়েছে তাঁর অধিকার।
হাইডঅ্যাওয়ে দ্বীপে গিয়ে দেখি, এরা এক আজগুবি কাজ করে রেখেছে। সাগরের পানির নিচে একটা পোস্ট অফিস বানিয়েছে। ওয়াটারপ্রুফ পোস্ট কার্ড কিনে ১৫ ফুট পানির নিচে গিয়ে সেটি ওই পোস্ট অফিসে ফেলে আসতে হয়। ডাকপিয়ন নয়, এখানে চিঠি পৌঁছে দেয় ডুবসাঁতারু!
ভানুয়াতুর প্রধান প্রথা ‘চিফস নাকামাল’। ‘চিফস’ মানে হলো গোত্রের নেতা। ‘নাকামাল’ মানে হলো সমাজের মানুষদের নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৃহৎ ঘর। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পাশাপাশি ভানুয়াতু তার প্রাচীন এই প্রথা এখনো ধরে রেখেছে। নাকামালের ছাদ প্রায় মাটি ছুঁয়ে নেমে আসে। এটা চোখে পড়ার মতো বৈশিষ্ট্য। এটাকে এ-ফ্রেম বলে। ফ্রেমের কারণে এটি ঘূর্ণিঝড় সহনীয়। নাকামালে বসে আলোচকেরা পান করে একটি বিশেষ পানীয়-কাভা। এখানে এসে কাভা না খেলে ওরা বলে ‘তুমি তাহলে এলে কেন আমার দেশে?’
এক রাতে খেলাম ওদের জাতীয় খাবার লাপলাপ। মাংসের সঙ্গে কাসাভা, তারো, ইয়াম থেঁতো করে সবটা কলাপাতা দিয়ে মুড়িয়ে দিয়েছে। এটাই লাপলাপ।
পেপেও কালচারাল ভিলেজে এখনো একদল মানুষ আদি পূর্বপুরুষদের মতো সেজে তাঁদের জীবনধারা পর্যটকদের সামনে তুলে ধরেন। ভালো লাগল ব্যাপারটি।
ফেরার দিন দেখছি, দূরের সৈকতে বালুর ওপর কেউ জ্যামিতিক নকশা আঁকছেন। এটি তাঁদের আরেক বিশেষ ঐতিহ্য। দূরের সেই আঁকিয়ে ‘রেইনবো সার্পেন্টের’ মতো নকশা এঁকে যাচ্ছেন। এখানকার আদিবাসীদের এক দেবতা ছিলেন ‘কাত’। একদিন কাত অনেক কাঠের মূর্তি বানালেন। তাদের সামনে ঢোল বাজিয়ে নাচতে শুরু করলেন। ছন্দে একে একে মূর্তিগুলো প্রাণ পেল। এই মিথ ভাবতে ভাবতে ৯ সেপ্টেম্বর আমি ভানুয়াতু থেকে ফিজির পথে রওনা হচ্ছি।
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পর্কিত সংবাদ
রিয়াদে হামলার সতর্কতা জারির পরপরই বিকট বিস্ফোরণ
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১২:০০ PM · প্রথম আলো
সিএনএনসহ তিনটি সংবাদমাধ্যমকে হোয়াইট হাউসে নিষিদ্ধ করলেন ট্রাম্প
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১০:৫৪ AM · প্রথম আলো
জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব কে, তৃতীয় দফা ভোটেও কাটেনি ধোঁয়াশা
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৯:৫৬ AM · প্রথম আলো
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর নিয়ে ‘ফের আলোচনা শুরু’
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১২:১০ PM · রাইজিংবিডি
