শাহজাদপুর সংবাদ

শব্দহীন ড্রোন তৈরির চেষ্টা নির্মাতাদের

২৮ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৩:৫২ PM

শব্দহীন ড্রোন তৈরির চেষ্টা নির্মাতাদের

ডালাসের শহরতলি নর্থ গারল্যান্ডের বাসিন্দা অ্যাশলি শ্মিট প্রকৃতিপ্রেমী। তবে বাগানে এখন আর তিনি তেমন সময় কাটান না। যেসব স্থানীয় পার্কে সাইকেলে গিয়ে পোকামাকড়, টিকটিকি আর ব্যাঙের ছবি তুলতে ভালোবাসতেন, সেখানে যাওয়াও ছেড়ে দিয়েছেন। কারণ, প্রতিবেশীদের অনলাইন অর্ডারের পণ্য পৌঁছে দিতে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া ডেলিভারি ড্রোনের শব্দ তিনি সহ্য করতে পারছেন না।

৪৪ বছর বয়সী প্রশাসনিক সহকারী শ্মিট বলেন, এগুলো খুবই বিরক্তিকর একটা গুঞ্জন তোলে। এতে আমার ফাইট অর ফ্লাইট প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। তিনি বলেন, ড্রোন কাছে আসার সময় শব্দ শোনা যায়, ঠিক মাথার ওপর দিয়ে গেলে ঘরের ভেতর থেকেও শোনা যায়, আবার চলে যাওয়ার সময়ও শোনা যায়।

বাড়িতে দ্রুত পণ্য পৌঁছে দিতে অ্যামাজন ও ওয়ালমার্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেসব ড্রোন পাঠাচ্ছে, তার শব্দের মধ্যে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। শ্মিট তাদেরই একজন। যেসব শহরে শব্দ আগে থেকেই জীবনের নিয়মিত অংশ, সেখানেও ড্রোনের শব্দ আলাদাভাবে বিরক্ত করে। যানবাহনের একটানা শব্দ পটভূমিতে মিশে গেলেও ড্রোনের রোটরের আচমকা তীক্ষ্ণ আওয়াজ দৈনন্দিন গুঞ্জন ভেদ করে কানে বাজে।

যুক্তরাজ্যের স্যালফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকোস্টিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও সাইকোঅ্যাকোস্টিকসের অধ্যাপক আন্তোনিও তরিহা মার্তিনেজ বলেন, সামগ্রিক শব্দমাত্রা তুলনামূলক কম হলেও এ শব্দ বিশেষভাবে লক্ষণীয় হয়ে ওঠে।

বিমানের মতো নয়, ড্রোন নিচু উচ্চতায় ওড়ে এবং আবাসিক এলাকার ঠিক ওপর দিয়েও যেতে পারে। তরিহা মার্তিনেজ বলেন, যেসব জনগোষ্ঠী আগে উল্লেখযোগ্য বিমানের শব্দ অনুভব করেনি, তাদের এই শব্দের মুখে ফেলতে পারে ড্রোন। ফলে নিজেদের এলাকার শব্দপরিবেশে পরিবর্তনের প্রতি তারা বেশি সংবেদনশীল হতে পারে।

তিনি এমন গবেষণার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে দেখা গেছে, শব্দের উৎসকে নতুন, অনধিকার প্রবেশকারী বা ঘন ঘন মনে করলে মানুষ তাতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। উদাহরণ হিসেবে, ড্রোন ডেলিভারি সেবায় যারা উপকৃত হন, তারা শব্দে কম বিরক্ত হতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্যিক ড্রোন নিয়ন্ত্রণ করে ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ)। কোলাহলপূর্ণ ড্রোন ডেলিভারি কার্যক্রমের অনুমতি দেওয়ায় সংস্থাটি সমালোচনার মুখেও পড়েছে। এফএএ বলছে, জনগোষ্ঠীর উদ্বেগ মেটানোর প্রাথমিক দায়িত্ব অপারেটর ও স্থানীয় কমিউনিটি নেতাদের।

গ্রিনজেটস নামের একটি স্টার্টআপ শব্দের মাত্রা এবং সেই শব্দের ফ্রিকোয়েন্সি, দুটিই মোকাবিলার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিবিষয়ক প্রধান ড্যারেন জেমস এভাবেই কথাটি বলেন।

লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি এমন একটি প্রপালশন ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা ড্রোনের শব্দ অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ কমাতে পারে বলে তাদের দাবি। সাধারণ ড্রোনে খোলা বাতাস কেটে ঘূর্ণায়মান প্রপেলার ঘোরে, যা ওই তীক্ষ্ণ গুঞ্জন তৈরি করে। গ্রিনজেটস ঘূর্ণায়মান ব্লেডগুলোকে একটি আবরণের ভেতরে ঢুকিয়ে শব্দ চাপা দেয় এবং শব্দকে মাটির দিক থেকে অন্যদিকে সরিয়ে দেয়। রোটরের গতি কমিয়ে এবং কম্পনজনিত শব্দ কমায়, এমন উপকরণ ব্যবহার করেও এ ব্যবস্থা শব্দ কমায়।

