শাহজাদপুর সংবাদ

‘রিকনসিলিয়েশন’ ইশতেহারে আছে, আলোচনায় নেই

২৩ আগস্ট, ২০২৬ এ ১২:৩১ PM

‘রিকনসিলিয়েশন’ ইশতেহারে আছে, আলোচনায় নেই

দেশে সংঘাত, অনৈক্য ও বিভেদ নিরসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন (সত্য ও পুনঃসমঝোতা) কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কয়েকটি রাজনৈতিক দল। এতে প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে ভবিষ্যৎ–মুখী রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা ও পুনঃসমঝোতার কথা বলা হয়েছে।

তবে সংসদ নির্বাচনের ছয় মাস পার হলেও এ ধরনের কমিশন গঠন করা হয়নি। এমনকি জাতীয় সংসদ কিংবা রাজনীতিতে এ বিষয়ে কোনো আলোচনাও নেই।

ইশতেহার ঘেঁটে দেখা যায়, সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে এ ধরনের কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী বলেছে, ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন। আর এনসিপি ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ ছাড়া ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে ‘সমন্বিত সর্বদলীয় সত্যানুসন্ধান ও বিভেদ নিরসন’ কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

রাজনৈতিক দলগুলো বলছে, সরকার গঠন করা হয়েছে ছয় মাস হলো। সামনে সময় আছে। তা ছাড়া বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এখন পর্যন্ত তাদের অপরাধ স্বীকার করেনি; বরং তারা হুমকি–ধমকি দিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় এমন কমিশন গঠন করা সম্ভব নয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারও এমন কমিশনের কথা বলেছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও তাদের ইশতেহারে এ ধরনের কমিশন গঠনের কথা বলেছে। এসব ‘কথার কথা’ হিসেবেই আছে। কেউ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে মনে হয় না।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় এ অঞ্চলের মানুষের ওপর ধর্ষণ, নির্যাতন, গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল। এ ধ্বংসযজ্ঞে পাকিস্তানিদের সহযোগী হয়েছিল এ অঞ্চলেরই কিছু মানুষ। পরে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সরকারের শাসনামলে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অনেকে। ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে আবারও বড় ধরনের নির্যাতন, হত্যা, গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার হন এ ভূখণ্ডের মানুষেরা।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার, যা এখনো বহাল আছে। দলটির বহু নেতা–কর্মী আত্মগোপনে আছেন। অনেকে দেশ ছেড়েছেন। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই সমাজে বিভাজন–বিভক্তি, যা দিন দিন প্রকট হয়েছে। এ বাস্তবতায় হানাহানি বন্ধ করে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতেই মূলত ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠনের কথা বলা হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। ওই সরকারের সময় ২০২৫ সালের ১০ মে বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’–এর দ্বিতীয় খসড়ার ওপর একটি মতবিনিময় সভা হয়। সেখানে কবি ও রাষ্ট্রচিন্তক ফরহাদ মজহার বলেছিলেন, ‘যারা এই গুমের সঙ্গে জড়িত ছিল, আপনি যদি তাদের এখন বিচার করতে যান, এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থাকবে না। এটা হচ্ছে রিয়েলিটি (বাস্তবতা)। …যদি তা হয়ে থাকে, আমাদের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখতে হবে, তারা কী করে এটাকে সমাধান করেছে। তারা সমাধান করেছে ট্রুথ অ্যান্ড জাস্টিস কমিশনের মাধ্যমে আলাদা একটা কমিশন করে।’

ওই সভায় ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের কথা বলেন অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। তিনি বলেছিলেন, সরকার ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ কমিশন গঠন করবে। অনন্তকাল হানাহানি করে এ জাতির মুক্তি হবে না। তিনি জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার কথাও বলেন। তিনি আরও বলেন, এটা সম্ভবত ১৯৭২ সাল থেকে থাকলেই ভালো হতো। গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো ঘৃণ্য অপরাধীরা সংখ্যায় খুব বেশি নয়। তাদের উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা অবশ্যই করতে হবে। তারা যে এ জাতির মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন, সেটাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য হলেও এই কমিশন করতে হবে।

ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে ওই বছরেরই মে মাসে দক্ষিণ আফ্রিকা সফর করেছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ এবং তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। পরে বিষয়টি আর এগিয়ে নেয়নি অন্তর্বর্তী সরকার।

গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দেওয়া ইশতেহারে ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএনপি বলেছে, ‘প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে ভবিষ্যৎমুখী এক নতুন ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চায় বিএনপি। বিএনপি বিশ্বাস করে, জাতি গঠন মানে কেবল রাষ্ট্র পরিচালনা নয়; বরং বিভাজন অতিক্রম করে একটি অভিন্ন জাতীয় সত্ত্বা নির্মাণ। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের অবসান ঘটানো, আমাদের একটাই পরিচয়—আমরা সবাই বাংলাদেশি।’

ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জামায়াতে ইসলামী তার ইশতেহারে বলেছে, এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হবে, যেখানে জাতিসংঘের কারিগরি সহায়তা থাকবে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে গত ১৫ বছরে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনগুলোর সত্য উদ্‌ঘাটন এবং জাতির জন্য একটি নতুন অধ্যায় সূচনা করা হবে।

এনসিপি ইশতেহারে বলেছে, গণহত্যা, শাপলা গণহত্যা, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সময়ে সংঘটিত সব মানবতাবিরোধী অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা হবে এবং একটি ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠন করা হবে।

এর আগেও জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে এ ধরনের কমিশন গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বলেছিল, ‘প্রতিহিংসা বা জিঘাংসা নয়, জাতীয় ঐক্যই লক্ষ্য। বিগত ১০ বছরে কল্পনাতীত স্বেচ্ছাচারিতা এবং পুলিশকে দলীয় ক্যাডার হিসেবে ব্যবহার করে হাজার হাজার মিথ্যা মামলা, গুম, খুন, মামলা–বাণিজ্য ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে লক্ষ পরিবার ক্ষুব্ধ ও বিপর্যস্ত। এ সমস্যা সমাধান করে সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী, আইনজীবী সমন্বিত সর্বদলীয় সত্যানুসন্ধান ও বিভেদ নিরসন কমিশন গঠন করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অতীতের হয়রানিমূলক মামলা সুরাহার লক্ষ্যে খোলামনে আলোচনা করে ক্ষমা ও ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা হবে।’

ওই সময় ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপি, গণফোরাম, জেএসডি, নাগরিক ঐক্য মিলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়। পরে এই জোটে যোগ দেয় কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ। ওই নির্বাচনে সরকারবিরোধী বড় জোট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল ঐক্যফ্রন্ট। যদিও নির্বাচনের পর এই জোট নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।

ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো এখন কী ভাবছে, তা জানার চেষ্টা করা হয়েছে। এ বিষয়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন গঠনের বিষয়টি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে আছে। ইশতেহারে এটি চিন্তাভাবনা করেই রাখা হয়েছে। বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া অন্যান্য প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। ধীরে ধীরে এটাও বাস্তবায়ন হবে।

এখন পর্যন্ত সংসদে অনেক বিষয়ে আলোচনা হতে দেখা গেছে। কিন্তু ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন গঠনের বিষয়ে আলোচনা হতে দেখা যায়নি কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে রুহুল কবির রিজভী বলেন, তিনি সংসদ সদস্য নন। যাঁরা সংসদ সদস্য তাঁরা কেন এখনো বিষয়টি তোলেননি, সেটা তিনি বলতে পারবেন না।

সরকারে গেলে এমন কমিশন গঠন করবে বলে জানিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের দায়িত্ব পেলে জামায়াতে ইসলামী অনেক কাজ করবে, সেগুলোই ইশতেহারে বলা আছে। এটা এমন একটা কাজ, যা সরকারে যাওয়া ছাড়া করা যায় না। সংসদে এ বিষয়ে কেন আলোচনা হলো না করা—এ প্রসঙ্গে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, কেবল একটি সেশন (সংসদ অধিবেশন) হয়েছে। সব শেষ হয়ে যায়নি। ধৈর্য ধরতে হবে, দেখতে হবে।

বিষয়টি নিয়ে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার প্রথম আলোকে বলেন, ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশনের কথা তাঁরা বলেছেন, নানা সময়ই বলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ এখনো চোরাগোপ্তা হামলা করছে, জুলাই স্তম্ভসহ বিভিন্ন জায়গায় আগুন দিচ্ছে, হুমকি দিচ্ছে, নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে, জুলাইকে ষড়যন্ত্র বলছে। তারা এসব করতে থাকলে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন সম্ভব নয়।

ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন শুরুই হয় ভুল স্বীকার করার মধ্য দিয়ে উল্লেখ করে সারোয়ার তুষার বলেন, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ভুল স্বীকার করতে হবে। এটা প্রথম ধাপ। এর আগে কোনো কিছুই সম্ভব নয়। কিন্তু সে রকম কিছু দেখা যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগের সমর্থক গোষ্ঠী সমাজে আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা যদি রাজনৈতিকভাবে আবার আসতে চায়, সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের তরফ থেকে প্রথম বলতে হবে—তারা ভুল স্বীকার করছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ দীর্ঘ সংঘাতের পর শান্তি প্রতিষ্ঠায় ও গণতান্ত্রিক উত্তরণে সত্য উদ্‌ঘাটন ও সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে কমিশন করেছে। এমন একটি দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা। ৩০০ বছরের বেশি সময়ের বর্ণবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন (টিআরসি)। ১৯৪৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থা চালু হয়। এর পর থেকেই সেখানে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসসহ (এএনসি) বর্ণবাদবিরোধী সংগঠনগুলো আন্দোলন জোরালো করে। একপর্যায়ে এএনসি সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে।

এএনসির নেতৃত্বে ছিলেন বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা। ২৭ বছর কারাবাসের পর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তাঁকে মুক্তি দেয় সরকার। তবে তখনো শ্বেতাঙ্গ ও বর্ণবাদী শাসন বহাল ছিল। ফলে কারামুক্ত হলেও তাঁর সামনে ছিল কঠিন পথ।

প্রতিশোধপরায়ণতাকে দূরে রেখে কারামুক্তির দিন থেকেই সবার অধিকার রক্ষায় মনোযোগী হন নেলসন ম্যান্ডেলা, সেটা তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ লং ওয়াক টু ফ্রিডম–এ থেকে জানা যায়। সেখানে নেলসন ম্যান্ডেলা লিখেছেন, ২৭ বছর পর কারামুক্ত হয়ে অপ্রত্যাশিত ভিড় এড়াতে গ্রামীণ পথ দিয়ে কেপটাউনে যাচ্ছিল তাঁদের গাড়িবহর। রেডিওর মাধ্যমে খবর পেয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে অনেক শ্বেতাঙ্গ পরিবার সেই গ্রামীণ পথের পাশে দাঁড়ায়। এর মধ্যে কিছু পরিবার মুষ্টিবদ্ধ ডান হাত তুলে স্যালুট জানায়। শ্বেতাঙ্গ পরিবারগুলোর সংহতি প্রকাশের বিষয়টি নেলসন ম্যান্ডেলাকে বিস্মিত করে।

একপর্যায়ে ম্যান্ডেলা গাড়ি থামান এবং একটি শ্বেতাঙ্গ পরিবারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তাদের সমর্থনে তিনি ভীষণ অনুপ্রাণিত। বিষয়টি তাঁকে ভাবায়, যে দেশ রেখে কারাগারে গিয়েছিলেন, তার চেয়ে অনেক ভিন্ন দক্ষিণ আফ্রিকায় তিনি প্রবেশ করছেন। সেদিনই কেপটাউনের সিটি হলে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন নেলসন ম্যান্ডেলা। সেই ভাষণে তিনি সবার জন্য শান্তি, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার বার্তা দেন।

১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হন নেলসন ম্যান্ডেলা। তাঁর সরকার ১৯৯৫ সালে জাতীয় ঐক্য উন্নয়ন ও পুনর্মিলনবিষয়ক একটি আইন প্রণয়ন করে এবং সেই আইনের আওতায় একই বছর টিআরসি গঠন করা হয়।

এই টিআরসিতে ১৭ জন কমিশনার নিয়োগ করা হয়। দেশটির সব রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বাধীন নির্বাচন প্যানেল প্রকাশ্যে সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে কমিশনারদের নির্বাচিত করেন। আর কমিশনের চেয়ারপারসন ও ডেপুটি চেয়ারপারসন নিয়োগ দেন প্রেসিডেন্ট।

টিআরসির কমিশনারদের কাজ ছিল ১৯৬০ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সময়ে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্ত করা, ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য গ্রহণ, দোষীদের ক্ষমা করে দেওয়া, একটি নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক দলিল তৈরি করা এবং ক্ষতিপূরণ নীতিমালা প্রণয়ন করা। এসব উদ্দেশ্য পূরণে তিনটি কমিটি গঠিত হয়। সেগুলো হলো মানবাধিকার লঙ্ঘন কমিটি; পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ কমিটি এবং সাধারণ ক্ষমা কমিটি।

টিআরসি নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের কাছ থেকে ২২ হাজারের বেশি লিখিত অভিযোগ পায়। এসব অভিযোগের মাধ্যমে বর্ণবাদী শাসনামলে সংঘটিত নির্যাতন, হত্যা, গুম, অপহরণ ও চরম অমানবিক আচরণের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র উঠে আসে। ভুক্তভোগী ও অপরাধীর শুনানি হয় জনসমক্ষে।

