যে কারণে বন্ধ হয়েছিল ৩০ ব্যাংকের এটিএম-অনলাইন সেবা
৭ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১১:০৭ AM

কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত ৩০টি ব্যাংকের এটিএম, কার্ড, পিওএস, এনপিএসবি, ই-কমার্স ও কিউআর সেবা বন্ধ হওয়ার পেছনে ‘সিস্টেম মাইগ্রেশন’ বা প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে কারণ হিসেবে বলা হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। তার দাবি, রাশিয়ার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কম্পাস প্লাসের সঙ্গে কিউ-ক্যাশ পরিচালনাকারী আইটি কনসালট্যান্টস পিএলসির (আইটিসিএল) ব্যবসায়িক চুক্তি ও বকেয়া পরিশোধ নিয়ে জটিলতার জেরে সেবা বন্ধ হয়ে যায়।
ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, কম্পাস প্লাসের পাওনা পরিশোধ নিয়ে বিরোধের কারণে রাশিয়ান প্রতিষ্ঠানটি আইটিসিএলের সার্ভিস বন্ধ করে দেয়। এতে কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল ৩০টি ব্যাংকের গ্রাহকেরা হঠাৎ করে এটিএম, কার্ড ও অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন সেবা ব্যবহারে সমস্যায় পড়েন।
তবে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে গ্রাহকদের জানানো হয়েছিল, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, সিস্টেম মাইগ্রেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেবা বন্ধ থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আইটিসিএল দেশের ৩৩টি ব্যাংককে ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও এটিএম সার্ভিস দিয়ে থাকে। আর আইটিসিএল তাদের প্রযুক্তিগত সেবার জন্য রাশিয়ার কম্পাস প্লাসের ওপর নির্ভরশীল।
তিনি বলেন, ‘সিস্টেম মাইগ্রেশনের কারণে নয়, বরং রাশিয়ান কোম্পানি কম্পাস প্লাসের সঙ্গে চুক্তি জটিলতা এবং বকেয়া পেমেন্ট ইস্যুকে কেন্দ্র করে কোম্পানিটি আইটিসিএলের সার্ভিস ডাউন করে দিয়েছে।’
ওই কর্মকর্তা জানান, কম্পাস প্লাস আইটিসিএলের কাছে প্রায় ১৫ লাখ মার্কিন ডলার পাওনা দাবি করছে। এই অর্থ পরিশোধ ও চুক্তি-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে আইটিসিএলের কিউ-ক্যাশ সেবা বন্ধ হয়ে যায় বলে তিনি জানান।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি জানার পর বাংলাদেশ ব্যাংক দ্রুত হস্তক্ষেপ করে। মঙ্গলবার আইটিসিএলের কর্তৃপক্ষকে ডেকে রাতের মধ্যেই কম্পাস প্লাসের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর নির্দেশ দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর।
একই সঙ্গে সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও কম্পাস প্লাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে আইটিসিএল ও রাশিয়ান কোম্পানিটির মধ্যে সমঝোতা হলে মঙ্গলবার রাতেই কিউ-ক্যাশের সেবা চালু হয় বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কে সেবা বিঘ্নিত হওয়ায় ৪ অক্টোবর রাত ৯টার পর থেকে একযোগে ৩০টি ব্যাংকের গ্রাহকেরা বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল লেনদেন সেবা ব্যবহারে সমস্যায় পড়েন।
এ সময় অনেক গ্রাহক এটিএম থেকে টাকা তুলতে পারেননি। কার্ড দিয়ে পিওএসে কেনাকাটা, অনলাইন লেনদেন, ই-কমার্স, কিউআর ও এনপিএসবি-সংশ্লিষ্ট কিছু সেবাও ব্যবহার করা যায়নি।
কিউ-ক্যাশের আওতায় থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, বেসিক ব্যাংক, ব্যাংক আলফালাহ, কমিউনিটি ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, সীমান্ত ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক ও উরি ব্যাংক বাংলাদেশ।
