শাহজাদপুর সংবাদ

সংশোধিত ঋণ বিধিমালা আগেরটির চেয়ে ভালো

২০ আগস্ট, ২০২৬ এ ৯:০০ AM

সংশোধিত ঋণ বিধিমালা আগেরটির চেয়ে ভালো

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি মার্জিন বা ঋণ বিধিমালার যে সংশোধন এনেছে, সেটি আগের বিধিমালার চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে। নতুন করে বেশ কিছু বিষয় এবার বাস্তবতার ভিত্তিতে আমলে নেওয়া হয়েছে। তাই আমি মনে করি, বাজারসংশ্লিষ্টদের জন্য এটি আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক হয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে আরও উন্নত ও বাজারবান্ধব করার সুযোগ ছিল বলে আমি মনে করি।

সংশোধিত এই বিধিমালায় বিনিয়োগকারীদের ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে কোম্পানির মূল্য আয় অনুপাত বা পিই রেশিও-৪০-এর যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, সেটি ঠিকই আছে। আবার পিইও রেশিও হিসাবের যে পদ্ধতি সেখানে বলা হয়েছে, কোম্পানির আগের চার প্রান্তিকের শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএসের যোগফলের ভিত্তিতে এই হিসাব করা হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ঋণসংক্রান্ত নীতিমালা যতটা দেখেছি, তাতে মনে হয়েছে—এটি আন্তর্জাতিক রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে যদি পিই রেশিওর সঙ্গে লেনদেনযোগ্য শেয়ারের বাজার মূলধন বা লেনদেনের পরিমাণের কিছু বিষয় যুক্ত করা যেত, তাহলে আরও ভালো হতো। কারণ, যখন কম লেনদেন হওয়া কম পিই রেশিওর শেয়ার ফোর্সড সেলের আওতায় আসবে, তখন দেখা যাবে—ওই শেয়ারের দামে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। সে ক্ষেত্রে এমনও হতে পারে ওই শেয়ার বিক্রি করতে গিয়ে মূল্য পতনের সীমা বা সার্কিট ব্রেকারে আটকে যেতে পারে। তখন কারও কাছে বেশি পরিমাণে ওই শেয়ার থেকে থাকলে তা বিক্রি করা কঠিন হবে।

দ্বিতীয় যে বিষয়টি খসড়া বিধিমালায় ছিল, কিন্তু চূড়ান্ত বিধিমালা থেকে বাদ পড়েছে, সেটি হচ্ছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সম্পদমূল্যের হিসাবের বিষয়টি। আমি মনে করি, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সম্পদমূল্য বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টি থাকলে ভালো হতো। কারণ, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এখন বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্পদের মান, যা বুক ভ্যালু বা সম্পদমূল্যের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। আমি মনে করি, সম্পদ মূল্যের বিষয়টি না থাকায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের ঋণের ক্ষেত্রে কিছুটা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ঋণের ক্ষেত্রে ১ অনুপাত ১, অর্থাৎ ১০০ টাকার বিনিয়োগের বিপরীতে ১০০ টাকা ঋণ—এই সহজ ব্যবস্থাটি ভালো হয়েছে। আগের বিধিমালায় এটি কিছুটা জটিল ছিল। এ ছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠান ঋণ দেবে, তাদের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে—মূলধনের চার গুণের বেশি ঋণ দেওয়া যাবে না। আমার মনে হয়, ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি কমাতে এটি করা হয়েছে। এটিকে আমি ভালো সিদ্ধান্ত বলেই মনে করি। কারণ, শেয়ারবাজার এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে ঋণ করে বিনিয়োগের ঝুঁকি আরও বেশি। তাই ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ও ঋণগ্রহণকারীর ঝুঁকি যতভাবে যতটা কমানো যাবে, ততই ভালো। এ ছাড়া শেয়ারের বিপরীতে ঋণ নিতে হলে একজন বিনিয়োগকারীর বাজারে ন্যূনতম তিন লাখ টাকা নিজস্ব বিনিয়োগ থাকার যে বিধানটি করা হয়েছে, সেটিও মোটামুটি ঠিক আছে। আগে এই সীমা পাঁচ লাখ টাকা ছিল। এখন তা তিন লাখ টাকায় কমিয়ে আনার ফলে আগের চেয়ে বেশিসংখ্যক বিনিয়োগকারী ঋণ নেওয়ার যোগ্য হবেন। জীবনবিমার শেয়ারের ক্ষেত্রে পিই রেশিওর পরিবর্তে সম্পদমূল্যের ভিত্তিতে ঋণ দেওয়ার বিধান করা হয়েছে। আমি মনে করি, এ ক্ষেত্রে জীবনবিমা কোম্পানিগুলোর লাইফ ফান্ডের সম্পদমান বিবেচনার কোনো শর্ত যুক্ত করা গেলে আরও ভালো হতো।

এ ছাড়া নতুন বিধিমালায় বলা হয়েছে, ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান একক কোনো শেয়ারে তার বিতরণ করা ঋণের ২০ শতাংশের বেশি ঋণ দিতে পারবে না। আগের বিধিমালায় এটি ২৫ শতাংশ ছিল। সেখান থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। আমি মনে করি, এটাও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। তাতে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের ঝুঁকি কমবে। সবশেষে আমি বলব, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি—মার্জিন ঋণ বাজারের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ২০১০ সালের শেয়ারবাজার ধসের পর ঋণাত্মক ঋণ হিসাব বা নেগেটিভ ইকুইটির কারণে অনেক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানই তাদের সক্ষমতা হারিয়েছে। ঋণসুবিধা সহজ করতে গিয়ে আবার যেন সেই ধরনের কোনো পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে ব্যাপারে সবার সচেতনতা দরকার। পাশাপাশি ঋণদাতাদেরও সতর্ক হতে হবে। বিনিয়োগকারীরাও না জেনে না বুঝে মানুষের কথা শুনে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করে যেন সর্বস্বান্ত না হন, সেটিও ঋণ নেওয়ার আগে ভাবতে হবে। পাশাপাশি আমি আশা করব, ঋণ বিতরণ থেকে শুরু করে ঋণের পরিস্থিতি নিয়মিতভাবে তদারকির আওতায় রাখতে হবে; যাতে ঋণ নিয়ে কোনো অনিয়ম না ঘটে এবং দীর্ঘমেয়াদি বাজারে নেতিবাচক কোনো প্রভাব ফেলতে না পারে।

লেখক পরিচিতি: শেয়ারবাজারের একটি সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