রকিবুল হাসান: ক্রিকেটই যাঁর জীবনের গল্প
১৮ আগস্ট, ২০২৬ এ ১২:২৮ PM

বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাস লিখতে গেলে রকিবুল হাসানের নামটি শুরুতেই আসে। শুধু তাঁর ব্যাটিং বা অধিনায়কত্বের জন্য নয়, তাঁর জীবনের গল্পের জন্যও। একটি জাতির জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর ক্রিকেট–জীবন এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে একটিকে অন্যটি থেকে আলাদা করা যায় না।
প্রথম আলোর ‘ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলোয়’ অনুষ্ঠানে রকিবুল হাসানের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় বারবার ফিরে এসেছে সেই সময়ের বাংলাদেশ, সেই সময়ের ক্রিকেট এবং মুক্তিযুদ্ধ।
রকিবুল হাসান বলছিলেন, ১৯৬৯ সালে তিনি যখন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলতে নামেন, তখন সেন্ট গ্রেগরী স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র। ইস্ট পাকিস্তান দলে ওপেনার হওয়ার জন্য চারজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন। তিনি নিজেও নিশ্চিত ছিলেন না যে দলে জায়গা পাবেন। কিন্তু সুযোগ এল। তারপর মাত্র ১৬ বছর বয়সেই অল পাকিস্তান টেস্ট দলের দ্বাদশ খেলোয়াড়।
রকিবুল বললেন, ‘আমি তখনো জীবনে বিমানে উঠিনি। হঠাৎ শুনলাম করাচি যেতে হবে। সামনে ম্যাট্রিক পরীক্ষা। মনে হয়েছিল, আব্বা হয়তো যেতে দেবেন না। কিন্তু তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘আই অ্যাম সো প্রাউড অব ইউ।’ তারপর হাতে ৩০০ রুপি দিয়ে বললেন, ‘যাও বাবা, ভালো খেলো।’
বাবা ছিলেন পুলিশ সুপার। কিন্তু সংসার ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। রকিবুল হাসান বললেন, ‘এমনও গেছে, আমার একটা প্যান্ট ছিল। প্যান্ট না থাকলে পায়জামা পরে প্র্যাকটিস করেছি।’
সেন্ট গ্রেগরীর স্মৃতি ও মুক্তিযুদ্ধ
সেন্ট গ্রেগরী স্কুলের কথাও তিনি গভীর আবেগ নিয়ে স্মরণ করলেন। শুধু লেখাপড়া নয়, খেলাধুলা, শৃঙ্খলা, মানুষ হয়ে ওঠা—সবকিছুর শিক্ষা সেখানে ছিল।
এ প্রসঙ্গ থেকেই উঠে আসে শহীদ আজাদ, শহীদ জুয়েল, কাজী কামালদের কথা। সেন্ট গ্রেগরীর সেই প্রজন্মের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে জীবন দিয়েছেন। আমি তাঁকে বলছিলাম, আমার মা বইয়ে শহীদ আজাদের মায়ের সেই হৃদয়বিদারক কাহিনি আছে। ছেলে শেষবার বলেছিল, ‘মা, ভাত আনো।’ কিন্তু মা ফিরে এসে আর ছেলেকে পাননি। তারপর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি আর ভাত খাননি।
রকিবুল হাসান স্মৃতি হাতড়ে বললেন, ‘আজাদ ভাই আমাদের বাসায় আসতেন। আমার বড় ভাইয়ের ক্লাসমেট ছিলেন। আমরা খুব কাছ থেকে দেখেছি।’
আর শহীদ জুয়েলের কথা বলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে।
রকিবুল হাসান একটি ঘটনা বললেন। করাচিতে ম্যাচ। দল ঘোষণা হবে। সবাই ধরে নিয়েছিল, সবচেয়ে কনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে তিনিই দ্বাদশ খেলোয়াড় হবেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে দেখা গেল, জুয়েল দ্বাদশ খেলোয়াড়। রকিবুল একাদশে।
