শাহজাদপুর সংবাদ

সব সময় কাফনের কাপড় সঙ্গে রাখেন এই গায়ক

১২ আগস্ট, ২০২৬ এ ১০:৩০ AM

সব সময় কাফনের কাপড় সঙ্গে রাখেন এই গায়ক

মৃত্যু নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ভক্তদের আবেগাপ্লুত করে ফেলেছেন ভারতের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী লাকি আলী। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে জীবন ও মৃত্যুর অনিবার্যতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন তিনি। জানান, মৃত্যুর জন্য তিনি মানসিকভাবে প্রস্তুত। এমনকি ভ্রমণের সময় নিজের সঙ্গে ‘কাফনের কাপড়’ও রাখেন তিনি।

১৬ আগস্ট দুবাইয়ে একটি কনসার্টে গান গাওয়ার কথা রয়েছে লাকি আলীর। সেই আয়োজনের আগে তাঁর এমন মন্তব্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে। কয়েক প্রজন্মের শ্রোতার কাছে লাকি আলী শুধু একজন গায়ক নন, তাঁর গান অনেকের শৈশব, কৈশোর ও ব্যক্তিগত স্মৃতির অংশ। ফলে প্রিয় শিল্পীর মুখে মৃত্যুর কথা শুনে আবেগাপ্লুত হয়েছেন তাঁর ভক্তরা।

‘একদিন তো সবাইকে চলে যেতে হবে’অনুষ্ঠানে দর্শকদের সঙ্গে কথা বলার সময় লাকি আলী বলেন, তিনি ভক্তদের নিজের মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত করছেন না; বরং নিজেই সেই যাত্রার জন্য প্রস্তুত। লাকি আলীর ভাষায়, ‘আমি জানি, আমিও তোমাদের ভালোবাসি। একদিন তো আমাদের সবাইকে চলে যেতে হবে। আমি তোমাদের এর জন্য প্রস্তুত করছি না, কিন্তু আমি আসলে প্রস্তুত।’

এরপর নিজের সঙ্গে কাফনের কাপড় রাখার বিষয়টিও জানান তিনি। পবিত্র হজ পালনের সময় পুরুষেরা যে সাদা পোশাক পরেন, সেই ইহরামই তিনি ভ্রমণের সময় সঙ্গে রাখেন। মৃত্যুর পর সেটিই যেন কাফনের কাপড় হিসেবে ব্যবহার করা যায়—এমন ভাবনা থেকেই তাঁর এই প্রস্তুতি।

লাকি বলেন, ‘আমি যখনই ভ্রমণ করি, সঙ্গে আমার ইহরাম রাখি। এটিই আমার কাফনের কাপড়। যেখানে আমার মৃত্যু হবে, সেখান থেকেই আমাকে যেতে দিয়ো।’ মৃত্যুকে ঘিরে তাঁর এই নির্লিপ্ত ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গিই অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শকদের আবেগপ্রবণ করে তোলে।

ভক্তদের স্মৃতিতে লাকি আলীলাকি আলীর বক্তব্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রতিক্রিয়া জানান তাঁর ভক্তরা। কেউ লিখেছেন, ছোটবেলা থেকেই তাঁর গান শুনে বড় হয়েছেন। তাই প্রিয় শিল্পীর মুখে মৃত্যুর কথা শুনতে তাঁদের কষ্ট হয়েছে।এক ভক্ত লিখেছেন, লাকি আলীর কণ্ঠ তাঁর শৈশব ও সংগীতজীবনের স্মৃতির সঙ্গে মিশে আছে। তাঁকে নিজের যত্ন নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ওই ভক্ত বলেন, সামনে তাঁর জন্য আরও অনেক গান ও স্মৃতি অপেক্ষা করছে।

আরেকজন ভক্ত লাকি আলীর বিশ্বাসের প্রতি তাঁর দৃঢ়তার প্রশংসা করে দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন কামনা করেছেন। আসলে লাকি আলীর গানের বিশেষত্বই এমন—তাঁর গান কেবল শোনা হয় না, অনেকের জীবনের নির্দিষ্ট সময় ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।

