যেমন ছিল জাহেলি যুগের বিয়ের প্রথা
১ নভেম্বর, ২০২৬ এ ১০:৩০ AM

ইতিহাসের কলঙ্কিত অধ্যায় হলো জাহিলি যুগ। যেখানে নারী জাতির সম্মান-মর্যাদা বলতে কিছু ছিল না। তাঁরা পুরুষের ভোগ্যবস্তু হিসেবে নির্যাতিত-নিষ্পেষিত হতো। কন্যাসন্তানকে জীবন্ত পুঁতে মারা হতো।
যারা বড় হতো, তাদের অনেককে বিয়ের উপযুক্ত হওয়ার পর কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই পুরুষের অধীনে ন্যস্ত করা হতো। তখনকার সমাজব্যবস্থায় নারীরা তাঁদের অধিকার পাওয়ার চিন্তাই করতে পারতেন না।
শুধু পুরুষের অনুগ্রহভাজন হয়ে যতটুকু পাওয়া যেত, সেটাই ছিল তাঁদের মহাপ্রাপ্তি। উত্তরাধিকারের সম্পদে চোখ তুলে তাকানোও ছিল অন্যায়।
বিয়ের মাধ্যমে জাহেলি যুগে নারী–পুরুষ কীভাবে নির্যাতিত হতেন, তার একটি বাস্তব চিত্র হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। হাদিসের দীর্ঘ এক বর্ণনায় সে যুগের বিয়ের আলোচনা করা হয়েছে।
আয়েশা (রা.) বলেছেন, জাহিলি যুগে চার প্রকার বিয়ের প্রচলন ছিল।
প্রথম প্রথা: এই প্রকার বিয়ে ছিল আজকালের বিয়ের মতো। বিয়েতে ইচ্ছুক পুরুষ পাত্রীর পুরুষ অভিভাবকের নিকট বিয়ের প্রস্তাব করত। এরপর মোহর নির্ধারণ করে (উভয় পক্ষের সম্মতিতে) তাকে বিয়ে করত।
দ্বিতীয় প্রথা: ব্যক্তি তার স্ত্রীকে বলত, তুমি মাসিক ঋতু থেকে পবিত্র হওয়ার পর অমুক ব্যক্তির কাছে যাও এবং তার সঙ্গে মিলিত হও। এরপর ওই ব্যক্তি তার স্ত্রী থেকে পৃথক থাকত।
স্ত্রী ওই ব্যক্তির সঙ্গ গ্রহণের ফলে সন্তানসম্ভবা হওয়া অবধি তিনি তার সঙ্গে থাকতেন না। যখন তার গর্ভ সুস্পষ্ট হতো, তখন স্বামীর ইচ্ছা হলে একত্রে থাকতেন।
এরূপ করার কারণ ছিল, সন্তানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিরূপণ ও উন্নত জাতের সন্তান লাভ। এ ধরনের বিয়েকে জাহেলি যুগে ‘নিকাহ আল–ইস্তিবদা’ বলা হতো।
তৃতীয় প্রথা: অনধিক ১০ জন পুরুষ পর্যায়ক্রমে সবাই একজন স্ত্রীলোকের সঙ্গে মিলিত হতেন। এরপর সেই নারী গর্ভবতী হয়ে সন্তান প্রসব করতেন। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর কিছুদিন অতিবাহিত হলে ওই নারী সবাইকে তাঁর কাছে আসার জন্য পত্র প্রেরণ করতেন এবং পত্র পাওয়ার পর তাঁরা সবাই তাঁর কাছে আসতে বাধ্য হতেন।
সবাই উপস্থিত হওয়ার পর ওই নারী বলতেন, ‘তোমরা তোমাদের কর্ম সম্পর্কে অবশ্যই অবগত আছ, যার ফলে আমি এ সন্তান জন্ম দিয়েছি।’ তখন তিনি তাঁদের মধ্য থেকে তাঁর পছন্দমতো একজনের নাম ধরে সম্বোধন করে বলতেন, ‘হে অমুক, এ সন্তান তোমার।’
তখন তিনি এই শিশুটি গ্রহণ করতে বাধ্য থাকতেন এবং ওই নারী তাঁর স্ত্রীরূপে গণ্য হতেন।
চতুর্থ প্রথা: বহু লোক একসঙ্গে হয়ে পালাক্রমে একজন নারীর নিকট গমন করত। আর যে-ই তার শয্যাসঙ্গী হওয়ার উদ্দেশ্যে আসত, তিনি কাউকেই বারণ করতেন না। এদের পরিচয় ছিল ‘বারবণিতা’।
এরা তাদের ঘরের দরজায় নিশান লাগিয়ে রাখত, যা ছিল তাদের অপকর্মের নিদর্শনস্বরূপ। যে কেউ তাদের নিকট গমন করে তাদের শয্যাসঙ্গী হতে পারত।
এভাবে যদি তিনি গর্ভবতী হহলে সন্তান প্রসব করার পর তার সঙ্গ গ্রহণকারীদের সবাইকে তার নিকট উপস্থিত করতেন এবং একজন ‘কাফাহ’ ডাকতেন।
কাফাহ মানে যারা সন্তানের মুখ অথবা শরীরের অঙ্গ দেখে বলতে পারে, সে অমুকের ঔরসজাত সন্তান।
সে তার সন্তানকে ওই ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত করত, যার সঙ্গে সন্তানের সাদৃশ্য পরিদৃষ্ট হতো। এরপর সন্তানকে ওই ব্যক্তির সন্তান হিসেবে ডাকা হতো এবং ওই লোক তা অস্বীকার করতে পারত না।
এরপর আল্লাহ–তাআলা মুহাম্মাদকে রাসুল হিসেবে প্রেরণ করেন। তিনি এসে জাহেলি যুগে প্রচলিত ওই সব বিবাহপ্রথাকে বাতিল ঘোষণা করেন এবং বর্তমানে ইসলামের বিধিবদ্ধ যে বিবাহরীতি চালু আছে, তা বলবৎ রাখেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২২৭২)
ইসলাম আসার পর নারী জাতি ফিরে পেল তাদের সামগ্রিক অধিকার। মা, বোন ও স্ত্রী হিসেবে তারা পেল সম্মান ও মর্যাদার আসন।
প্রতিষ্ঠা হলো বিয়েতে তাঁদের মতামত ব্যক্ত করার অধিকার, স্বামী ব্যতীত অন্য পুরুষের হিংস্র থাবার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার নিরাপত্তা এবং সন্তান জন্মদানের পর তাঁদের মর্যাদা ও অধিকার।
মাহমুদ হাসান ফাহিম : আলেম ও লেখক
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পর্কিত সংবাদ
বিয়ের জন্য পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে মহানবী (সা.) যে ৩ শর্ত বলেছেন
৩১ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৩:১৬ PM · প্রথম আলো