‘জুয়েল নামগুলো পড়ে শোনাল। তারপর আমাকে বলল, “রকিবুল, তুই ব্যাট নিয়ে নেটে যা। তুই তো ওপেন করবি।” আমার জন্য ওর জায়গা হয়নি। কিন্তু তার মুখে কোনো কষ্ট ছিল না। উল্টো আমাকে প্রস্তুত করে দিল।’
এরপর একটু থেমে বললেন, ‘এই ছিল জুয়েল।’
১৯৭১ সালে ইতিহাসের সেই বিখ্যাত ঘটনাও উঠে আসে। কমনওয়েলথ একাদশের বিপক্ষে ম্যাচে পাকিস্তান দলের হয়ে খেলতে নেমে নিজের ব্যাটে ‘জয় বাংলা’ স্টিকার লাগিয়ে মাঠে নামেন রকিবুল হাসান।
তিনি বললেন, ‘আমি ভেবেছিলাম, একটা কিছু করতে হবে। অলিম্পিকের ব্ল্যাক পাওয়ার আন্দোলনের ছবিটা মাথায় ছিল। তাই ব্যাটে “জয় বাংলা” লাগালাম। তখন ভাবিনি, এর জন্য এত বড় মূল্য দিতে হবে।’
২৫ মার্চের পর পাকিস্তানি সেনাদের ‘শুট অ্যাট সাইট’ তালিকায় তাঁর নাম উঠে যায়। তিনি স্মরণ করলেন, ‘এক পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা গোপনে খবর পাঠিয়েছিলেন—রকিবুলকে বলো, ঢাকা ছেড়ে চলে যাক। না হলে ওকে মেরে ফেলা হবে।’
ঢাকা ছেড়ে তিনি গ্রামে যান। পরে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। স্বাধীন বাংলা ক্রিকেট দল গঠনের উদ্যোগেও যুক্ত ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি স্মৃতি বলতে গিয়ে তিনি নিজেকে সামলাতে পারেননি। আজাদ বয়েজ ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা মুশতাককে পাকিস্তানি সেনারা হত্যা করে। তাঁর মরদেহ নিজের চোখে দেখেছিলেন।
‘আমি মা–বাবার মৃত্যুতেও কাঁদিনি। কিন্তু মুশতাককে যেভাবে পড়ে থাকতে দেখলাম, নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি। উনি ছিলেন আমার ক্রিকেট–জীবনের গডফাদার।’
লাগবে খেলার মাঠ
স্বাধীনতার পরে আবার ক্রিকেট শুরু হয়। বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রথম দিককার সংগ্রামের কথাও বললেন তিনি। ক্রিকেটকে তখন অনেকে ‘বড়লোকের খেলা’ বলে বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হস্তক্ষেপে বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড গঠিত হয়, আবার ক্রিকেট শুরু হয়।
আজকের বাংলাদেশ ক্রিকেট নিয়ে তাঁর গর্ব আছে, আবার আক্ষেপও আছে। ‘আজ সাকিব আল হাসান হয়েছে, তামিম ইকবাল হয়েছে। আমরা বিশ্ব ক্রিকেটে পরিচিত। কিন্তু ধারাবাহিকতা আরও বাড়াতে হবে।’
সমাধানও তিনি বলে দিলেন, ‘আমাদের বড় বড় স্টেডিয়াম লাগবে না। লাগবে খেলার মাঠ। স্কুল ক্রিকেট আরও শক্তিশালী করতে হবে।’
সবশেষে বাংলাদেশের মানুষের উদ্দেশে তাঁর আবেদন, ‘আপনার সন্তানকে ক্রিকেট ব্যাট কিনে দিন, মোবাইল কিনে দেবেন না। ক্রিকেটকে ভালোবাসুন। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ একদিন বিশ্বকাপ জিতবেই।’
আনিসুল হক, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পর্কিত সংবাদ
৫০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে ভবনে গুলি, ৭ দিনেও গ্রেপ্তার হয়নি কেউ
১৮ আগস্ট, ২০২৬ এ ১২:৪০ PM · প্রথম আলো
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের পদ অবনমন, সব কাজ থেকে ৫ বছরের অব্যাহতি
১৭ আগস্ট, ২০২৬ এ ১২:৪৭ PM · প্রথম আলো
এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেল কুমিল্লার যমজ দুই ভাই, হতে চায় প্রকৌশলী
১৭ আগস্ট, ২০২৬ এ ১২:৪৪ PM · প্রথম আলো