অভিনেতার ছেলে থেকে স্বতন্ত্র গায়কলাকি আলী বলিউডের অভিনেতা মেহমুদের ছেলে। অভিনয়ের পরিবারে জন্ম হলেও শেষ পর্যন্ত সংগীতকেই নিজের প্রধান পরিচয় হিসেবে বেছে নেন তিনি।নব্বই দশকে স্বাধীন সংগীতের জগতে লাকি আলীর আবির্ভাব ছিল অনেকটাই ব্যতিক্রমী। সেই সময় মূলধারার বলিউডি গানের বাইরে তাঁর সুর, কণ্ঠ ও গায়কির ধরন শ্রোতাদের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করে।

‘ও সনম’ গানটি তাঁকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়। এরপর ‘এক পল কা জিনা’, ‘না তুম জানো না হাম’, ‘সফরনামা’সহ একের পর এক গান তাঁকে আলাদা জায়গা করে দেয় ভারতীয় সংগীতে।

বলিউডের সিনেমাতেও তাঁর কণ্ঠ শোনা গেছে। ‘কহো না... পেয়ার হ্যায়’, ‘বচনা এ হাসিনো’, ‘ইউভা’, ‘আনজানা আনজানি’ ও ‘তামাশা’র মতো সিনেমায় তাঁর গান শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নেয়।

চাকরি তাঁর জন্য ছিল নাসংগীতশিল্পী হওয়ার আগে জীবনের পথটা খুব একটা গোছানো ছিল না লাকি আলীর। এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই বলেছিলেন, সংগীতশিল্পী হওয়ার আগে তিনি ছিলেন ‘ভেলা’—অর্থাৎ কাজকর্মহীন।

তাঁর ভাষায়, ‘আমি তার আগে একেবারেই ভেলা ছিলাম। একদম ভেলা। কোনো কাজের ছিলাম না। আমি কোনো চাকরি ধরে রাখতে পারতাম না, কারণ চাকরি করার জন্য আমি তৈরি ছিলাম না।’

শৈশবের একটি বড় সময় তিনি খামারে কাটিয়েছেন। পশুপালন ও ঘোড়ার প্রজনন নিয়েও তাঁর আগ্রহ ছিল। কিন্তু ভারতে এ ধরনের কাজকে পেশা হিসেবে নেওয়ার সুযোগ তখন খুব বেশি ছিল না।

পরবর্তী সময়ে অভিনয়েও পা রাখেন তিনি। বাবা মেহমুদ তাঁকে অভিনয়ে উৎসাহিত করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সংগীতই তাঁর নিজের পথ হয়ে ওঠে।

কেন বলিউড থেকে দূরে সরে গেলেনমূলধারার বলিউডে কাজ করার সুযোগ থাকলেও একটা সময় সেখান থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন লাকি আলী। নিজের মতো করে গান করতে চাওয়ার তাগিদ থেকেই তাঁর এই সিদ্ধান্ত। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, নিজের স্বতন্ত্র গায়কি সত্তা তৈরি করতে চেয়েছিলেন। সেই অনুসন্ধানেরই অন্যতম ফল ‘ও সনম’।অভিনয়জীবনেও অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু মানুষের কাছ থেকে শেখার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। শ্যাম বেনেগালের মতো নির্মাতার সঙ্গে কাজ করেছেন। পাশাপাশি নাসিরুদ্দিন শাহ, শাবানা আজমি এবং ওম পুরির মতো অভিনয়শিল্পীদের কাছ থেকেও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন।তবে শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রের চেনা কাঠামোর চেয়ে নিজের সংগীতের জগতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজে পান লাকি আলী।

‘এআইয়ের আত্মা নেই’প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন নিয়েও কথা বলেছেন লাকি আলী। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে কিংবদন্তি শিল্পীদের কণ্ঠ নকল করার প্রবণতা নিয়ে তাঁর আপত্তি রয়েছে।

লাকির মতে, প্রযুক্তি কোনো শিল্পীর কণ্ঠস্বর হুবহু নকল করতে পারলেও সেই শিল্পীর অনুভূতি বা আত্মা পুনরায় তৈরি করতে পারে না। তাঁর মন্তব্য, ‘একজন শিল্পী সব সময়ই শিল্পী থাকবেন। এআই সব সময়ই আত্মাহীন থাকবে।’এ বক্তব্য লাকির সংগীতভাবনার সঙ্গেও বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ, লাকি আলীর গানের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তাঁর কণ্ঠ নয়, বরং কণ্ঠের আবেগ, সরলতা ও একধরনের ব্যক্তিগত অনুভব।

গালফ নিউজ, বলিউড বাবল অবলম্বনে

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