শুধু আকাশপথে ডেলিভারিতে ক্লান্ত প্রতিবেশীদের জন্যই নয়, নীরব ড্রোন তৈরির প্রয়োজন আরও আছে। গ্রিনজেটসের কম শব্দের প্রযুক্তি জার্মানিতে পুলিশ ও বন্দর নিরাপত্তা দল ব্যবহার করেছে। আফ্রিকায় সংরক্ষণকর্মীদেরও এটি সহায়তা করেছে, যারা ধরা না পড়ে আকাশ থেকে শিকারিদের অবস্থান শনাক্ত করতে চান।

যুদ্ধক্ষেত্রের ড্রোন চালকদেরও শব্দ কমানোর জোরালো কারণ আছে, যাতে মনুষ্যবিহীন যান এগিয়ে আসার খবর শত্রু টের না পায়। লন্ডনের থিংকট্যাংক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (রুসি) গবেষণা ফেলো রবার্ট টোলাস্ট বলেন, ড্রোনের শব্দ কমানোর কিছু চেষ্টা আছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আগ্রহী।

তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত বড় ড্রোনের ক্ষেত্রে নীরবতার চেয়ে গতিকেই আগে গুরুত্ব দেওয়া হয়, এ কথাও তিনি জোর দিয়ে বলেন। টোলাস্ট বলেন, ড্রোনকে দ্রুততর করো, কম নীরব হলেও চলবে-এ রকমই মনোভাব মনে হচ্ছে।

ডেট্রয়েটভিত্তিক উদ্যোক্তা গ্রেগ শারোর ক্ষেত্রে নীরব ড্রোন তৈরির পথে হাঁটার সূচনা ২০১২ সালে একটি ধ্রুপদি সংগীতানুষ্ঠান সম্প্রচারের চ্যালেঞ্জ থেকে। এক বেহালাবাদককে জটিল কোণ থেকে ধারণ করতে হচ্ছিল। ড্রোনই একমাত্র সমাধান মনে হলেও সেটি ছিল ভীষণ কোলাহলপূর্ণ। তিনি বলেন, আমি শুরুতেই জানতাম, ড্রোনের বেশির ভাগ শব্দ আসে প্রপেলার থেকে, মোটর থেকে নয়। বিশেষ করে তিনি বুঝতে পারেন, বাতাস কেটে যাওয়ার সময় ব্লেডের ডগাই শব্দ তৈরি করে।

শারো বলেন, আমি নিজেকে একটা সহজ প্রশ্ন করেছিলাম, ডগাবিহীন প্রপেলার দেখতে কেমন হবে এবং কীভাবে কাজ করবে? ফলাফল হলো এমন প্রপেলার, যার ব্লেড পেঁচানো, লুপের মতো এবং কোনও ধারালো প্রান্ত নেই।

বারবার ড্রোন ওড়ানোর চেয়ে পানিতে প্রপেলার পরীক্ষা করা সহজ হওয়ায় শারো প্রথমে কম শব্দের নৌকার প্রপেলার তৈরি করেন। এখন তার প্রতিষ্ঠান শারো ইঞ্জিনিয়ারিং অতি নীরব ড্রোন রোটর তৈরিতে মনোযোগ দিচ্ছে। শারো বলেন, আমরা যাচাই করেছি যে ড্রোনে এ প্রযুক্তি কাজ করে এবং তা নাটকীয়ভাবে বেশি নীরব।

ড্রোন ডেলিভারিতে এগিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোও বলছে, তারা নিজেদের বহরের শব্দ কমাতে কাজ করছে। অ্যামাজনের এক মুখপাত্র জানান, তাদের ড্রোনের শব্দ পরিমাপযোগ্যভাবে কমেছে। সর্বশেষ নকশায় কাস্টম-ডিজাইন করা প্রপেলার ব্যবহার হচ্ছে, যা আগের প্রজন্মের তুলনায় প্রায় অর্ধেক অনুভূত শব্দ তৈরি করে, আর এর সুরও আগের চেয়ে নরম।

ওয়ালমার্টের ডেলিভারিতে যানবাহন সরবরাহকারী ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান উইং বলেছে, তাদের প্রপেলারের নকশা শব্দ কমানোর কথা মাথায় রেখে করা। একই সঙ্গে কোনও একটি বাড়ি বা এলাকার ওপর দিয়ে বারবার উড়ে যাওয়া এড়াতে তারা ফ্লাইটের পথও পাল্টায়।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

সম্পর্কিত সংবাদ