সেবা বন্ধের কারণ হিসেবে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে গ্রাহকদের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, সিস্টেম মাইগ্রেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের কথা জানানো হয়। অনেক ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের এসএমএসের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এটিএম, কার্ড ও ডিজিটাল লেনদেন সেবা বন্ধ থাকার তথ্য দেয়।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের ওই কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকৃত সমস্যা ছিল আইটিসিএল ও কম্পাস প্লাসের মধ্যকার চুক্তি ও পাওনা পরিশোধসংক্রান্ত বিরোধ।
ফলে প্রযুক্তিগত কাজের কথা বলা হলেও এর পেছনে ব্যবসায়িক চুক্তি ও অর্থ পরিশোধসংক্রান্ত বিরোধ ছিল বলে দাবি করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা।
সেবা বন্ধ হওয়ার পর গ্রাহকদের ভোগান্তির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে মঙ্গলবার দ্রুত পদক্ষেপ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিউ-ক্যাশ পরিচালনাকারী আইটিসিএলের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে তলব করে।
আইটিসিএল কর্তৃপক্ষকে স্যুইচিংসহ কার্ড-সংশ্লিষ্ট সব সেবা দ্রুত চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে গ্রাহকদের স্বার্থ এবং আর্থিক লেনদেনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের সমস্যার কারণে কয়েকটি ব্যাংকের নির্দিষ্ট সেবা বিঘ্নিত হলেও দেশের সব ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা বন্ধ হয়নি। এনপিএসবির সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত বিভিন্ন ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং অন্যান্য পেমেন্ট সেবা স্বাভাবিক ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালিত বিএসিপিএস, বিইএফটিএন ও আরটিজিএসও চালু ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের চাপ ও উদ্যোগের পর আইটিসিএল ও কম্পাস প্লাসের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে মঙ্গলবার রাতেই কিউ-ক্যাশের সেবা চালু হয় বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
এরপর বুধবার থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর এটিএম, কার্ড, পিওএস, এনপিএসবি, ই-কমার্স ও কিউআর সেবা স্বাভাবিক হতে শুরু করে। ব্যাংক এশিয়াসহ কয়েকটি ব্যাংক ইতোমধ্যে তাদের গ্রাহকদের সেবা পুরোপুরি চালু হওয়ার বিষয়টি এসএমএসের মাধ্যমে জানিয়েছে।
অর্থাৎ ৪ অক্টোবর রাত থেকে যে ভোগান্তির শুরু, তা নির্ধারিত সময়ের আগেই বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে শেষ হলো। তবে ৩০টি ব্যাংকের লাখ লাখ গ্রাহকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও সিস্টেম মাইগ্রেশনের কথা বলে যে সেবা বন্ধ রাখা হয়েছিল, তার নেপথ্যে আসলে ব্যবসায়িক চুক্তি ও বকেয়া অর্থ পরিশোধের বিরোধ কেন ছিল এবং গ্রাহকদের কাছে প্রকৃত কারণটি কেন স্পষ্ট করা হয়নি।
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন
সম্পর্কিত সংবাদ
এআইয়ের উত্থানে বাড়ছে প্রযুক্তি খাতের ধনকুবেরদের সম্পদ, এ বছর রেকর্ড ৮৪৫ বিলিয়ন ডলার
৭ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১০:০০ AM · প্রথম আলো
বন্ধ কারখানা চালু করতে ঋণ মিলছে না, আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি ব্যবসায়ীদের
৭ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৯:৩৬ AM · প্রথম আলো
৪৪২ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ, আজ একনেকে উঠবে প্রস্তাব
৭ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৮:৫০ AM · প্রথম আলো
‘দিন যাচ্ছে আর দাম বাড়ছে, হিসাব মেলানোই কষ্ট’: রাজধানীতে সবজির বাজারে হাহাকার
৬ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১০:১৭ AM · বাংলা ট্রিবিউন
