শাহজাদপুর সংবাদ

শিশুকে কোরআন শেখানোর মৌলিক ৩ নীতি

৩১ আগস্ট, ২০২৬ এ ১১:১৭ AM

শিশুকে কোরআন শেখানোর মৌলিক ৩ নীতি

শিশুর কাছে কোরআন কীভাবে এবং কোন বয়সে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তা অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। শৈশবের কোমল মন কখনো কঠোর শাস্তির ভয় বা কঠিন হিসাব-নিকাশের বোঝা নেওয়ার মতো পরিণত থাকে না।

শৈশবে যদি কোরআন শেখার এই পবিত্র প্রক্রিয়াটি অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ভয়ভীতি বা শারীরিক শাসনের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তবে অবচেতনভাবেই শিশুর মনে আজীবনের জন্য এক বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।

কোরআন নিছক কোনো পাঠ্যবই নয়, এটি হৃদয়ের খোরাক। তাই শিশুকে ভীতি নয়, বরং অপার ভালোবাসা ও আনন্দের মধ্য দিয়ে কোরআনের সঙ্গে পরিচিত করাতে হবে।

ভীতি নয়, ভালোবাসার উন্মেষ

শিশুদের সামনে শুরুতেই পরকালীন কঠিন শাস্তির কথা তুলে না ধরে মহান আল্লাহর অসীম দয়া, অফুরন্ত নেয়ামত, বেহেশতের অপরূপ সৌন্দর্য এবং প্রিয় নবীর স্নেহশীল চরিত্রের গল্প বলতে হবে। কোরআনকে তাদের সামনে এক পরম নির্ভরতা ও শান্তির বার্তা হিসেবে তুলে ধরা প্রয়োজন।

রাসুল (সা.) শিক্ষাদান ও ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে সহজতার পথ বেছে নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা মানুষের জন্য সহজ করো, কঠিন কোরো না; সুসংবাদ দাও, বিমুখ ও আতঙ্কিত কোরো না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৯)

পরিবারে কোরআনি জীবনাচরণ

একটি শিশু বাইরে যা শোনে, তার চেয়ে ঘরে যা দেখে তা থেকে বেশি শেখে। শিশু যদি দেখে তার বাবা-মা মুখে কোরআনের কথা বলছেন কিন্তু আচরণে রাগ, অসততা বা অধৈর্য প্রকাশ করছেন, তবে তার মনে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।

পক্ষান্তরে পরিবারে যখন নিয়মিত নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, সত্যবাদিতা, পারস্পরিক সহানুভূতি ও কৃতজ্ঞতার জীবন্ত চর্চা থাকে, তখন শিশু বইয়ের পাতার বাণীর সঙ্গে বাস্তব জীবনের মেলবন্ধন খুঁজে পায় এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবেই কোরআনকে ভালোবাসতে শেখে।

কোরআন শিক্ষা স্থায়ী করার ৩টি মূলমন্ত্র

শিশুর জীবনে কোরআনের শিক্ষাকে স্থায়ী ও অর্থবহ করতে তিনটি মৌলিক বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া অপরিহার্য:

১. ধারাবাহিকতা: সপ্তাহে একদিন দীর্ঘ সময় বা এক ঘণ্টা একনাগাড়ে পড়ানোর চেয়ে প্রতিদিন মাত্র ১০-১৫ মিনিট হাসিমুখে পড়ানো মনস্তাত্ত্বিকভাবে বহুগুণ বেশি কার্যকর। নিয়মিত অল্প অল্প শেখা শিশুর স্মৃতিতে স্থায়ী রূপ নেয়।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল তা-ই, যা নিয়মিত পালন করা হয়—যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৫)

২. ইতিবাচক পরিবেশ: কোরআন পড়ার সময়টি যেন শিশুর কাছে আতঙ্কের না হয়ে আনন্দের উপলক্ষ হয়। কোনো অবস্থাতেই রুক্ষ ব্যবহার, ধমক বা শারীরিক প্রহারের মুখোমুখি শিশুকে করা যাবে না।

রাসুল (সা.) কোমলতার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন, ‘যে কাজের মধ্যেই নম্রতা ও কোমলতা থাকে, তা সেই কাজকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে; আর যে কাজ থেকে কোমলতা কেড়ে নেওয়া হয়, তা ত্রুটিপূর্ণ হয়ে পড়ে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৯৪)

৩. দরদি ও শিক্ষকের সান্নিধ্য: প্রতিটি শিশুর মেধা, মেজাজ ও শেখার গতি এক নয়। একজন দূরদর্শী ও মমতাময় শিক্ষক শিশুর মানসিক অবস্থা বুঝে পরম যত্নে তাকে তিল তিল করে গড়ে তোলেন।

শিক্ষকের স্নেহশীল দৃষ্টিভঙ্গিই শিশুর মনে কোরআনের প্রতি চিরস্থায়ী অনুরাগ সৃষ্টি করে। রাসুল (সা.) বলেছেন: ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে নিজে কোরআন শেখে এবং অপরকে শিক্ষা দেয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০২৭)

শেষ কথা

কোরআন শিক্ষার মূল লক্ষ্য শুধু কিছু আরবি অক্ষরের উচ্চারণ বা মুখস্থ করানো নয়; বরং সন্তানের হৃদয়ের গহিনে আল্লাহর বাণীর নূর প্রজ্জ্বলিত করা।

বয়স বা প্রতিযোগিতার সংকীর্ণ ছকে না বেঁধে সন্তানের মানসিক প্রস্তুতি ও ভালোবাসাকে প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন। মা-বাবার সুমধুর আচরণ এবং প্রতিদিনের আন্তরিক ছোট ছোট প্রচেষ্টাই একটি শিশুকে কোরআনের খাঁটি প্রেমিক হিসেবে গড়ে তুলবে।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