টিআরসির কাছে সাত হাজারের বেশি সাধারণ ক্ষমার আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে আড়াই হাজারের বেশি আবেদনের ওপর শুনানি হয়। প্রায় দেড় হাজার আবেদনকারী সাধারণ ক্ষমা পান। দক্ষিণ আফ্রিকার এই টিআরসি প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করে ১৯৯৮ সালে। প্রতিবেদনে বর্ণবাদী শাসনামলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সত্য উন্মোচিত হয়।

অতীত অপরাধের জন্য সাধারণ ক্ষমার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকায় ন্যুরেমবার্গ ট্রায়াল থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার টিআরসি ছিল ভিন্ন। উল্লেখ্য, ন্যুরেমাবার্গ ট্রায়ালের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির নাৎসি বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিচার হয়েছিল। এই কমিশনের সফলতার পরিপ্রেক্ষিতে দক্ষিণ আফ্রিকায় এখনো কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গরা সংঘাত এড়িয়ে বসবাস করে আসছেন।

দক্ষিণ আফ্রিকার টিআরসি বিশ্বের কাছে একটি নতুন মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পায়। পরে বিশ্বের অনেক দেশই শান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় টিআরসি গঠন করেছে, যেমন সিয়েরা লিওন, লাইবেরিয়া, কানাডা, আর্জেন্টিনা, চিলি, ঘানা, গুয়াতেমালা, পেরু, পূর্ব তিমুর, মরক্কো।

অন্যান্য দেশে ব্যাপকভাবে হত্যা, নির্যাতনের জন্য ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠন হলেও বাংলাদেশে দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিদের সমাজে পুনর্বাসন করতে এমন একটি কমিশন গঠন করা হয়েছিল। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে সেনা–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু করে। দুর্নীতিসহ নানা সামাজিক অপরাধে তখন প্রায় ৭০ হাজার লোক গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আটক হন। এমন পরিস্থিতিতে ২০০৮ সালের ৩০ জুলাই তৎকালীন সরকার সত্য ও জবাবদিহি কমিশন (ট্রুথ কমিশন) গঠন করে।

সাবেক বিচারপতি হাবিবুর রহমান খানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ওই কমিশনের মেয়াদ ছিল পাঁচ মাস। দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাক্তিরা ওই কমিশনে এসে অপরাধ স্বীকার করতেন। তারপর অবৈধ টাকা বা তার একটি নির্দিষ্ট অংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতেন। তারপর ওই ব্যক্তিদের ক্ষমা করে দেওয়া হতো। তাঁদের পরিচয় গোপন রাখা হতো।

তবে একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রুথ কমিশনকে ২০০৮ সালের ১৩ নভেম্বর অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। পরে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারও এই কমিশনকে স্বীকৃতি দেয়নি। ২০০৯ সালের ১ এপ্রিল সংসদে ট্রুথ কমিশনে স্বীকারোক্তি দিয়ে দুর্নীতির দায় থেকে অব্যাহতি পাওয়া ৪৪৮ ব্যক্তির নামের তালিকা প্রকাশ করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

অর্থাৎ এই কমিশনের মাধ্যমে ক্ষমা করে দুর্নীতি থেকে বিরত রেখে সমাজে তাঁদের পুনর্বাসনের একটি চেষ্টা হয়েছিল।

দেশে যদি সহিংসতা চলতে থাকে, ক্ষোভ জমা থাকে, তাহলে এসব দীর্ঘ মেয়াদে সমাজের মধ্যে অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা তৈরি করে। এ মন্তব্য করে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম এটা প্রবাহিত হয়। হিংসা, বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসার কারণে সমাজে চিন্তা, সহমর্মিতার সংকট দেখা দেয়। সে জন্য এর সমাধান দরকার। সত্য উদ্‌ঘাটন করে সমঝোতার জায়গায় আসা দরকার। বিভিন্ন দল এ বিষয়ে কথা বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও বলেছিল—এসব কথার কথা হিসেবেই আছে। এটাকে কেউ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে মনে হয় না।

আনু মুহাম্মদ মনে করেন, সবকিছুর ফয়সালা করে শেষ করা দরকার। সমাজে ঐতিহাসিকভাবে অনেকগুলো জখম তৈরি হয়। ঐতিহাসিক সব জখম নিরাময় না করলে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়া মুশকিল।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পর্কিত সংবাদ